প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ২১:১৮
পরিবেশ দূষণ, বাল্যবিবাহ ও মাদকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের লালকার্ড ঘোষণা
প্রতিরোধে সামাজিকভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান

পরিবেশ সুরক্ষা কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে এবং পরিবেশ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), চাঁদপুর আয়োজন করেছে আলোচনা সভা, কুইজ প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ।
|আরো খবর
'এখনই জলবায়ু পদক্ষেপের সময়' (নাউ ফর ক্লাইমেট) স্লোগানকে সামনে রেখে জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং অভিযোজনের জন্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর গুরুত্বারোপ করে সোমবার (২২ জুন ২০২৬) পুরাণবাজার নুরিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সনাকের সভাপতি মো. আলমগীর পাটওয়ারীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুর জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মিজানুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন চাঁদপুর জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাছিমা বেগম।
প্রধান অতিথি বলেন, আমাদের চারপাশের পরিবেশকে আমাদেরই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আমাদেরকে পরিবেশের পাশাপাশি প্রতিবেশের প্রতিও নজর দিতে। প্রতিবেশ ব্যবস্থা সুন্দর না থাকলে আমরা ভালোভাবে বসবাস করতে পারতাম না। পরিবেশের জন্যে আরেকটি অন্যতম উপাদান হলো জলবায়ু পরিবর্তন। আর জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যে সবচেয়ে বড় উপাদান হলো কার্বন ডাই অক্সাইড। পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আমাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, পরিবেশ রক্ষার জন্যে প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা খুবই প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ না হলে এবং জনগণ সচেতন না হলে পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তিনি বলেন, মাইক্রো প্লাস্টিক আমাদের শরীরের জন্যে খুবই ক্ষতিকর। আমাদের আঙ্গিনা থেকে শুরু করে আশপাশে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আছে কিনা তা লক্ষ্য রাখতে হবে। পরিবেশ দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। আপনারা যদি কাউকে পরিবেশ দূষণ করতে দেখেন বা পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করতে দেখেন তাহলে ৩৩৩-এ কল করবেন বা আমাদেরকে জানাবেন। সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকে প্লাস্টিক বর্জ্য ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তিনি এমন একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্যে সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাছিমা বেগম বলেন, পরিবেশের পাশাপাশি আমাদেরকে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শিক্ষার্থীকেই ভূমিকা রাখতে হবে। বাল্যবিবাহ আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সমাজে এটা প্রতিনিয়ত ঘটছে। এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীদেরকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। এছাড়া পরিবারকেও এ ব্যাপারে আরও বেশি সচেতন থাকতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদেরকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ১০৯ হেল্পলাইনে ফোন করেও আমরা সহযোগিতা নিতে পারি। তিনি এ ধরনের একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্যে সনাককে ধন্যবাদ জানান।
সনাকের সাবেক সভাপতি ও সদস্য কাজী শাহাদাত বলেন, পরিবারের অভাব অনটনের কারণে অনেক ছেলেমেয়ে লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়ে। সুশিক্ষা, পারিবারিক অভাব অনটন, সচেতনতার অভাবে বাল্যবিবাহের হার বাড়ছে। এ ব্যাপারে প্রশাসন ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরকে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, বাল্যবিবাহের ব্যাপারে তোমাদেরকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি তোমার দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষায় জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং অভিযোজনের জন্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরে গুরুত্বারোপ করতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশের জন্যে আইনের ঘাটতি, বিদ্যমান আইনের সীমিত প্রয়োগ এবং পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ অবকাঠামোর অভাব নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরসহ বাংলাদেশের পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
