প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ০১:০৩
প্রাথমিক শিক্ষার প্রকৃত সৈনিক, মেন্টর ও স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ আইকন হাজীগঞ্জের 'জয়নাল আবেদীন'
-----------------রাশেদা আতিক রোজী।

নাম মানুষকে বড় করে না, মানুষই নামকে ঝাঁকিয়ে তোলে। জয়নাল আবেদীন, স্বনামেই যিনি সর্বস্তরে প্রশংসিত ও পরিচিত। কুমিল্লা পিটিআই-এর প্রাক্তন সুপারিনটেনডেন্ট এবং ২০১৮ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত জয়নাল আবেদীন প্রাথমিক শিক্ষা সেক্টরের একজন অত্যন্ত সম্মানিত এবং দক্ষ ব্যক্তিত্ব। তাঁর সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো :
|আরো খবর
১. পরিচয় ও পারিবারিক পটভূমি :
জন্ম ও স্থায়ী ঠিকানা : তিনি চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার কাকৈরতলা গ্রামের এক অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সাফল্যর ভিত্তি : একজন সাধারণ পরিবারের সন্তান হয়েও নিজের মেধা, পরিশ্রম এবং সততার মাধ্যমে তিনি শিক্ষা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
২. জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব (২০১৮) :
২০১৮ সালে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। তৎকালীন মহামান্য রাষ্ট্রপতি বা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে তিনি এই সম্মাননা ও স্বর্ণপদক গ্রহণ করেন। মূলত কুমিল্লা পিটিআইতে থাকাকালীন তাঁর উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ড ও প্রশাসনিক সংস্কার তাঁকে এই উচ্চতায় নিয়ে যায়।
৩. পেশাগত অবদান ও কর্মজীবন :
তিনি কুমিল্লা পিটিআইসহ যেখানেই দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতিকে আধুনিক এবং আনন্দদায়ক করার চেষ্টা করেছেন। শিক্ষা প্রশাসনে তিনি একজন অত্যন্ত সৎ এবং নীতিবান কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। মাঠ পর্যায়ের শিক্ষকদের সাথে তাঁর চমৎকার সমন্বয় ও দিকনির্দেশনা প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বড়ো ভূমিকা রাখছে। হাজীগঞ্জের কাকৈরতলা গ্রামের মেধাবী এই কৃতী সন্তান বর্তমানে দেশের প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে একজন রোল মডেল। তাঁর এই অর্জন চাঁদপুর জেলা তথা সারাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের জন্যে গর্বের বিষয়। তিনি কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তাই নন, বরং একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাবিদ হিসেবে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত জনাব জয়নাল আবেদীনের পেশাগত দক্ষতা এবং কর্মস্পৃহা সম্পর্কে সচেতন মহলে অত্যন্ত ইতিবাচক ধারণা রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে সফলতার পর অধিদপ্তরে তাঁর কাজগুলো বেশ প্রশংসিত।
তাঁর দক্ষতা ও সৃজনশীলতা সম্পর্কে কিছু সুস্পষ্ট দিক নিচে তুলে ধরা হলো :
১. প্রশাসনিক দক্ষতা ও শৃঙ্খলা :
অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক হিসেবে তিনি প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড বজায় রাখা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত কঠোর। মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি শিক্ষকদের সমস্যাগুলো খুব দ্রুত অনুধাবন করতে পারেন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে সেগুলোর সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখেন।
২. সততা ও নীতিগত দৃঢ়তা :
জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের সম্মাননা পাওয়ার একটি বড়ো কারণ ছিলো তাঁর নিষ্কলুষ চারিত্রিক দৃঢ়তা। অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালনকালেও তিনি তাঁর সেই ব্যক্তিগত সততা বজায় রেখেছেন। আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান জিরো টলারেন্স হিসেবে পরিচিত।
৩. সৃজনশীল ও আধুনিক চিন্তাভাবনা :
