প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ২০:৩৩
শিক্ষার্থী আত্মহত্যা উদ্বেগজনক
ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। দেশের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপ মতে, ২০২৩ সালে সারা দেশে মোট ৫১৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ২০৪, ছাত্রী ৩০৯ জন। এর মধ্যে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৯৮ জন। রয়েছে স্কুলের ২২৭, কলেজের ১৪০ ও মাদরাসার ৪৮ শিক্ষার্থী। তাদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৩ থেকে ১৯ বছর। শিক্ষার্থী আত্মহত্যার এ সংখ্যা ২০২২ সালে ছিল ৪৪৬ জন, ২০২১ সালে ১০১ জন, ২০২০ সালে ৭৯ জন, ২০১৮ সালে ১১ জন, ২০১৭ সালে ১৯ জন, আর ২০১২ সালে ছিল একজন। ২০২০ সালের মার্চে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে ১৫ মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মানসিক চাপে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। সে বছর দেশে ৫০ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছিল, এদের মধ্যে ৪২ জন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং অধিকাংশই ছাত্রী। উল্লেখ্য, ২০১৯ সাল থেকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরিতে এ ধরনের জরিপের কাজ শুরু করে। জরিপ মতে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছে স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা যা মোট আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীর ৪৬.৮ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা যায় যে, গত ৫০ বছরে সারা পৃথিবীর মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আত্মহত্যার হার ৬০ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশেই ২.০৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংস্থাটির হিসাব মতে, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৭ জন এবং বছরে ১০ হাজার জন আত্মহত্যা করে। আর বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। অর্থাৎ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন, প্রতিদিন ২ হাজার ১৯১ জন এবং প্রতি লাখে প্রায় ১৬ জন আত্মহত্যা করে। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন (আইএএসপি)-এর সূত্রমতে, বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার হার নারীদের চেয়ে পুরুষদের মধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি এবং মোট আত্মহত্যাকারীদের অর্ধেকেরও বেশি (৫৮ শতাংশ) ৫০ বছরের মধ্যে। এ হিসাবে আত্মহত্যার প্রবণতার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দশম স্থানে। অবশ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিবেচনায় আত্মহত্যায় শীর্ষে পৃথিবীর ১০টি দেশ হলো নিম্নরূপ (প্রতি ১ লাখে) : ১) গায়ানা ৪৪.২ শতাংশ, ২) দক্ষিণ কোরিয়া ২৮.৯ শতাংশ, ৩) শ্রীলঙ্কা ২৮.৮ শতাংশ, ৪) লিথুয়ানিয়া ২৮.২ শতাংশ, ৫) সুরিনাম ২৭.৮ শতাংশ, ৬) মোজাম্বিক ২৭.৪ শতাংশ, ৭) নেপাল ২৪.৯ শতাংশ, ৮) তানজানিয়া ২৪.৯ শতাংশ, ৯) কাজাখস্তান ২৩.৮ শতাংশ, ১০) বুরুন্ডি ২৩.১ শতাংশ। দেশের বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার জরিপ অনুযায়ী বিগত ৭-৮ বছরে দেশে শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার প্রায় ৭০ হাজার মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। ডিএমপি, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা অনুযায়ী ২০১৬ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যা করেছেন ১০ হাজার ৭৪৯ জন, ২০১৭ সালে ১০ হাজার ২৫৬ জন, ২০১৮ সালে ১১ হাজার জন, ২০১৯ সালে ১০ হাজারের বেশি, ২০২০ সালে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন, ২০২১ সালে ১১ হাজারের বেশি। জরিপে দেখা যাচ্ছে ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী (বয়ঃসন্ধিকাল) কিশোর- কিশোরীদের মধ্যে আত্মহননের প্রবণতা বেশি। অন্যান্য যেসব কারণগুলো চিহ্নিত হয়েছে সেগুলো হলোÑপারিবারিক কলহ, প্রেমঘটিত জটিলতা, বেকারত্ব, নিঃসঙ্গতা, মানসিক চাপ, তীব্র বিষণ্নতা ইত্যাদি। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি অন্যতম কারণ হচ্ছে পরীক্ষায় পাস-ফেল নিয়ে দুশ্চিন্তা, শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরি না পাওয়া (বেকারত্ব), প্রেমে ব্যর্থতা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, চরম দারিদ্র্য, ডিপ্রেশন বা মানসিক চাপ, আর্থিক টানাপোড়েন, পারিবারিক হতাশা, বিষণ্নতা, অভিমান, মাদকাসক্তি ইত্যাদি আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করছে।
|আরো খবর
শিক্ষার্থীদের আত্মহননের এ প্রবণতা রোধে পারিবারিক, সামাজিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। পড়াশোনার বাইরে শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক নানা কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাস ও একাডেমিক ভবনকে সিসিটিভির আওতায় রাখা উচিত। সন্দেহভাজন শিক্ষার্থীর জন্য সর্বদা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থাকা দরকার।
বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালের সময়টিতে তাদের পারিবারিক বন্ধন, ব্যক্তিগত চাহিদা, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি সবসময় নজরে রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি তাদের আবেগ-অনুভূতি, চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। গরিব শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তাও দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ আত্মহত্যা প্রবণতা রোদে সামাজিক বন্ধনকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে যেন একজন শিক্ষার্থী তার মনের কথা খুলে বলার জন্য সব সময় আস্থার জায়গা খুঁজে পায়, নিজেকে বঞ্চিত ও বিচ্ছিন্ন মনে না করে। তাকে বোঝাতে হবে জীবন অনেক সুন্দর এবং মূল্যবান। জীবনে ভালো-মন্দ, উত্থান-পতন থাকবেই, কখনো হতাশ হলে চলবে না। হতাশা, বঞ্চনা, অভাব, অনটন, চড়াই-উতরাই ইত্যাদি মানুষের সুখ-শান্তি ও সফলতারই অংশ। তাই সফলতার মতো ব্যর্থতাকেও মেনে নেওয়ার শিক্ষা দিতে হবে এবং এগুলো মোকাবিলা করেই জীবনের চরম স্বাদ, সাফল্য ও সৌন্দর্য উপভোগ করতে হবে।
ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার : অধ্যাপক ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, আইআইটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।