প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ২১:১২
ফরিদগঞ্জে সিমেন্টের বস্তায় ওজনে কম থাকার ঘটনায় তুলকালাম কাণ্ড
সেভেন হর্স সিমেন্টের শুধু তিন বস্তাতেই নয়, তিন দোকানের বেশ ক'টি বস্তায় ওজনে কম থাকার প্রমাণ মিলেছে

ফরিদগঞ্জের বড়ালী এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ভুক্তভোগী কামাল তার ক্রয়কৃত সেভেন হর্স সিমেন্টের বস্তায় ওজনে কম পেয়েছেন। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ঘটনাস্থলে এসে বস্তা পরিমাপে সিমেন্টের পরিমাণ কম পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
|আরো খবর
এদিকে গণমাধ্যমকর্মীরা সিমেন্টের বস্তায় ওজনে কম থাকার ঘটনার বিষয়ে ভুক্তভোগীর বক্তব্যসহ সংবাদ দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ ও চাঁদপুরের স্থানীয় এবং কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশন করে। এই সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর মিথ্যাচার শুরু করেন সেভেন হর্স সিমেন্টের ফরিদগঞ্জের স্থানীয় প্রতিনিধি জুবায়ের এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আলম। সংবাদ প্রকাশের পর তিনি মঙ্গলবার (৭ জুলাই ২০২৬) বিকেলে কোম্পানির প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কোম্পানির অন্যান্য বস্তার সিমেন্টের ওজনের পরিমাপ ঠিক থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্যে সাংবাদিকদের আহ্বান জানান। এরপর কোম্পানির প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একে একে তিনটি দোকানেই সিমেন্টের বস্তা পরিমাপে কম থাকার বিষয়ে সত্যতা পাওয়া যায়।
এদিকে শুধু তিনটি বস্তায় নয়, ওজনে কম থাকায় সিমেন্টের ৫টি বস্তা ভুক্তভোগী কামাল হোসেনকে পরিবর্তন করে দিয়েছে কোম্পানির প্রতিনিধিরা।
ফেসবুকে সাংবাদিকদের নিয়ে সেভেন হর্স সিমেন্টের স্থানীয় প্রতিনিধি ফয়সাল আলমের মিথ্যাচার
সেভেন হর্স সিমেন্টের বস্তায় পরিমাণে কম হওয়ার ঘটনার সংবাদ দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠসহ বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর মিথ্যার আশ্রয় নেন ফয়সাল আলম। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্টে লেখেন,
"সম্প্রতি আমার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানহানিকর সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছি।"
তিনি সম্পূর্ণ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, "সাংবাদিক পরিচয়দানকারী এফএ মানিক, তার সহযোগী শামীম, শাকিল এবং মেহেদী আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এসে আমার সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন এবং একটি বিষয় জোরপূর্বক মীমাংসা করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। আমি কোনো ধরনের অর্থ বা অনৈতিক দাবি মেনে না নেয়ায় পরবর্তীতে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।"
সম্পূর্ণ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে এমনটি দাবি করা ফয়সাল আলমের সঙ্গে কী ধরনের অশোভন আচরণ করেছেন, কে করেছেন, তা তিনি নিশ্চিত করেননি। চারজন সংবাদকর্মীর নামের পূর্বে তিনি 'সাংবাদিক পরিচয়দানকারী' শব্দ ব্যবহার করে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, এরা কেউই সাংবাদিক নন। অপসাংবাদিক/হলুদ সাংবাদিকতাকে ইঙ্গিত দিয়েছেন। অথচ সাংবাদিক শামীম হাসান দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ ও আরটিভি-এর প্রতিনিধি, শাকিল হাসান দৈনিক নয়া দিগন্ত ও দৈনিক চাঁদপুর প্রতিদিনের প্রতিনিধি, মেহেদী হাসান দৈনিক ডেসটিনি ও দৈনিক চাঁদপুরের প্রতিনিধি এবং এফএ মানিক দৈনিক স্বদেশ বিচিত্রা ও দৈনিক প্রিয় চাঁদপুরের প্রতিনিধি।
তিনি তাঁর ফেসবুক পোস্টে আরও উল্লেখ করেন, "একটি বিষয় জোরপূর্বক মীমাংসা করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।" কোন্ বিষয় জোরপূর্বক মীমাংসা করার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে, কে করেছেন, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
তিনি পোস্টের শেষ অংশে আরও উল্লেখ করেন, "আমি কোনো ধরনের অর্থ বা অনৈতিক দাবি মেনে না নেয়ায় পরবর্তীতে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।"
ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তাদের পরিমাপে যে ক'টি বস্তায় সিমেন্ট কম ছিল, সংবাদে তা-ই উল্লেখ করা হয়েছে এবং ভুক্তভোগীর অভিযোগের বাইরে সংবাদে কোনো বিষয় না থাকা সত্ত্বেও সংবাদ প্রকাশের পর তিনি সাংবাদিকদের হেয় প্রতিপন্ন করে ফেসবুকে পোস্ট করেন।
তিন দোকানের ১৫ বস্তা সিমেন্টের ছয়টিতেই পরিমাণে কম