তিনি কেবল রুটিন মাফিক কাজ করেন না, বরং প্রাথমিক শিক্ষাকে কীভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও আধুনিক করা যায়, তা নিয়ে কাজ করেন। বিশেষ করে ই-মনিটরিং : ডিজিটাল পদ্ধতিতে স্কুল ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও অবদান রয়েছে। প্রশিক্ষণ মডিউল : শিক্ষকদের জন্যে আরও আকর্ষণীয় এবং কার্যকরী প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরিতে তিনি তাঁর সৃজনশীল মেধা কাজে লাগাচ্ছেন।
৪. মানবিক নেতৃত্ব ও নিষ্ঠা :
তিনি একজন 'লিডার' হিসেবে পরিচিত, যিনি সহকর্মীদের ওপর শুধু আদেশ চাপিয়ে দেন না, বরং নিজে সামনে থেকে কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর সাধারণ পারিবারিক পটভূমি হওয়ায় সাধারণ শিক্ষকদের সাথে তিনি সহজেই মিশতে পারেন এবং তাঁদের পেশাগত মানোন্নয়নে ব্যক্তিগতভাবে উৎসাহ প্রদান করেন।
৫. কৌশলগত পরিকল্পনা :
প্রাথমিক শিক্ষার 'স্মার্ট স্কুল' মডেল বাস্তবায়ন এবং সরকারের নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী শিক্ষকদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে তিনি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা প্রণয়নে দক্ষ। জয়নাল আবেদীন একজন অত্যন্ত দূরদর্শী ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা। চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জের কৃতী সন্তান হিসেবে তিনি তাঁর কর্মগুণে নিজেকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের একজন অপরিহার্য ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছেন। তাঁর সৃজনশীল চিন্তা ও নিষ্ঠা দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষ করে স্মার্ট বোর্ড এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছেন।
১. স্মার্ট বোর্ড প্রকল্পের কারিগরি ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব :
প্রাথমিক শিক্ষাকে ডিজিটাল করার লক্ষ্যে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে যে স্মার্ট বোর্ড বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অন্যতম কারিগর তিনি। তিনি শুধু প্রশাসনিক অনুমোদনই নয়, বরং মাঠ পর্যায়ে এই বোর্ডগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্যে প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও গাইডলাইন তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
২. আধুনিক শ্রেণিকক্ষ (স্মার্ট ক্লাসরুম) রূপান্তর :
তিনি বিশ্বাস করেন যে, কেবল বোর্ড দিলেই হবে না, সেটির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর তদারকিতে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের স্কুলগুলোতেও পর্যায়ক্রমে স্মার্ট বোর্ড পৌঁছানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে। প্রথাগত ব্ল্যাকবোর্ড বা হোয়াইটবোর্ডের পরিবর্তে ইন্টারঅ্যাক্টিভ স্মার্ট বোর্ডের মাধ্যমে পাঠদানকে শিশুদের কাছে আনন্দদায়ক করার কাজটিতে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
৩. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন :
স্মার্ট বোর্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কারিগরি দক্ষতা একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ। জয়নাল আবেদীন তাঁর পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে অর্জিত দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি (আইসিটি ট্রেনিং) ডিজাইন করেছেন। স্মার্ট বোর্ডের মাধ্যমে কীভাবে ডিজিটাল কন্টেন্ট প্রদর্শন করতে হয়, সে বিষয়ে সারা দেশের শিক্ষকদের উদ্বুদ্ধ ও দক্ষ করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর কৃতিত্ব অপরিসীম।
৪. স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণ :
সরকার কর্তৃক সরবরাহকৃত এই দামী ইলেকট্রনিক সরঞ্জামগুলোর ক্রয় প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বিতরণ পর্যন্ত স্বচ্ছতা বজায় রাখতে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন। কোনো ধরনের নিম্নমানের সরঞ্জাম যেন স্কুলে না পৌঁছায়, সে বিষয়ে তাঁর কঠোর নজরদারি প্রশংসিত হয়েছে।
৫. উদ্ভাবনী কন্টেন্ট ব্যবহার :
