প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২১, ০০:০০
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে প্রথমবার জিতলো বাংলাদেশ

অস্ট্রেলিয়ার সাথে টি-টোয়েন্টিতে প্রথমবারের মতো জিতলো বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার সাথে বাংলাদেশের এই দ্বিপাক্ষিক সিরিজের প্রথম ম্যাচে জয়ের সাথে সাথে রেকর্ডও হয়েছে কয়েকটি।
|আরো খবর
স্বপ্নময়, দুর্দান্ত, অবিশ্বাস্য! পুঁজি ছিল মাত্র ১৩১ রানের। সামনে অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রতিপক্ষ। টি-টোয়েন্টিতে এমন পুঁজি নিয়ে যে কোনো দলের সঙ্গেই তো লড়াই করা কঠিন!
ইনিংসের প্রথম বলেই অ্যালেক্স ক্যারের উইকেট ভাঙলেন শেখ মেহেদি হাসান, দ্বিতীয় ওভারের চতুর্থ বলে জশ ফিলিপকে মায়াজালে ফেললেন নাসুম আহমেদ, পরের ওভারের প্রথম বলে ময়সেস হেনরিকসকে বোকা বানালেন সাকিব আল হাসান। মাত্র ১১ রানের মধ্যে ৩ উইকেট হারিয়ে অথৈ সাগরে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। সেখান থেকে আর তাদের উঠতে দেয়নি বাংলাদেশ দলের বোলাররা। তিন নম্বরে নামা ইনফর্ম ব্যাটসম্যান মিচেল মার্শ চেষ্টা করেছেন অনেক, প্রাণপণ লড়েছেন অধিনায়ক ম্যাথু ওয়েডও। কিন্তু দিনটি ছিল শুধুই বাংলাদেশের স্পিনারদের। বিশেষ করে বাঁহাতি স্পিনার নাসুম আহমেদের। যার স্পিন ঘূর্ণিতে একের পর এক উইকেট হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ইনিংস থেমে গেছে মাত্র ১০৮ রানে। সিরিজের প্রথম ম্যাচটি ২৩ রানের ব্যবধানে জিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ঐতিহাসিক এক জয়ের স্বাদ। তাও কি না মাত্র ১৩১ রানের সংগ্রহ নিয়ে। আর এ জয়ের মাধ্যমে একসঙ্গে দুটি রেকর্ড গড়লো বাংলাদেশ।
এতদিন ধরে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাংলাদেশের সবচেয়ে কম রান করে জয়ের রেকর্ড ছিল আরব আমিরাতের বিপক্ষে। ২০১৬ সালের এশিয়া কাপে মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আমিরাতের বিপক্ষে ১৩৩ রান করেও ৫১ রানের ব্যবধানে জিতেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই কঠিন কাজটিই আবার করে দেখাল বাংলার টাইগাররা। অসিদৈত্য বধ হলো ইতিহাস গড়ে। টেস্ট, ওয়ানডেতে জয় পেলেও টি-টোয়েন্টিতে এতোদিন অধরাই ছিল অস্ট্রেলিয়া। অবশেষে স্বপ্ন পূরণ হলো। মিরপুর শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে উৎসবের রঙে রাঙালেন মাহমুদউল্লাহ-সাকিব-মোস্তাফিজরা।
প্রথম টি-টোয়েন্টিতে অবিশ্বাস্য এক জয়ে পাঁচ ম্যাচ সিরিজ শুরু করেছে বাংলাদেশ। ছোট্ট পুঁজি নিয়েও মিরপুরে তারা অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিয়েছে ২৩ রানে।
অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য মাত্র ১৩২ রানের। সফরকারী দলকে চাপে ফেলতে স্পিন দিয়ে আক্রমণ শুরু করেন অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। প্রথম বলেই সাফল্য এনে দেন মেহেদি হাসান, বোল্ড করেন অ্যালেক্স কারেকে (০)। পরের ওভারে নাসুম আহমেদের ঘূর্ণি ডেলিভারি কিছুটা এগিয়ে খেলতে গিয়ে জশ ফিলিপ (৫ বলে ৯) হন স্ট্যাম্পিং। বল পেয়ে চোখের পলকে স্ট্যাম্প ভেঙে দেন নুরুল হাসান সোহান।
