প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৯:০৪
রামু ও ইয়ামিন

আমি রামু, অপরিচিত রামু। আমাকে চেনে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ আমি এক উন্মাদ। কখন কোথায় থাকি, সেটা কেউই বুঝতে পারে না। যেমন আজ দঁাড়িয়ে আছি বাবু টি-স্টলের পেছনে। এখানে অনেক আবর্জনা। তবু এখানে দঁাড়িয়ে আছি, কারণ আমার মন খারাপ।
আমার মন খারাপ হলে নিরালায় একা দঁাড়িয়ে থাকি। এই জায়গাটা নিরিবিলি। এখানে কেউ আসে না, তাই একা দঁাড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছে। আমি বিশেষ মুহূর্তগুলোতে একা থাকতে ভালোবাসি। আজকের একা থাকার কারণ হলোÑ‘টেনশন’। পৃথিবী এখন যে দিকে যাচ্ছে, তাতে মনে হয় টাকা-পয়সা ছাড়া পৃথিবীতে আর কিছুই থাকবে না।
গবেষণা করলেও পৃথিবীর মূল আর্থিক বিষয় টাকাই। এর বাইরে আর কিছুই পাওয়া যায় না। যে দিকেই তাকাই, শুধু টাকার জন্য হাহাকার ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। এখন মানুষের মেধার কোনো মূল্য নেই, শুধু টাকার মূল্য। একসময় পৃথিবীতে মানুষের মূল্য ছিল, মেধার মূল্য ছিল। তখন সবাই পড়াশোনা করত বিশ্ববিদ্যালয়ে সিট পাওয়ার জন্য, গ্রাজুয়েট হওয়ার জন্য, শিক্ষিত হওয়ার জন্য। শিক্ষা ছিল সমাজ বদলানোর হাতিয়ার।
কিন্তু এখনকার তরুণরা পড়াশোনা ছেড়ে কনটেন্টের পেছনে ছুটছে। কাজের পেছনে ছুটছে। টাকা-পয়সা আয় করা ছাড়া তাদের আর কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই। আগেকার বাবা-ছেলের সম্পর্ক ছিল দারুণ। তাদের গোয়াল ভরা গরু ছিল, মাঠ ভরা ধান ছিল। বাবা-ছেলে মিলে ধান চাষ করত।
এখনকার বাবা-ছেলের সম্পর্কটা টাকার সম্পর্ক। বাবা সন্তান জন্ম দেওয়ার পর থেকেই হিসাব করতে শুরু করে তার পেছনে কত টাকা খরচ হচ্ছে। সেই সন্তান বড় হলে বাবা তার কাছে সেই টাকার হিসাব চায়। সন্তান তখন পড়াশোনা বাদ দিয়ে টাকা রোজগারের পেছনে ছুটে এবং অনেক সময় নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এরপর বাবা-মায়ের ওপর অত্যাচার শুরু করে।
এলাকার মুরব্বি কিংবা তার চেয়ে বয়সে বড় কারও কথার তোয়াক্কা করে না। টাকা রোজগারের জন্য যা খুশি তাই করে। এমনকি ঘরবাড়ি ছেড়েও চলে যায়। এসব কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ হাতের সিগারেট শেষ হয়ে গেল। সিগারেট ফেলে দিয়ে বড় একটা শ্বাস ছাড়লাম। তারপর হঁাটা শুরু করলাম বাড়ির দিকে। মনে মনে চিন্তা করছি কীভাবে টাকা উপার্জন করা যায়।
আমার মাথায় কেবল ব্যবসার কথাই ঘুরছে। কী ধরনের ব্যবসা করা যায়, তা নিয়ে ভাবছি। একবার এক ধরনের ব্যবসার কথা মাথায় আসে, আবার আরেক ধরনের। হঠাৎ ইয়ামিনের সঙ্গে দেখা। ইয়ামিন আমাকে দেখে খুব খুশি হয়ে উঠল।
কিরে, কেমন আছিস?
ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?