তিনি শিক্ষকদের উৎসাহিত করছেন যেন তারা শুধু পাঠ্যবই নয়, বরং স্মার্ট বোর্ডের ইন্টারনেট সুবিধা ব্যবহার করে বাস্তবধর্মী উদাহরণ ও ভিডিওর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়ান। তাঁর এই সৃজনশীল চিন্তাধারা প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার একটি বড়ো পদক্ষেপ। বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্মার্ট বোর্ড প্রবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার যে লক্ষ্য সরকার নির্ধারণ করেছে, উপ-পরিচালক জয়নাল আবেদীন সেই লক্ষ্য অর্জনে একজন সম্মুখসারির যোদ্ধা। তাঁর এই কৃতিত্ব কেবল যান্ত্রিক সরঞ্জাম বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি শিশুদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ানো এবং শিক্ষকদের ডিজিটাল রূপান্তরের একটি সফল বিপ্লব। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জনাব জয়নাল আবেদীন প্রাক-প্রাথমিক এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার উন্নয়নে যে ভূমিকা রাখছেন, তা শিক্ষা প্রশাসনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত। একজন সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কাজের ধরণ এবং দায়বদ্ধতা অনেকটা একজন 'সফল উদ্যোক্তা' বা সামাজিক সংস্কারকের মতো, যা তাঁকে সাধারণের থেকে আলাদা করেছে।
১. প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন :
তিনি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে কেবল একটি শ্রেণির পাঠদান হিসেবে দেখেননি। তাঁর পরিকল্পনা ও সৃজনশীলতায় : শিশুদের জন্য শ্রেণিকক্ষকে আকর্ষণীয় ও শিশুতোষ করার জন্যে 'প্লে-বেসড লার্নিং' বা খেলাধুলাভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। সারাদেশের স্কুলগুলোতে প্রাক-প্রাথমিক শিশুদের জন্যে আধুনিক শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রশাসনিক ও উদ্ভাবনী ভূমিকা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত।
২. বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য বিশেষায়িত উদ্যোগ :
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় সম্পৃক্ত করা এবং তাদের জন্যে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ সেন্টার চালুর ক্ষেত্রে জয়নাল আবেদীনের অবদান সবচেয়ে উজ্জ্বল। বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ সেন্টার : শিক্ষকদের জন্য এমন কিছু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা তিনি করেছেন, যেখানে অটিজম বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা শিশুদের মনস্তত্ত্ব বুঝে পাঠদানের কৌশল শেখানো হয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা (ইনক্লুসিভ এডুকেশন) : অধিদপ্তরের দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক সরঞ্জাম (যেমন : হুইল চেয়ার, শ্রবণযন্ত্র) বিতরণ এবং স্কুলের অবকাঠামোকে তাদের উপযোগী (র্যাম্প তৈরি ইত্যাদি) করার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছেন।
৩. 'সফল উদ্যোক্তা' সুলভ মানসিকতা :
সরকারি কাজের গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে তিনি একজন উদ্যোক্তার মতো ঝুঁকি নিয়ে নতুন নতুন আইডিয়া বাস্তবায়ন করেন। তাঁর প্রশংসার মূল কারণগুলো হলো : সৃজনশীল সমাধান : সীমিত বাজেটের মধ্যেও কীভাবে প্রযুক্তির সাহায্যে বিশেষ শিশুদের পাঠদান সহজ করা যায়, সেই উদ্ভাবনী চিন্তা তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন। অনুপ্রেরণার উৎস : তিনি মাঠ পর্যায়ের শিক্ষকদের শুধু নির্দেশ দেন না, বরং বিশেষ শিশুদের প্রতি সংবেদনশীল হতে ব্যক্তিগতভাবে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁর এই 'লিডারশিপ' একজন সফল উদ্যোক্তার মতোই প্রভাবশালী।
৪. জাতীয় ও সামাজিক স্বীকৃতি :
