সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬, ১৩:২০

শ্রীনগরে কোরবানি ঘিরে খাটিয়া বিক্রির ধুম: নেপথ্যে শতবর্ষের ঐতিহ্য!

আব্দুল মান্নান সিদ্দিক
শ্রীনগরে কোরবানি ঘিরে খাটিয়া বিক্রির ধুম: নেপথ্যে শতবর্ষের ঐতিহ্য!

আবহমান বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মহিমায় আর মাত্র পাঁচ দিন পর উদযাপিত হতে যাচ্ছে মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। ত্যাগ ও উৎসবের এই পুণ্যলগ্ন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কোরবানিদাতাদের ব্যস্ততা। পশু ক্রয়ের সমান্তরালে এখন চলছে আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম সংগ্রহের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। আর এই প্রস্তুতির অন্যতম এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলো কাঠের খাটিয়া—আঞ্চলিক ভাষায় যা 'গুঁড়ি' বা 'কাইট্টা' নামে সমধিক পরিচিত।

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, প্রধান সড়কের মোড় কিংবা ফুটপাতের অস্থায়ী ভাসমান দোকানগুলোতে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সর্বত্রই শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন আকারের খাটিয়া। ক্রেতারা নিজেদের কোরবানির পশুর আকার ও পছন্দ অনুযায়ী ঘুরে ঘুরে দরদাম করে সংগ্রহ করছেন মাংস কাটার এই প্রধান হাতিয়ার। আকার ও কাঠের গুণগত মানভেদে প্রতিটি খাটিয়া বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা পর্যন্ত।

খাটিয়ার ইতিহাস ও নেপথ্য কথা:

মাংস কাটার জন্য এই কাঠের গুঁড়ি বা খাটিয়া ব্যবহারের ইতিহাস প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী। নৃবিজ্ঞান ও লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, মানবসভ্যতায় ধাতব অস্ত্রের আবিষ্কারের পর থেকেই মাংসকে হাড়সহ নিখুঁতভাবে কাটার জন্য একটি শক্ত ও স্থিতিশীল ভিত্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। মাটিতে রেখে মাংস কাটলে ধুলোবালি লাগার আশঙ্কা থাকে, আবার পাথরের ওপর কাটলে চপার বা দায়ের ধার নষ্ট হয়ে যায়। এই ব্যবহারিক সংকট থেকেই গাছের গুঁড়িকে খাটিয়া হিসেবে ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়।

উপমহাদেশে বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলায় তেঁতুল, নিম, গাব, পিঠালি বা বাবলা গাছের কাঠ দিয়ে খাটিয়া তৈরির দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এর মধ্যে তেঁতুল কাঠের খাটিয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় ও দীর্ঘস্থায়ী, কারণ এই কাঠ সহজে ক্ষয়ে যায় না এবং মাংসের সঙ্গে কাঠের গুঁড়ো মিশে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না। যুগ যুগ ধরে কসাই এবং সাধারণ গৃহস্থরা কোরবানির মাংসের টুকরো করার জন্য এই পরিবেশবান্ধব ও টেকসই দেশীয় প্রযুক্তির ওপরই ভরসা করে আসছেন।

মৌসুমী ব্যবসার খতিয়ান:

ঢাকা-দোহার সড়কের পাশে গড়ে ওঠা এক ভাসমান খাটিয়া বাজারে কথা হলো বিক্রেতা মোহাম্মদ মালিক মোল্লার সঙ্গে। পেশাগত জীবনে তিনি একজন পুরোদস্তুর কাঠুরিয়া। বছরের বাকি সময় বিভিন্ন বাগান থেকে গাছ কিনে কাঠ বিক্রির ব্যবসা করলেও, কোরবানির মৌসুমে তিনি রূপ নেন মৌসুমী ব্যবসায়ী হিসেবে।

মালিক মোল্লা জানান, আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে গত ২২ মে থেকে তিনি পুরোদমে খাটিয়া বিক্রি শুরু করেছেন। এবার বাজারে ক্রেতাদের সমাগম এবং চাহিদার পারদ দুটোই বেশ ঊর্ধ্বমুখী। বেচাবিক্রির বর্তমান গতিতে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত এই কেনাবেচার ধুম অব্যাহত থাকবে।

হাটে খাটিয়া কিনতে আসা রতন খান নামের এক সচেতন ক্রেতা জানান, "কোরবানির পশু কেনার পর মাংস কাটার প্রস্তুতি সম্পন্ন করাটাই এখন প্রধান কাজ। বাজারে কাঠের মান বেশ ভালো।" তিনি ৪০০ টাকায় মাঝারি আকারের দুটি খাটিয়া কিনতে পেরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।

যান্ত্রিকতার এই আধুনিক যুগেও মাংস কাটার চিরায়ত অনুষঙ্গ হিসেবে খাটিয়া বা কাঠের গুঁড়ি তার উপযোগিতা ও ঐতিহ্যকে সগৌরবে টিকিয়ে রেখেছে—শ্রীনগরের জমে ওঠা বাজার যেন তারই এক জীবন্ত প্রতিফলন।

ডিসিকে/ এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়