ভালো আছি। এখন কী করছিস?
এই তো, কিছু করার জন্য ভাবছি।
ও আচ্ছা। দিনকাল কেমন চলছে?
ভালোই চলছে, বন্ধু। তোর দিনকাল কেমন যাচ্ছে?
এই তো, তোদের দোয়ায় ভালোই যাচ্ছে।
তোদের ফ্যাক্টরি কেমন চলছে?
চলছে, বন্ধু, চলার মতো। অত বেশি কিছু নয়।
ও আচ্ছা। ফ্যাক্টরিতেই যাচ্ছিস বুঝি এখন?
হ্যঁা, হিসাব-নিকাশ করতে যাচ্ছি। শেষ করে ফিরব।
এত দেরি করে ফিরবি?
হ্যঁা, রাত তো হবেই।
কয়টা বাজতে পারে?
বলতে পারি না। বারোটাও বাজতে পারে, আবার একটাও বাজতে পারে। তুই কী করবি?
এই তো, বসে বসে চিন্তা করব।
আচ্ছা, বন্ধু, তোর আব্বু যে মারা গেল, তোদের কাকাদের সঙ্গে আগের মতো মিলমিশ আছে?
আছে, তবে আগের মতো না।
কেমন?
যেমন ধর, আব্বু তো পরিবারের সবচেয়ে বড় ছিল। আব্বু থাকতে সবাই তার কথা শুনে চলত। তাদের অনেক ইতিহাস আছে। বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে। তোর কাছে কি এত সময় আছে?
আমি তো ফ্রি আছি। মোটামুটি সময় আছে। তবে তুই তো আবার ফ্যাক্টরিতে যাবি?
আমার পরে গেলেও চলবে।
তাহলে তো মেলা সময় আছে। বল, শুনি।
আব্বু তো তাদের পরিবারের বড় ছেলে ছিল। তাই ছোটবেলায় কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে আব্বু তার ছোট ভাইদের বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এদিকে আব্বুর দিকে তাকিয়ে সবাই টাকা-পয়সা ধার দিত। সেই টাকা দিয়ে আব্বু তার ছোট ভাইদের বিদেশে পাঠান। কিন্তু আব্বু মারা যাওয়ার পর তারা আর তেমন খেঁাজখবর নেয় না।
আচ্ছা, বন্ধু, চা খাবি?
হ্যঁা।
বাবু ভাই, দুইটা দুধ চা। বন্ধু, সিগারেট কোনটা নিবি?
নে একটা। একটা নিলেই হবে।
ওকে। বাবু ভাই, দুইটা বেনসন দিয়েন।
বন্ধু, তারপর বল।
তারপর মনে কর, আমার তো এত বেশি বয়স হয়নি। তারপরেও ফ্যাক্টরিটা চালু করলাম। আস্তে আস্তে সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছি।
অভিজ্ঞতা এলো কোত্থেকে?
আগে আব্বুর সঙ্গে ফ্যাক্টরিতে যেতাম। তখন থেকেই টুকটাক অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা এখন কাজে লাগাচ্ছি।
ভালো, বন্ধু। কিছু করার চেষ্টা করছিস। এজন্য অনেক সাধুবাদ জানাই।
তাও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
চালিয়ে যা। সফলতা একদিন আসবেই।
হ্যঁা, দেখ। আমি চেষ্টা করছি। দেখি কী করতে পারি।
বলতে বলতে হাতের সিগারেট শেষ হয়ে এলো। ইয়ামিন হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে বলল,
বন্ধু, যাই তাহলে।
আচ্ছা, যা। সাবধানে থাকিস। নিজের খেয়াল রাখিস।
ওকে, বন্ধু।
বলতে বলতে ইয়ামিন গাড়ি নিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আমি পথ ধরে হঁাটা শুরু করলাম। হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে উল্টোপথে হঁাটতে লাগলাম। হঁাটতে হঁাটতে অচেনা আধারে মিশে যেতে লাগলাম।