শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:০৭

আমাদের স্বপন দা

তৃপ্তি সাহা
আমাদের স্বপন দা

রাত দুটো পনেরো মিনিট। দু চোখ বন্ধ করলেই টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। জানি এই মুহূর্তে স্বপন দার দেহটা দাউ দাউ করে জ্বলছে। স্বপন দার মরদেহ ডেল্টা হসপিটাল থেকে সম্ভবত সাড়ে ছয়টা হতে সাতটার মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলো। এখন ইংরেজি হিসেবে ২৮ নভেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ। আমাদের স্বপন দা মারা গেলেন ২৭ নভেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।

কথায় বলে আজ মরলে কাল দুদিন। সেই হিসেবে স্বপন দার মৃত্যুর আজ ইংরেজি মতে ২য় দিন। কিন্তু বাংলার পঞ্জিকা মতে সূর্য উদয়ের পর ২য় দিন শুরু। সে যাই হোক, যিনি চলে গেছেন তার জন্য ১ম দিন আর ২য় দিনের তফাৎ কিছুই নেই। সেই হিসাবটা জাগতিক মানুষের। তিনি চলে গেছেন যোজন যোজন দূরে।

হেডিংটা দেখে অনেকেই ভাবছেন, আমাদের স্বপন দা কেন? যারা আমার কিছু মাত্র লেখার সাথে পরিচিত তারা আমার লেখা ‘আমাদের সংগীত নিকেতন’, ‘আমাদের চাঁদপুর’, ‘আমাদের পহেলা বৈশাখ’ ইত্যাদি ইত্যাদি পড়েছেন। তাই যদি হয়, তাহলে ‘আমাদের স্বপন দা’ এটা যথাযথ নাম বৈকি!

চাঁদপুরের জন্মলগ্ন থেকেই তিনি ছিলেন চাঁদপুরের সাথে। চাঁদপুরের শুদ্ধসংগীতের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন আমৃত্যু। সংগীত নিকেতনের প্রতি বছরের পহেলা বৈশাখ আমার জানামতে স্বাধীনতার পর কোন দিন বাদ যায়নি। স্বপন দা সংগীত নিকেতনের কর্ণধার। প্রতি বছর আয়োজন করেছেন আমাদের পহেলা বৈশাখ। সুবিধা নেওয়ার জন্য কোন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না তিনি।

ওই যে যখন চাঁদপুরের নদীর জোয়ারের জল চাঁদপুরের প্রত্যেকটি পুকুরকে পরিপূর্ণ করে তুলতো আবার ভাটিতে পুকুরগুলো নেতিয়ে পড়তো। তখন এতো আলো ঝলমলে চাঁদপুর ছিলো না। ছিলো টিমটিমে বিদ্যুতের আলো। কদমতলার হরদয়াল পুকুরের উত্তর পাশে যেখনে শানবাঁধানো ঘাট ছিলো তারই উত্তর পাশে রসিক সেনগুপ্তের বাড়ি। সেই রসিক সেনগুপ্তের ৩য় বা ৪র্থ সন্তান ছিলেন আমাদের স্বপন দা। এখনেই জন্ম, এখানেই বড় হওয়া। এখনেই স্কুলে, কলেজে পড়ুয়া সেই স্বপন দা, যিনি তারই বড়ো ভাইয়ের হাতে তৈরি সংগীত নিকেতনের কর্ণধার ছিলেন যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে। সেই কবেকার কথা।

কেমন ছিলো সেই সময়কাল, কেমন ছিলেন আমাদের সেই স্বপন দা। তার স্বভাবটিই-বা কেমন ছিলো? খুব আবাক লাগবে আজকের ছেলে-মেয়েদের কাছে। লোভহীন, সদালাপী, স্বার্থহীন নিরলস কর্মবীর এসব যুবকদের কথা শুনলে। আমার ঠিক মনে নেই, এই অবস্থায় কারো কাছে তথ্য নেওয়ারও তেমন সময় এখন নয়। তখন ১৯৭২। স্বপন দা তখন বড়োজোর কলেজপডুয়া। তারপর স্নাতক ডিগ্রি শেষ করে সোনালী ব্যাংকে চাকুরি করেছেন। আমরা ভাইবোন সংগীত নিকেতনের সদ্য ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী। আমাদের মতো ক্লাস টুতে পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী যেমন ছিলো, তেমনি কলেজে পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীও ছিলো। অসংখ্য ছেলেমেয়ে এই সংগীত নিকেতন থেকে শিক্ষাগ্রহণ যেমন করেছে, তেমনি জীবনে প্রতিষ্ঠিতও হয়েছেন। বাবা-মাকে পাহারা দিতে হয়নি-এ কথা হলফ করে বলতে পারি।

যদি গানে ভুল হতো স্বপন দা প্রায়শই বলতেন, তবলা দিয়ে বাড়ি মেরে নিচে ফেলে দিবো। উল্লেখ্য, সংগীত নিকেতন তখন বেগম ইন্ডাস্ট্রির পাশের বিল্ডিংয়ের ২য় তালায় ছিলো। এই কথাটা স্বপনদার মুদ্রাদোষের পর্যায়ে ছিলো। জানি স্বপনদার অনেক অনেক ছাত্রছাত্রী পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে চোখের জলে ভাসবেন স্বপন দার মৃত্যুর খবর শুনে। আমি দেখেছি তাঁর ছাত্রছাত্রীরা নিজের আত্মজর মতো কেঁদেছে। একেকটি ছেলেমেয়ে পুরস্কৃত হয়েছেন স্বপন দার দু চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। যেন আপনার সন্তানের হাতে পুরস্কার। ছেলেমেয়েরাও স্বপন দাকে যোগ্য সম্মান দিয়েছে। পুরস্কার সবার আগে স্বপন দার সাথে শেয়ার করেছে। কী সারল্য ছিলো আপনার মধ্যে!

এসব শিক্ষকদের না ছিলো টাকার মোহ, না ছিলো ক্ষমতার মোহ, না ছিলো উৎকট শারীরিক মানসিক বৈকাল্যঙ্গ। আজ মনে হয় এরাই তো প্রকৃত দেশপ্রেমিক। বড্ড অভাব হয়ে যাচ্ছে এরকম দেশপ্রেমিক মানুষের। আহা স্বপন দা ফিরে আসুন বারবার এই বাংলায়, আপনার অতি পরিচিত সেই চাঁদপুরের মাটিতে। সংগীত নিকেতন বড় একা হয়ে গেলো। প্রত্যেক সংগীতপ্রিয় মানুষ আপনার মৃত্যুতে শোকে কাতর হয়েছে। ফিরে আসুন আবার।

তৃপ্তি সাহা : গ্রন্থাগার উন্নয়ন কর্মকর্তা (অবসর), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা, বাংলাদেশ।

২৮/১১/২৫খ্রি.

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়