প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৬
মাদকাসক্তি মুক্তিতে ক্রীড়াচর্চার ভূমিকা

আজকের সহজলভ্য প্রযুক্তির যুগে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর যুবসমাজকে ধ্বংসের সবচেয়ে বড় হুমকি হলো মাদকাসক্তি। গলিতে-ঘুপচিতে, যত্রতত্র মাদক যেমন সহজলভ্য, তেমনি সহজে অনুপ্রবেশ্য। মাদকের এই করাল থাবা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে হলে কেবল আইন প্রয়োগ কিংবা আইন প্রণয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সমাজে মাদককে দুর্লভ ও দুর্মূল্য করার পাশাপাশি যুবসমাজের নৈতিক চরিত্র বিনির্মাণে বিকল্প পন্থা অবলম্বন করা দরকার। বিকল্প পন্থা হিসেবে ক্রীড়া চর্চার ওপর গুরুত্ব আরোপ একটি ভালো সমাধান হতে পারে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আজকের যুবসমাজের হাতে অলস সময় থাকাটাই তাদের মাদকাসক্তির একটি বড় কারণ। কাজেই তাদেরকে ব্যস্ত রাখতে হবে এমনভাবে, যেন কোনো অলস সময় হাতে না থাকে। তাদের জন্যে ইনডোর ও আউটডোর গেমের পরিকল্পনা করতে হবে। তার আগে পাড়ায় পাড়ায় একটা খেলার মাঠ থাকা জরুরি এবং তার সাথে একটা ক্লাবঘর থাকাও বাঞ্ছনীয়Ñঅনেকটা স্কুল-কলেজের কমনরুমের মতো। ক্লাবঘরগুলোতে প্রশাসনিক তদারকির ব্যবস্থা থাকবে জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে। এতে দাবা, টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন আর ক্যারমের মতো ইনডোর খেলাগুলোর ব্যবস্থা থাকবে। এই ক্লাবঘরগুলো প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে। এরপর ক্লাবঘরগুলোতে তালা মারা থাকবে, যাতে সেখানে কোনো বাজে আড্ডা বা জুয়ার আসর না বসে। পাড়ার মাঠগুলোতে মৌসুম অনুযায়ী ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল খেলার চর্চা গড়ে তোলা হবে। যুবসমাজকে যত বেশি ব্যস্ত রাখা যাবে, তত বেশি তাদের বেপথু হওয়ার সুযোগ কমে যাবে।
শরীরকে যত বেশি ক্রীড়াচর্চায় ব্যস্ত রাখা যাবে, তত বেশি দেহের বিভিন্ন অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি থেকে নানাবিধ হরমোন নিঃসৃত হবে। এসব হরমোনের মধ্যে কয়েক ধরনের হ্যাপি হরমোন বা ঋববষ এড়ড়ফ ঐড়ৎসড়হব আছে। যেমন : ১. এন্ডরফিন, ২. ডোপামিন, ৩. সেরোটোনিন, ৪. অক্সিটোসিন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা থেকে দেখা গেছে, কেউ যদি একটানা কুড়ি থেকে তিরিশ মিনিট মধ্যমানের শারীরিক কসরত করেÑ যাতে কথা বলা যায় কিন্তু গান গাওয়ার মতো দম থাকে না, তবে এ ধরনের শারীরিক কসরতে হ্যাপি হরমোনগুলো নিঃসৃত হয়। যারা এ মাত্রার ব্যায়াম করেন, তাদের শরীরে ব্যায়ামের আধা ঘণ্টা পর পর্যাপ্ত পরিমাণ হ্যাপি হরমোন নিঃসৃত হয়। ষাট শতাংশের ওপরে হ্যাপি হরমোন নিঃসরণ করাতে হলে খুব কঠিন মাত্রার শারীরিক ব্যায়াম দরকার। এ ধরনের শারীরিক কসরত ফুটবল বা বাস্কেটবল খেলার মাধ্যমে করা সম্ভব। যারা পৌনে এক ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা খেলাধুলা করে, তাদের শরীরে উচ্চমাত্রার হ্যাপি হরমোন নিঃসৃত হয়।
শরীরে হ্যাপি হরমোন নিঃসৃত হলে সুনিদ্রা হয়, মেজাজ ভালো থাকে, কোনো রকমের বেদনাবোধ থাকে না, মন ফুরফুরে থাকে। কাজকর্মে সহজেই মনোনিবেশ করা যায়। কাজেই খেলাধুলা করলে বা ক্রীড়াচর্চায় ব্যস্ত থাকলে অলস সময় যেমন কেটে যায়, নিঃসঙ্গতা ও বিষণ্নতা যেমন উবে যায়, তেমনি মানসিক প্রফুল্লতা আসে; মনে কোনো নেতিবাচক চিন্তা বাসা গাড়তে পারে না।
যারা নিয়মিত খেলাধুলা করে, তাদের দেহে কিছু কিছু এনজাইমের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এর মধ্যে কতিপয় লিভার এনজাইম, হেক্সোকাইনেজ, ফসফোফ্রুক্টোকাইনেজ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব এনজাইম আমাদের শরীরের নানাবিধ বিপাকীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে দেহ নিরোগ থাকে এবং সুস্থ মানসিক অবস্থা বজায় থাকে। এ বিষয়টি মাদকাসক্তি থেকে যুবকদের দূরে রাখার জন্যে সহায়ক।
যারা আউটডোর ক্রীড়ায় উৎসাহী নয়, তাদের অনলাইন দাবা গেমে ব্যস্ত রাখা যায়। বিভিন্ন মেয়াদে উপজেলা, জেলা ও দেশব্যাপী বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত অনলাইন দাবা প্রতিযোগিতা চালু রাখলে, যাদের হাতে অলস সময় থাকে এবং যারা সুস্থ সময় কাটানোর সুযোগের অভাবে মাদকের দিকে হাত বাড়ায়, তারা শৃঙ্খলায় আসতে পারে।
শুধু সনদনির্ভর প্রজন্ম তৈরি না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মানুষ তৈরির কারখানা হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে বৈকালিক সময়ে ব্যস্ত রাখলেও মাদকাসক্তির প্রবণতা কমে যেতে পারে। আগেকার দিনে মাদক যেমন সুলভ ছিলো না, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক বৈকালিক খেলাধুলার চর্চাও অবারিত ছিলো। ফলে জিপিএধারী মাদকাসক্তের চেয়ে দেশপ্রেমিক মানুষ তৈরি হয়েছে বেশি।
প্রজন্মকে মাদকমুক্ত রাখার জন্যে বলা হয়Ñ কাউকে নিঃসঙ্গ থাকতে দেওয়া যাবে না, কাউকে অসময়ে ঘরের বাইরে থাকতে দেওয়া যাবে না। উঠতি বয়সের কোনো তরুণ-তরুণীকে অতিরিক্ত প্রাইভেসির স্বাধীনতা দেওয়ার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। পরিবার এবং অভিভাবকের নখদর্পণে থাকতে হবে সকল কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীর প্রতিটা পদক্ষেপ। পাশাপাশি অলস সময়ে ক্রীড়াচর্চায় ব্যস্ত রেখে তাদের মধ্যে সঠিক জীবনবোধ তৈরি করতে হবে। তাহলেই হয়তো বা আমাদের এই কৃত্রিম যুগের মাদকের ভয়াবহতা রোধ করা যাবে।








