মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬, ০৮:৪৮

‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ যেভাবে যুগোপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে

ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার
‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ যেভাবে যুগোপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে

শহরে যেখানে শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ শিক্ষক ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে, সেখানে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়ে পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ইন্টারনেট সুবিধা, ডিজিটাল ডিভাইস ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব তাদের শিক্ষাজীবনকে কঠিন করে তুলেছে। এ বৈষম্যের কারণে শুধু শিক্ষার মানেই পার্থক্য তৈরি হচ্ছে না, বরং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রেও একটি বড় ব্যবধান সৃষ্টি হচ্ছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি আরো জটিল। কারণ সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, নিরাপত্তা সমস্যা ও পারিবারিক সীমাবদ্ধতা তাদের শিক্ষায় অংশগ্রহণকে আরো সংকুচিত করে। ফলে একটি সমতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে এ ডিজিটাল বৈষম্য দূর করা অত্যন্ত জরুরি। এ প্রেক্ষাপটে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি একটি সময়োপযোগী ও কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ কর্মসূচির মূল ধারণা প্রতিটি শিক্ষককে একটি ট্যাব বা ডিজিটাল ডিভাইস প্রদান করা, যার মাধ্যমে তারা আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী, অনলাইন কনটেন্ট ও মাল্টিমিডিয়াভিত্তিক পাঠদান করতে পারবেন। ফলে গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষক সংকট থাকলেও একজন শিক্ষক অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে পাঠদান করতে পারবেন এবং শিক্ষার্থীরা শহরের মতো মানসম্মত শিক্ষার অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারবে। এছাড়া ট্যাবের মাধ্যমে শিক্ষকরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নতুন কারিকুলাম সম্পর্কে আপডেট এবং শিক্ষণ পদ্ধতির উন্নয়ন ঘটাতে পারবেন, যা সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৬ সালের এপ্রিলের তথ্যমতে, দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। জরিপে দেখা গেছে শহর এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৭৫ দশমিক ৭ হলেও গ্রামে তা মাত্র ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ শহর ও গ্রামের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবধান ৩২ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট। গ্রাম ও শহরের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা কম্পিউটার ও ল্যাপটপের সীমিত ব্যবহারের সুযোগ। জরিপ মতে, গ্রামের মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারের কম্পিউটারের সুবিধা রয়েছে, যা শহরের তুলনায় (২১ দশমিক ১ শতাংশ) অনেক কম। ব্যক্তিগত পর্যায়েও গ্রামের মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ কম্পিউটার ব্যবহার করার সুযোগ পায়, যেখানে শহরের ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ প্রযুক্তির বিস্তার ঘটলেও তা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। এমন প্রেক্ষাপটে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বৈষম্য কমে আসবে শূন্যের কোঠায়। এছাড়া গ্রামাঞ্চল বা প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষকরা অনেক সময় আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত, ট্যাব সে বৈষম্য কমাতে পারে। যখন শিক্ষক নিজেই আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ হবেন, তখন তার পাঠদান আরো মানসম্মত হবে। এছাড়া শহরের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল বোর্ড, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম থাকলেও গ্রামাঞ্চলে তা প্রায় অনুপস্থিত। এখন যদি প্রত্যেক শিক্ষক একটি ট্যাব পান এবং সেখানে মানসম্মত ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী সংযুক্ত থাকে, তবে গ্রামের শিক্ষার্থীরাও শহরের মতো একই মানের শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অডিও-ভিজুয়াল কনটেন্ট, বড় ফন্ট বা বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করে শেখার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এভাবে প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষাকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক করা সম্ভব, যা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) অধ্যাপক নিকোলাস নিগ্রোপনতে আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল ও প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে শিশুদের শিক্ষায় প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে এমন একটি উদ্যোগ ‘ওয়ান ল্যাপটপ পার চাইল্ড’ হাতে নিয়েছিলেন এবং ব্যাপক সাড়া পেয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব কর্মসূচি একটি যুগোপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হতে পারে। শিক্ষায় ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে, যার মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষককে একটি করে ট্যাব প্রদান করে পাঠদানকে আরো আধুনিক, আকর্ষণীয় ও কার্যকর করা সম্ভব। তবে এ কর্মসূচি দ্রুত ও সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য কিছু সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া অত্যন্ত জরুরি।

প্রথমত, পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সরকারকে এ প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে এবং প্রয়োজনে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সহায়তা নিতে হবে। ট্যাব ক্রয়, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ইন্টারনেট সংযোগ ও রক্ষণাবেক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা থাকতে হবে, যাতে প্রকল্পটি মাঝপথে থেমে না যায়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু ট্যাব প্রদান করলেই হবে না, বরং কীভাবে ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহার করতে হবে, অনলাইন ক্লাস নিতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইন্টারেক্টিভ পদ্ধতিতে পাঠদান করতে হবে, এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ আয়োজন করতে হবে। প্রশিক্ষণ না থাকলে প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। তৃতীয়ত, মানসম্মত ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা জরুরি। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ভিডিও লেকচার, অ্যানিমেশন, কুইজ ও অন্যান্য ইন্টারেক্টিভ উপকরণ তৈরি করে ট্যাবে সংযুক্ত করতে হবে। এতে শিক্ষকরা সহজেই শিক্ষার্থীদের বিষয়বস্তু বোঝাতে পারবেন এবং শিক্ষার্থীদের আগ্রহও বাড়বে। চতুর্থত, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা দরকার। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দিতে হবে। যেখানে ইন্টারনেট সীমিত, সেখানে অফলাইন কনটেন্ট ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখতে হবে, যাতে কোনো শিক্ষক প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে না পড়েন। পঞ্চমত, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ট্যাব নষ্ট হলে দ্রুত মেরামত বা প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

মনিটরিং ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং কোথায় সমস্যা হচ্ছে তা শনাক্ত করে দ্রুত সমাধান নিতে হবে। শিক্ষকদের মতামত গ্রহণ করে কর্মসূচিকে আরো উন্নত করা যেতে পারে। সার্বিকভাবে বলা যায়, সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব, যা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও দক্ষ করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে কর্মসূচির দ্রুত বাস্তবায়ন ও সফলতার জন্য সরকারের পাশাপাশি এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটিকেও এ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে, যাতে তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিশ্চিত হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ তাদের সমর্থন ছাড়া এ উদ্যোগের সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব নয়। সবশেষে বলা যায়, ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি শুধু একটি প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যম। এটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে গ্রাম ও শহরের মধ্যে শিক্ষাগত বৈষম্য অনেকাংশে কমে আসবে এবং শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ পাবে নিজেদের প্রতিভা বিকাশের। বিশেষ করে গ্রামীণ মেয়েদের জন্য এটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। তাই দ্রুত পরিকল্পনা, যথাযথ বাজেট বরাদ্দ ও কার্যকর তদারকির মাধ্যমে এ কর্মসূচিকে বাস্তবে রূপ দেয়া বর্তমানের দাবি। একটি সমতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য একটি টেকসই সমাধান।

ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার : অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়