সনাক সভাপতি মো. আলমগীর পাটওয়ারী বলেন, আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের জায়গা থেকে বৃক্ষরোপণ করবো। কারণ, গাছ আমাদের পরিবেশকে ও আমাদের জীবনকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তিনি বলেন, শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তোমাদেরকে মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করতে হবে। বাল্যবিবাহ ও মাদককে না বলতে হবে। এগুলো থেকে আমাদেরকে দূরে থাকতে হবে। বাল্যবিবাহ ও মাদকের বিরুদ্ধে আমাদেরকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
টিআইবি’র এরিয়া কো-অর্ডিনেটর মো. মাসুদ রানার সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন পুরাণবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. চাঁদ মিয়া, স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি অ্যাড. মো. তৌহিদুল ইসলাম তরুণ, স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. বুলবুল আহছান, সনাক সদস্য রফিক আহমেদ মিন্টু, মো. হাবীবুর রহমান পাটওয়ারী, পুরাণবাজার নুরিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়কেন্দ্রিক এসিজি গ্রুপের সমন্বয়কারী মো. ফজলুর রহমান রুবেল। দিবসের উপর ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ইয়েস গ্রুপের দলনেতা জান্নাতুল ফেরদাউস, পুরাণবাজার নুরিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অর্পা পাল ও আপন দাস। অনুষ্ঠান শেষে কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পুরস্কার প্রাপ্তরা হলেন : ১০ম শ্রেণির মেহেরুন আক্তার, হাবিবা আক্তার ও মাহবুবা রহমান এবং ৯ম শ্রেণির জান্নাতুল মাওয়া, তাহমিনা আক্তার ও নূরনবী।
সভায় পরিবেশ দূষণ, বাল্যবিবাহ ও মাদকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা লালকার্ড ঘোষণা করে। বক্তারা এর প্রতিরোধে সামাজিকভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।
সভায় টিআইবি সংশ্লিষ্ট অংশীজনের জন্যে নিম্নলিখিত সুপারিশসমূহ উপস্থাপন করেন : জীবাশ্মভিত্তিক উৎস থেকে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে স্থানান্তরের জন্যে একটি সময়োপযোগী ও সমন্বিত জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করতে হবে; নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এই খাতসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর হ্রাস করতে হবে এবং ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করতে ভর্তুকি ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে; নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে; কার্যকর জলবায়ু প্রশমনের জন্য বৈদ্যুতিক যানবাহন ও সোলার প্যানেল ব্যাটারিসহ বিবিধ যন্ত্রাংশকে ‘ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১’-এর আওতায় বর্জ্যর শ্রেণীবিভাগের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে; পরিবেশ আদালত আইন ২০১০ সংশোধন করতে হবে এবং পরিবেশ সংরক্ষণে বা জনস্বার্থে ভুক্তভোগী ও সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিবেশ আদালতে সরাসরি মামলা করার সুযোগ তৈরি করতে হবে; পরিবেশ বিষয়ক সংঘঠিত অপরাধ বন্ধে বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলা সংক্রান্ত আইন, নীতি ও পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর অভিযোজন ও টিকে থাকার ক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত কার্যক্রমে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে গুরুত্বারোপ করতে হবে; জলাভূমি দখল ও বন উজাড় বন্ধের মাধ্যমে পরিবেশের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর প্রাকৃতিক সম্পদকেন্দ্রিক অভিযোজনের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে; প্লাস্টিক দূষণসহ অকার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা ঢেলে সাজাতে হবে; দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট ই-বর্জ্য কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে তার নির্দেশনা সম্বলিত একটি ‘দুর্যোগকালীন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রটোকল’ প্রস্তুত করতে হবে; পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নবায়নযোগ্য জ¦ালানির প্রসার সংক্রান্ত কার্যক্রমে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে এবং জ্বালানি ও পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এই খাতগুলোতে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্তপূর্বক দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পুরাণবাজার নুরিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ, সনাক-চাঁদপুরের সদস্যবৃন্দ, অ্যাকটিভ সিটিজেন গ্রুপ (এসিজি) ও ইয়েস গ্রুপের সদস্যবৃন্দ এবং টিআইবি’র কর্মীবৃন্দ।--প্রেস বিজ্ঞপ্তি।
ক্যাপশন :
বিশ্ব পরিবেশন দিবস ২০২৬ উপলক্ষে সনাক-চাঁদপুরের আয়োজনে আলোচনা সভা, কুইজ প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছেন পরিবেশ অধিদপ্তর, চাঁদপুরের উপ-পরিচালক মো. মিজানুর রহমান।







