রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩০

রূপসা দক্ষিণের নারী ভোটাররা জড়তা-ভয়-শঙ্কা কাটিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়াবেতো?

প্রবীর চক্রবর্তী
রূপসা দক্ষিণের নারী ভোটাররা জড়তা-ভয়-শঙ্কা কাটিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়াবেতো?

ভোট এলেই ফি বছর গণমাধ্যমকর্মী, স্থানীয় প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, জনপ্রতিনিধি সকলেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেন বছরের পর বছর ভোট না দিয়ে সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীদের ঘিরে। সভা সেমিনার অনেক কিছুই হয়। কিন্তু দিনশেষে অনেকটা অশ্বডিম্ব প্রসবের মতো অবস্থা হয়। গত ষাট বছরেও এই ইউনিয়নের নারীরা ঘরের বাইরে বেরিয়ে সকল কাজ করলেও ভোটের বেলায় পিছিয়ে। পীরের পর্দানশীন থাকার অনুরোধের কথাটি ভিন্ন ব্যাখ্যায় ভোট না দেয়ার অজুহাতে সাড়া দিয়ে দীর্ঘকাল ভোট দেয়া থেকে বিরত ছিলো। শেষ ২/৩টি নির্বাচনে নারীরা ভোট দিলেও তা শতকরা হারের মধ্যেও পড়ে না। যারাই দিয়েছেন তারা হয় প্রার্থীদের নিকট স্বজন বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিকট স্বজন। যদিও তাদের মনেও ভয় ও শঙ্কা ছিলো, যদি কিছু হয়। কিন্তু তারাই এখন বলছে, কিছুই হয়নি। তাই এবার নারীরা ভোট দিতে আসবে--তাদের বিশ্বাস। এর সাথে এ বছর যুক্ত হয়েছে প্রার্থীদের প্রচারণা। বিশেষত বিএনপি প্রার্থীর বাড়ি ওই ইউনিয়নে হওয়ায় এবং জামায়াত প্রার্থীর নারী ভোট নিয়ে প্রচারণার কারণেই। তবে সকলেই বলছেন, জড়তা-ভয়-শঙ্কা কাটিয়ে নারীরা ভোটের লাইনে দাঁড়াবেতো?

ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা। উপজেলার সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে এই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের কাছ থেকে। পুরুষরা প্রবাসে থাকার কারণে এই ইউনিয়নের নারীরাই হাটবাজার থেকে সকল কাজই করে। কিন্তু ভোটের বেলাতেই ব্যত্যয় ঘটেছে এই ইউনিয়নে। গত প্রায় ৬০ বছর ধরে এই এলাকার সকল ধর্মের নারীরা বলতে গেলে ভোট দেন না। উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে মোট ভোটার ২১ হাজার ৬৯৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১০ হাজার ২৯৯জন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৯ সালে ভারতের জৈনপুর থেকে আগত পীর মওদুদল হাসান কলেরা মহামারীর সময় নারীদের পর্দা মেনে চলার জন্যে নির্দেশ দেন। কিন্তু নারীদের ভোট দিতে নিষেধ করেছেন পীর, এমন কথা ছড়িয়ে দিয়ে ওই সময়ের পরবর্তী যেসব জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোতে নারীদের ভোট প্রদান থেকে বিরত রাখা হয়। যা পরবর্তীতে এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়। এমন বিশ্বাস থেকেই হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব ধর্মের নারীরা ভোট দেয়া থেকে বিরত রয়েছেন। যদিও সর্বশেষ দু-তিনটি নির্বাচনে প্রশাসন ও নানামুখী তৎপরতার কারণে প্রার্থীদের নিকট স্বজনরা ভোট দিয়েছেন। কিন্তু তা একবারেই নগণ্য। ভোট দেয়ার জন্যে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার চিরচেনা সেই দৃশ্য এখানে অনুপস্থিত।

স্থানীয়ভাবে দেখা যায়, ভোট না দিলেও নারীরা নিয়মিত বাজার, মার্কেটসহ দৈনন্দিন নানা কাজে বাইরে যাচ্ছেন। শিক্ষাসহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন তারা এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করছেন সমানভাবে। কিন্তু ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে এখনো এক ধরনের ভীতি ও প্রথাগত বাধা কাজ করছে তাদের মধ্যে।

রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের সংরক্ষিত আসনের ইউপি সদস্য খুকি বেগম জানান, বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময়ে কিছু সংখ্যক নারী ভোট দিয়েছেন। এ বছর আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি, নারীরা যেনো পর্দা মেনে দল বেঁধে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়।

ষাটোর্ধ্ব খোতেজা বেগম জানান, আমি আমার বাপের বাড়ি রায়পুরে ভোট দিয়েছি। কিন্তু স্বামী বাড়ি এই ইউনিয়নে এসে আর ভোট দিতে পারিনি। এখানে নারীরা ভোট দেয় না, তাই আমারও দেয়া হয়নি। তবে এবার যদি নারীরা ভোট দেয়, তাহলে আমিও ভোট দেবো।

স্থানীয় রাজনীতিবিদ কাউছার আহমেদ, ফজলুক হক জানান, জৈনপুরের পীর সাহেব কখনো নারীদের ভোট না দেয়ার কথা বলেন নি। তিনি নারীদের পর্দা মেনে চলার কথা বলেছেন। মূলত ভয়-আতঙ্ক ও দীর্ঘদিনের জড়তার কারণে নারীরা ভোট কেন্দ্রে যান না। তাছাড়া এক শ্রেণির মানুষ রয়েছেন, যারা নিজেদের সুবিধার জন্যে নারীদের ভোট দিতে কৌশলে বাধা দেয়। এ বছর রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মহসিন হাসান বলেন, নারী ভোটারদের উপস্থিতি বাড়াতে বেশ কয়েকবার স্কুল-কলেজসহ বাড়ি বাড়ি উঠান বৈঠক করেছি। তবে আগের তুলনায় নারী ভোটাররা সচেতন হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শাহজাহান মামুন বলেন, রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারী ভোটারদের অতীতে কয়েকবার তাদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করেও পুরোপুরি ফলপ্রসূ হওয়া যায় নি। আমাদের এখনো চেষ্টা রয়েছে নারী ভোটারদের উপস্থিতি বাড়ানোর। বিশেষ করে প্রার্থীদের মাধ্যমে হলেও নারীদের কেন্দ্রমুখী করা এবং ভোট প্রদানে উদ্বুদ্ধ করা।

এ বিষয়ে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, নারীদের ভোট দেয়ার জন্যে গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্যে আমরা কাজ করছি। কয়েকদিনের মধ্যেই ওই ইউনিয়নে উদ্ধুব্ধকরণ সভা হবে। আশা করছি ফলপ্রসূ হবো।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী লায়ন মো. হারুনুর রশিদ এই বিষয়ে বলেন, এবার নারীরা ভোট দেবেন। ভয় ডিঙ্গিয়ে ভোট কেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়েই তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট প্রদান করবেন। আমি ও আর দলের নেতাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করেছি।

জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা বিল্লাল হোসেন মিয়াজী বলেন, নারী ভোটারদের ভোট দিতে উৎসাহিত করতে আমাদের নারী সদস্যরা কাজ করছেন। আমি নিজেও ইতঃপূর্বে তিনটি সভায় বক্তব্যে ভোট নিয়ে কথা বলেছি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়