সেভেন হর্স সিমেন্টের কোম্পানির প্রতিনিধিদের সিমেন্টের ওজন পরিমাপের জন্য আহ্বান করা হলে সেভেন হর্স সিমেন্ট বিক্রি করা হয় এমন ক'টি দোকানে সাংবাদিকরা গিয়ে দেখেন, কোম্পানিটির স্থানীয় প্রতিনিধি ফয়সাল আলমের নিজ দোকান বাসস্ট্যান্ডস্থ জুবায়ের এন্টারপ্রাইজে ৫টি বস্তার ১টিতে সঠিক পরিমাণ সিমেন্ট থাকলেও বাকি চারটিতেই ছিল পরিমাণে কম। সর্বোচ্চ ১ কেজি ৫০০ গ্রাম কম পাওয়া যায়। ফরিদগঞ্জ চৌরাস্তা এলাকার আল-মদিনা এন্টারপ্রাইজের একটি বস্তায় ৩০০ গ্রাম কম পাওয়া গেছে। রূপসা রাস্তার মাথা সংলগ্ন মাজেদা এন্টারপ্রাইজের ১টি বস্তায় ৩০০ গ্রাম কম থাকার প্রমাণ মিলেছে। মাজেদা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ওমর ফারুক নিশাতের কাছে সিমেন্টের বস্তায় পরিমাণে কম থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কয়েকটি বস্তায় কম থাকার বিষয়টি দুঃখজনক। কোম্পানির কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেনো পরিমাপের বিষয়ে নজর দেয়।
এদিকে সিমেন্টের বস্তায় কম পাওয়ার পাশাপাশি একটি বস্তায় ৫১ কেজি ৮০০ গ্রাম পর্যন্ত পাওয়া যায়। কিন্তু সেভেন হর্স সিমেন্টের চাঁদপুর জোনের এরিয়া ম্যানেজার মতিউর রহমান দাবি করেন, মেশিনে বেল্টের মাধ্যমে ৫০ কেজির সঠিক পরিমাপে সিমেন্টের প্যাকেজিং হয়ে থাকে।
কোম্পানির স্থানীয় প্রতিনিধি ফয়সালের অপপ্রচারের দায় নেবে না সেভেন হর্স কোম্পানি
সংবাদ প্রকাশের পর ডরিয়ন গ্রুপের সেভেন হর্স সিমেন্টের ফরিদগঞ্জের স্থানীয় প্রতিনিধি ফয়সাল আলম ফেসবুকে সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করে মিথ্যাচার করেন। ফয়সালের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডির পোস্টের দায়ভার ফয়সালের নিজের, তার দায়ভার কোম্পানি নেবে না। ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে এমন মন্তব্য করেন সেভেন হর্স সিমেন্টের চাঁদপুর জোনের এরিয়া ম্যানেজার মতিউর রহমান। ফের প্রশ্ন করা হয়, কোম্পানির অনুমোদিত প্রতিনিধির কোম্পানির পণ্যকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনায় দায় কোম্পানি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে কি না। এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কোম্পানির নিজস্ব ফেসবুক পেজের বিষয় তো নয় এটি। এ ঘটনায় ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিলেও কোম্পানিকে জড়াবেন না।
সাংবাদিকদের নামে অর্থ দাবির অভিযোগে ফরিদগঞ্জ থানায় জিডি
ফরিদগঞ্জে সেভেন হর্স সিমেন্টের বস্তায় ওজনে কম থাকার অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মিথ্যা, মানহানিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ আনার দাবি তুলে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন এক সাংবাদিক।
বুধবার (৮ জুলাই ২০২৬) ফরিদগঞ্জ থানায় দায়ের করা জিডিতে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি ভুক্তভোগী কামাল হোসেনের অভিযোগের ভিত্তিতে সেভেন হর্স সিমেন্টের বস্তায় ওজনে কম থাকার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই সংবাদ প্রকাশের পর ফরিদগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকার জোবায়ের এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ও সেভেন হর্স সিমেন্টের স্থানীয় প্রতিনিধি ফয়সাল আলম তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে সাংবাদিক এফএ মানিক, শামীম হাসান, মেহেদী হাছান ও শাকিল হাসানের নাম উল্লেখ করে একটি পোস্ট দেন।
জিডিতে দাবি করা হয়, ওই পোস্টে চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অশোভন আচরণ করা, একটি বিষয় জোরপূর্বক মীমাংসার জন্যে চাপ প্রয়োগ করা এবং অর্থ বা অনৈতিক দাবি আদায়ের চেষ্টা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারী এসব বক্তব্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
জিডিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ফেসবুকে প্রকাশিত ওই পোস্ট সাংবাদিকদের পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে এবং দায়িত্ব পালনেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে বিষয়টি ভবিষ্যতের জন্যে নথিভুক্ত রাখা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণের আবেদন জানানো হয়েছে।
জিডিতে এফ এ মানিক বাদী হয়ে ফয়সাল আলমকে বিবাদী করা হয়েছে। সাক্ষী হিসেবে শামীম হাসান সজীব, মেহেদী হাছান ও মুহাম্মদ শাকিল হাসানের নাম রয়েছে।
ফরিদগঞ্জ থানা সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগটি সাধারণ ডায়েরি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।