হাজীগঞ্জের এই কৃতী সন্তান যখন কুমিল্লা পিটিআইতে ছিলেন, তখনই তিনি এসব মানবিক ও সৃজনশীল কাজের জন্যে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। বর্তমানে অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হিসেবে তাঁর এই কার্যক্রম জাতীয় পর্যায়ে নীতি-নির্ধারণী ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া ও বিশেষ শিশুদের প্রতি তাঁর এই মমত্ববোধ ও পেশাদারিত্ব শিক্ষা অঙ্গনে তাঁকে একজন 'আইকন' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
**সার সংক্ষেপে :
জয়নাল আবেদীনের প্রশংসা কেবল তাঁর পদমর্যাদার জন্যে নয়, বরং প্রাক-প্রাথমিক ও বিশেষ শিশুদের জন্যে তাঁর হৃদয়ের টান এবং কর্মদক্ষতার জন্যে। তাঁর এই উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও মানবিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলছে। জনাব জয়নাল আবেদীনের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সৃজনশীল উদ্ভাবন 'দিনের পড়া দিনে শেষ' মাঠ পর্যায়ে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এটি মূলত প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির একটি কৌশল, যা শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ইনোভেশন সেল কর্তৃক স্বীকৃত ও পুরস্কৃত এই উদ্যোগটির সফলতা ও প্রভাব নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
১. মূল ধারণা ও লক্ষ্য :
এই উদ্ভাবনী উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিলো শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিল থেকে 'ভীতি' দূর করা এবং বাড়িতে প্রাইভেট টিউটর বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো। শ্রেণিকক্ষেই পাঠের শতভাগ প্রস্তুতি সম্পন্ন করার ওপর এখানে জোর দেওয়া হয়।
২. মাঠ পর্যায়ের সফলতা :
মাঠ পর্যায়ে এই মডেলটি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, যার কিছু সুস্পষ্ট ফলাফল হলো : ঝরেপড়া (ড্রপআউট) হ্রাস : পড়া না পারার ভয়ে অনেক শিশু স্কুলে আসতে চায় না। এই পদ্ধতিতে শ্রেণিকক্ষেই পড়া আদায় ও বুঝিয়ে দেয়ায় শিশুদের মধ্যে স্কুলের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে এবং ঝরে পড়ার হার কমেছে। কোচিং নির্ভরতা হ্রাস : বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় যেখানে দরিদ্র অভিভাবকরা প্রাইভেট টিউটর রাখতে পারেন না, সেখানে এই পদ্ধতিটি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। স্কুলের পড়াশোনা স্কুলেই শেষ হওয়ায় অভিভাবকদের ওপর মানসিক ও আর্থিক চাপ কমেছে। শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি : শিশুরা যখন প্রতিদিনের পাঠ প্রতিদিন বুঝতে পারে, তখন তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদী শিখনে সহায়ক হচ্ছে।
৩. ইনোভেশন সেলের স্বীকৃতি ও পুরস্কার :
জনাব জয়নাল আবেদীন যখন পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন, তখন এই উদ্ভাবনী আইডিয়াটি মাঠ পর্যায়ে সফলভাবে প্রয়োগ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর তাঁর এই মডেলটিকে অত্যন্ত কার্যকর এবং 'স্কেলেবল' হিসেবে বিবেচনা করে : তিনি অধিদপ্তরের ইনোভেশন শোকেসিং-এ অংশ নিয়ে তাঁর এই মডেলটি উপস্থাপন করেন এবং শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবক হিসেবে পুরস্কার লাভ করেন। এই স্বীকৃতির পর তাঁর এই কনসেপ্টটি দেশের বিভিন্ন জেলায় মডেল হিসেবে অনুসরণ করার জন্য উৎসাহ প্রদান করা হয়।
৪. সৃজনশীল নেতৃত্বের প্রতিফলন :
'দিনের পড়া দিনে শেষ' কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি বাস্তবায়নের জন্য তিনি শিক্ষকদের বিশেষ পাঠদান কৌশল শিখিয়েছেন। এতে করে শিক্ষকরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কীভাবে আনন্দের সাথে পাঠ সম্পন্ন করা যায়, সেই দক্ষতা অর্জন করেছেন। জাপান থেকে উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এসে জনাব জয়নাল আবেদীন বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে, বিশেষ করে গণিত ও বিজ্ঞানের মতো কঠিন বিষয়গুলোকে শিক্ষার্থীদের কাছে সহজ করার জন্য 'লেসন স্টাডি' কার্যক্রমের একজন পথিকৃৎ ও সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। হাজীগঞ্জের কাকৈরতলা গ্রামের এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই 'শিক্ষার সৈনিক' তাঁর অর্জিত আন্তর্জাতিক জ্ঞানকে যেভাবে দেশীয় প্রেক্ষাপটে কাজে লাগিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
