শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ১০:১৩

বিজয়ের ডাকপিয়ন

বিচিত্র কুমার
বিজয়ের ডাকপিয়ন

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর। শীতের হালকা কুয়াশায় ঢাকা এক সকালে বটতলা গ্রামের মানুষ নিজেদের কাজে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু প্রত্যেক মানুষের মনে চাপা উত্তেজনাÑদেশের পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। চারদিকে যুদ্ধের খবর। ডাকপিয়ন করিম চাচা সেই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সাইকেলে প্রতিদিন চিঠি বিলি করতেন। সাধারণ ডাকপিয়ন হলেও যুদ্ধের সময়ে তাঁর দায়িত্ব শুধু চিঠি পৌঁছে দেওয়া নয়; বরং মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গুপ্তবার্তা বহন করাও।

করিম চাচার বয়স প্রায় ৫০। চেহারায় বয়সের ছাপ স্পষ্ট হলেও মন ছিল তরুণ। মুক্তিযোদ্ধারা তাঁকে গভীর আস্থা নিয়ে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দিত। পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে সন্দেহ করত, ব্যাগ তল্লাশি করত। করিম চাচা ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান। গুপ্তবার্তা কখনো জামার ভাঁজে, কখনো শিশুদের খেলনার ভেতরে লুকিয়ে নিরাপদে পৌঁছে দিতেন।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে করিম চাচা ঢাকার মুক্তিযুদ্ধের প্রধান কার্যালয় থেকে একটি চিঠি পেলেন। চিঠিতে লেখা, ‘বটতলার আশপাশের পাকিস্তানি ঘাঁটি ধ্বংসের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিজয় আসন্ন। সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলো।’ চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পৌঁছে দিলেন।

বটতলার মুক্তিযোদ্ধাদের দলটিতে ছিলেন রাজা, শহীদুল ও হাসান। তরুণ বয়সের সাহস আর চেতনায় তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল। চিঠি পেয়ে গ্রামে প্রতিরোধের প্রস্তুতি শুরু করল। গ্রামের মানুষ তাদের সাহায্য করত। নারীরা গোপনে খাবার বানাত, পুরুষেরা বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করত। সবাই জানত, বিজয় তাদের দরজায় কড়া নাড়ছে।

১৪ ডিসেম্বর খবর এল পাকিস্তানি সেনারা গ্রাম ঘিরে ফেলেছে। তারা সন্দেহ করছে, এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন ঘাঁটি আছে। করিম চাচা জানতেন, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ঢাকায় বার্তা পাঠানো দরকার। রাতের অন্ধকারে সাইকেল নিয়ে তিনি বের হলেন। শীতের কুয়াশায় ঢাকা সেই রাত যেন এক অদ্ভুত চ্যালেঞ্জ। করিম চাচা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বার্তা পৌঁছে দিয়ে বললেন, ‘তোমরা তৈরি হও। কাল হয়তো গ্রামে শেষবারের মতো যুদ্ধ হবে।’

৬ ডিসেম্বর বটতলার মানুষ ঘুম থেকে উঠল বন্দুকের গুলির শব্দে। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের ওপর আক্রমণ শুরু করেছে। গ্রামজুড়ে ভয় আর উত্তেজনার পরিবেশ। নারীরা পুকুরের পাড়ে লুকিয়েছে, পুরুষেরা লাঠি ও দা নিয়ে প্রস্তুত। করিম চাচা দেখলেন, পাকিস্তানি সেনারা গ্রামের উত্তর দিক দিয়ে পালাচ্ছে। খবর পেয়ে রাজা আর হাসান সেই পথ দিয়ে তাদের আক্রমণ করল। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল।

ছড়িয়ে পড়ল বিজয়ের আনন্দ। মানুষের চোখে আনন্দাশ্রু। দীর্ঘ ৯ মাসের যন্ত্রণা, ভয় আর শোকের অবসান ঘটেছে। করিম চাচা তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন একেবারে শেষ পর্যন্ত।

যুদ্ধ শেষে গ্রামবাসীর উদ্দেশে করিম চাচা একটি চিঠি লিখলেন। সেখানে লেখা, ‘আজ আমরা বিজয়ী। এই বিজয় শুধু আমাদের নয়, পুরো জাতির। আমার দায়িত্ব শেষ। আমি ডাকপিয়ন করিম, যুদ্ধে ডাকপিয়নের ভূমিকায় থেকে আমার দেশকে সামান্য সাহায্য করেছি। কিন্তু প্রকৃত বিজয়ী তোমরাÑএই গ্রামের মানুষ, যারা সাহস দেখিয়েছ। জয় বাংলা!’

গ্রামের মানুষ করিম চাচার সেই চিঠি আজও সংরক্ষণ করে রেখেছে। বটতলার বিজয়ের গল্পে করিম চাচার ভূমিকা ইতিহাস হয়ে রয়ে গেছে। তিনি শুধু ডাকপিয়ন নন, ছিলেন স্বাধীনতার বার্তাবাহক, একজন নিঃশব্দ যোদ্ধা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়