প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:০৬
ধারাবাহিক উপন্যাস-১৭
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)
১১. ‘কাকাবাবু কোথাও যাচ্ছেন নাকি? আরে পিটার আংকেল যেÑনমষ্কার’
‘নমষ্কার মা, কেমন আছ তুমি?
‘এই তো আপনাদের আশীর্বাদে আছি বেশ। তা আপনারা কোথাও যাচ্ছেন নাকি?’
‘হ্যাঁ একটু ব্যাংকে যাব তারপর বাজারে। তুমি কোথায় যাওয়ার জন্য তৈরি হলে?
‘আজ আমাদের প্রাক্তন স্কুল বন্ধুদের রি-ইউনিয়ন পার্টি আছে সেখানেই থাকব সারাবেলা। জানেন আংকেল কত বছর পর সবাইকে দেখব, একসাথে থাকব আমার ভাবতেই অবাক লাগছে। আমাদের সাথের কয়েকটা মেয়ের তো বিয়েও হয়ে গেছে। ওরা আসবে অন্য জেলা থেকে। এই নাও কাকাবাবু বাপি পাঠিয়েছে বলেছে তোমায় দিয়ে দিতে। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে আমি আসি এখনÑনমষ্কার।’
‘আরে দেখলে পাগল মেয়ের কাণ্ড বইগুলো এখানে দিয়ে গেল। তুমি একটু দাঁড়াও পিটার আমি এগুলো ঘরে রেখে আসি।’
আজ সারাদিন আমাদের বাইরেই কাটল। আমরা দুজনে প্রথমে যার যার ব্যাংকে চলে গেলাম। পেনশনের কিছু জমানো টাকা ছিল এগুলো সম্পর্কে আমার বাসার কেহই জানত না। ছেলেদের ব্যবসায় টাকা দেওয়ার পর প্রথম দু বছর আমাকে ব্যাংকের টাকায় হাত দিতে হয়নি। এই দু বছরে শুধু মেডিকেল ও ফেস্টিবল বোনস সহ পেনশনে যে টাকা পাওয়া যেত সেগুলো জমেছে। ওদের মা মারা যাওয়ার পর থেকে সংসারে আমার অবস্থা নড়বড়ে হয়ে যায় আর তখনি পেনশনের টাকা আর জমাতে পারিনি। তবে যে টাকা জমেছিল শত কষ্ট হলেও সেগুলোয় কখন হাত দেইনি, আজ তুলে নিচ্ছি। পরিবারে আত্মসম্মানটুকু টিকিয়ে রাখতে পারিনি কিন্তু এখানে সেটা টিকে থাকুক। নরেন্দ্রদা, অনিমেষ ও সারোয়ার নির্বিগ্নে ভালো মানুষ। আমার অবস্থার কথা তারা বুঝতে পেরেও আমাকে সবসময় স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে। এই ট্যুরে কিছুটা কন্ট্রিবিউট না করলে নিজেই নিজের কাছে নত হয়ে থাকব। টাকাগুলো তুলে নিয়ে আসলাম এখন অ্যাকাউন্ট শূন্য প্রায়। তারপর গেলাম বাজারে নিজেদের প্রয়োজনীয় কিছু নিত্য সামগ্রী কিনে দুপুরে বাসায় ফিরি। আমাকে একটা রুম দেওয়া হলো এবং বলা হলো যেন থাকি নিজের বাড়ি মনে করে। দুপুরে লাঞ্চ সেরে আমরা এক গেম দাবায় মজে গেলাম। নরেন্দ্রদা দাবার এক্সপার্ট প্লেয়ার তাই তার সাথে পেরে ওঠা বেশ মুশকিল। আমাদের তিন জনের কেহই আজও অবদি উনাকে বেশি একটা হারাতে পারিনি। উনার চাল বুঝে বেশ সময় নিয়ে খেলতে হয়। অভিজ্ঞ খেলোয়ারের সাথে খেলার মজাই আলাদা আর এতে করে নিজেও দক্ষ হয়ে ওঠা যায়।
‘অবশেষে দাদা জিততে পারলাম না আজও আপনার সাথে।’
‘তুমি কখনো পারবে না কারণ তোমার মনোনিবেশ পুরোপুরি থাকে না। খেলতে খেলতে হঠাৎ অন্যমনষ্ক হয়ে যাও কেন বল তো?’
‘অন্যমনষ্ক কোথায় হলাম, আমি তো মনযোগ দিয়েই খেলছিলাম।’
‘না, প্রথমে মন দিয়ে খেললেও পরবর্তীতে অন্যমনষ্ক হয়ে গেলে। খেলা রেখে অন্য কিছু ভেবেছ নিশ্চয়। শোন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করতে হয়। সমস্যা থাকবেই আর সেগুলোকে জীবনের সকল অধ্যায়ে আনতে পারবে না। আমরা প্রতিটি মানুষ যদি এগুলোকে ভাগ করে নিতে পারি তবেই জীবনটা অন্তীম পর্যন্ত হয়ে উঠবে বাঁচার মতো।’
‘আপনি ঠিকই ধরেছেন। চেষ্টা করি দাদা কিন্তু পারি না।’
‘পারতে হবে পিটার, পারাটা উচিত নিজের জন্য, বাঁচার জন্য।’
‘বিকেল হয়ে গেল এখন কোথাও বের হবেন নাকি?’
‘ওদের আসতে বলেছিলাম আজ বিকেলে, ওরা এলেই বসে পড়ব সবকিছু নিয়ে। একটা চার্ট তৈরি করে বের হলে বাজেট ঘাটতি হবে না আর বেড়ান যাবে মন খুলে।’
‘আমরা এসে গেছি দাদা। কী করতে হবে বলুন?’
‘এসো বারান্দায় বসে আলোচনা করি। আগে মনমোহনকে বলি চা-নাশতার ব্যবস্থা করতে।’
‘কী হে পিটার সারাদিন কেমন কাটল তোমার?’
‘খারাপ না ভালোই কেটেছে।’
‘স্বপ্ন হবে সত্যি এটাতে কেমন লাগছে?’
‘ভালোই, তবে স্বপ্ন দেখেছিলাম দুজনে তাই মন চাইছে না একা যেতে।’
‘না না পিটার কোনো দুঃখের কথা নয়। এসো আমরা আজ থেকে শপথ নেই আগামীতে যতদিনই বাঁচি না কেন বাঁচব নিজের মতো করে। হাতটা রাখ আমার হাতের উপর।
[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে]