১. লেসন স্টাডি বাস্তবায়নে তাঁর ভূমিকা :
জাপানিজ শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হলো 'লেসন স্টাডি', যেখানে শিক্ষকরা মিলে একটি আদর্শ পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করেন, সেটি পর্যবেক্ষণ করেন এবং ভুলত্রুটি সংশোধন করে পাঠদানকে নিখুঁত করেন। জয়নাল আবেদীন এটি বাংলাদেশে সফলভাবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিচের কাজগুলো করেছেন : গণিত ও বিজ্ঞানে ভীতি দূরীকরণ : তিনি গণিত ও বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে হাতে-কলমে এবং জীবনমুখী উদাহরণের মাধ্যমে শেখানোর জন্যে শিক্ষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সহযোগিতামূলক শিখন : শিক্ষকরা যাতে একে অপরের ক্লাস পর্যবেক্ষণ করে নিজের দক্ষতা বাড়াতে পারেন, সেই সংস্কৃতি তিনি মাঠ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
২. সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি :
একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি একজন উদ্যোক্তার মতো জেদ নিয়ে এই বিদেশি পদ্ধতিকে দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর এই উদ্যোগের সফলতার প্রমাণ হলো : শিক্ষক প্যানেল তৈরি : তিনি দক্ষ শিক্ষকদের একটি পুল তৈরি করেছেন, যারা লেসন স্টাডির মাধ্যমে পাঠদান পদ্ধতিতে উদ্ভাবন নিয়ে আসছেন। শিক্ষার্থীদের শিখনফলের উন্নতি : যেসব স্কুলে এই কার্যক্রম চলেছে, সেখানে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের গড় নম্বর এবং উপস্থিতির হার দুটোই বেড়েছে।
৩. সাধারণ পরিবার থেকে জাতীয় পর্যায়ের অনুপ্রেরণা :
হাজীগঞ্জের একটি অত্যন্ত সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসায় তিনি মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের অভাব ও সীমাবদ্ধতাগুলো বোঝেন। তাঁর এই জীবনসংগ্রাম তাঁকে একজন দরদী ও কর্মনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে : সীমাবদ্ধতাকে জয় : কোনো দামী ল্যাবরেটরি বা আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়াই জাপানিজ টেকনিক ব্যবহার করে কীভাবে স্থানীয় উপকরণ দিয়ে বিজ্ঞান শেখানো যায়, তা তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। সততার প্রতীক : সাধারণ পরিবার থেকে এসে জাতীয় পর্যায়ের স্বর্ণপদক পাওয়া এবং বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা—এই পুরো পথচলায় তিনি তাঁর সততা ও পেশাদারিত্বকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
৪. তাঁর এই লড়াইয়ের মূল দর্শন :
জয়নাল আবেদীন বিশ্বাস করেন যে, জাপানের মতো উন্নতি করতে হলে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার গোড়া মজবুত করতে হবে। তাঁর কাছে 'লেসন স্টাডি' কেবল একটি বিদেশি পদ্ধতি নয়, বরং এটি শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের মেধাবিকাশের একটি শক্তিশালী অস্ত্র।
উপসংহার :
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের এই মেধাবী কৃতী সন্তান প্রমাণ করেছেন যে, সুযোগ এবং সদিচ্ছা থাকলে বিশ্বমানের শিক্ষা পদ্ধতিকেও বাংলাদেশের গ্রামবাংলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। আজ সারা দেশের প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে তিনি কেবল একজন কর্মকর্তা নন, বরং গণিত ও বিজ্ঞানের 'লেসন স্টাডি' কার্যক্রমের একজন আইকন এবং সফল স্বপ্নদ্রষ্টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করা জনাব জয়নাল আবেদীন যখন প্রাথমিক শিক্ষার তৃণমূল পর্যায়ে ইংরেজি বিষয়ের টিএমটি (ট্রেনিং অব মাস্টার ট্রেইনার্স) প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষক বা মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে কাজ শুরু করেন, তখন সেটি এই সেক্টরে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। তাঁর এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং পেশাগত দক্ষতার সমন্বয় ইংরেজি ভীতি দূর করতে এবং শিক্ষকদের দক্ষ করে তুলতে অভাবনীয় সফলতা পেয়েছে।
১. ইংরেজিভীতি দূরীকরণ ও আধুনিক শিখন পদ্ধতি :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর শিক্ষা তাঁকে ইংরেজির ওপর গভীর দখল এনে দিয়েছে। তিনি যখন মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে কাজ করেছেন, তখন প্রথাগত মুখস্থ বিদ্যার বদলে কমিউকেটিভ অ্যাপ্রোচ বা কথোপকথনভিত্তিক ইংরেজি শেখানোর ওপর জোর দিয়েছেন। সফলতা : মাঠ পর্যায়ের শিক্ষকরা যারা ইংরেজিতে কথা বলতে বা পড়াতে দ্বিধা বোধ করতেন, তাঁর সহজ ও সাবলীল উপস্থাপনায় তারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন।
২. টিএমটি প্রশিক্ষণে কারিগরি নেতৃত্ব :
মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে তিনি সারা দেশের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য যে মডিউল ও কৌশল ব্যবহার করেছেন, তা ছিল আন্তর্জাতিক মানের কিন্তু দেশীয় প্রেক্ষাপটে সহজবোধ্য। সফলতা : তিনি ইংরেজি উচ্চারণে শুদ্ধতা (ফনিক্স) এবং ব্যাকরণের জটিল নিয়মগুলোকে খেলার ছলে শেখানোর পদ্ধতি প্রবর্তন করেন, যা প্রশিক্ষণার্থীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছে।
৩. দক্ষ শিক্ষক সমাজ গঠন :
তিনি কেবল নিজে ভালো ইংরেজি জানেন তা নয়, বরং কয়েক হাজার শিক্ষককে 'মাস্টার ট্রেইনার' হিসেবে গড়ে তুলেছেন। সফলতা : তাঁর হাত ধরে তৈরি হওয়া এই ট্রেইনাররা আজ সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করছেন। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব তৈরি করেছে।
৪. বিষয়ভিত্তিক উদ্ভাবনী কৌশল :
ইংরেজি বিষয়ের উপ-পরিচালক বা বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি ডিজিটাল কনটেন্ট এবং অডিও-ভিজ্যুয়াল উপকরণের মাধ্যমে ইংরেজি শেখানোর যে পথ দেখিয়েছেন, তা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য ছিল যুগান্তকারী। সফলতা : স্মার্ট বোর্ড বা মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে ইংরেজি শোনার ও বলার চর্চা (লিসেনিং অ্যান্ড স্পীকিং) বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাঁর নির্দেশিকাগুলো মাঠ পর্যায়ে শতভাগ সফল হয়েছে।
৫. উচ্চশিক্ষা ও মাঠ পর্যায়ের মেলবন্ধন :
সাধারণত উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াতে পারেন না। কিন্তু হাজীগঞ্জের সাধারণ পরিবার থেকে আসা জয়নাল আবেদীন তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জিত জ্ঞানকে একদম প্রান্তিক স্কুলের শিক্ষকের উপযোগী করে তুলে ধরেছেন। সফলতা : এটিই তাঁর সবচেয়ে বড়ো সার্থকতা—যেখানে তিনি তাত্ত্বিক জ্ঞানকে প্রায়োগিক দক্ষতায় রূপান্তর করতে পেরেছেন।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতের আধুনিকায়ন এবং গুণগত মানোন্নয়নে যে কজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা নেপথ্যে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন জনাব জয়নাল আবেদীন। চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার কাকৈরতলা গ্রামের এক অত্যন্ত সাধারণ ও মেধাবী পরিবার থেকে উঠে আসা এই কৃতী সন্তান আজ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। জয়নাল আবেদীন প্রমাণ করেছেন যে, সাধারণ পটভূমি থেকেও অদম্য ইচ্ছা আর সৃজনশীলতা থাকলে জাতীয় পর্যায়ে বড়ো পরিবর্তন আনা সম্ভব। তাঁর সততা, নিষ্ঠা এবং প্রগতিশীল চিন্তা ভাবনা আজ বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে 'স্মার্ট বাংলাদেশ'-এর লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তাই নন, বরং দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কাছে এক অনুপ্রেরণাদায়ী 'প্রাথমিক শিক্ষার প্রকৃত সৈনিক'।
লেখক : ইন্সট্রাক্টর,
উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টার ( ইউপিইটিসি), চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর।
ডিসিকে /এমজেডএইচ