তৃতীয় ওভারে আরও এক উইকেট। এবার সাকিব আল হাসান নিজের প্রথম বলেই বোল্ড করেন ময়েসেজ হেনড্রিকসকে (১)। বাঁহাতি এই স্পিনারের বল সুইপ করতে গিয়ে নিজেই টেনে নিয়ে উইকেট হারান হেনড্রিকস। ১১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকে অস্ট্রেলিয়া।
বিপদ বুঝে খেলার ধরন পাল্টে ফেলেন ম্যাথু ওয়েড আর মিচেল মার্শ। ঝুঁকিপূর্ণ শট না খেলে একটু একটু করে এগিয়ে যেতে থাকেন তারা, রানরেটের কথা না ভেবে। শেষ পর্যন্ত তাদের ৪৫ বলে ৩৮ রানের জুটি ভেঙেছেন নাসুম। যদিও খুব ভালো বল ছিল না, পেছনের দিক দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিল। বাজে সেই বলটিতে কী মনে করে ব্যাট লাগিয়ে দেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক ম্যাথু ওয়েড (২৩ বলে ১৩)। শর্ট ফাইন লেগে সহজ ক্যাচ নেন মোস্তাফিজুর রহমান।
এরপর নাসুমের আরও এক উইকেট, এবার অ্যাশটন অ্যাগার। সেই উইকেট পেতেও অবশ্য ভাগ্য কাজে দিয়েছে টাইগার বাঁহাতি স্পিনারের। বল পিছিয়ে খেলতে গিয়ে নিজের পায়েই স্ট্যাম্প মারিয়ে দেন অ্যাগার। হিট উইকেট হন ৭ করে।
দলের ব্যাটসম্যানদের এ আসা যাওয়ার মিছিলে একটা প্রান্ত ধরে ছিলেন মিচেল মার্শ। শেষ পর্যন্ত সেই কাঁটাও সরিয়েছেন দারুণ বোলিং করা নাসুম। স্লগ সুইপ করতে গিয়ে শরিফুলের দারুণ এক ক্যাচ হন মার্শ (৪৫ বলে ৪৫)। ৮৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছে তখনই।
১৯তম ওভারে এসে অ্যান্ড্রু টাই আর অ্যাডাম জাম্পাকে জোড়া শূন্যতে ফেরান শরিফুল। তার আগের ওভারে মোস্তাফিজ এক্সট্রা কভারে মাহমুদউল্লাহর ক্যাচ বানিয়েছিলেন অ্যাশটন টার্নারকে (৮)। শেষ ওভারে স্টার্ককে বোল্ড করেছেন কাটার মাস্টার ফিজ, তাতেই অস্ট্রেলিয়া এক বল বাকি থাকতে অলআউট ১০৮ রানে। অসিদের এই ধ্বংসযজ্ঞ ঘটানোর মূল কারিগর নাসুম আহমেদ। ৪ ওভারে মাত্র ১৯ রান দিয়ে ৪টি উইকেট শিকার করেন এই বাঁহাতি স্পিনার। মোস্তাফিজ আর শরিফুলও নেন দুটি করে উইকেট।
এর আগে অসি বোলাররা সেভাবে হাত খুলে খেলতে দেননি বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদেরও। নাইম শেখ, সাকিব আল হাসান, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদরা রান পেলেন বটে। কিন্তু সেটা ঠিক টি-টোয়েন্টি ধাঁচের ব্যাটিংয়ে নয়। শেষদিকে আফিফ হোসেন ধ্রুব কিছুটা ব্যাট চালিয়ে খেলে ৭ উইকেটে ১৩১ পর্যন্ত নিয়ে গেছেন দলকে।
টস হেরে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই অসি বোলারদের চাপের মুখে ছিল বাংলাদেশ। আত্মঘাতী হয়ে সাজঘরে ফেরেন সৌম্য সরকার। রীতিমত হাঁসফাঁস করছিলেন উইকেটে, শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনেন বাঁহাতি এই ওপেনার। জশ হ্যাজলেউডের বলটি বানিয়ে মারতে গিয়েছিলেন, কাট করে সেটি নিজের উইকেটেই টেনে আনেন। ইনিংসের চতুর্থ ওভারের তৃতীয় বলের ঘটনা। সৌম্য ৯ বলে করেন মাত্র ২ রান।
সৌম্য ফেরার পর নাইম শেখ মোটামুটি ভালো খেলছিলেন। মিচেল স্টার্ককে ফ্লিক করে বড় এক ছক্কাও হাঁকিয়েছিলেন। কিন্তু পরে আবার রানের গতি আটকে যায় নাইমের। সেই চাপ থেকেই বোধ হয় অ্যাডাম জাম্পাকে রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়েছিলেন সপ্তম ওভারের শেষ বলে। বলটি মিস করে হন পরিষ্কার বোল্ড, ২৯ বলে ২টি করে চার-ছক্কায় নাইম করেন ৩০ রান।
এরপর দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান সাকিব আল হাসান আর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ মিলে দলকে এগিয়ে নিয়েছেন কিছুটা। যদিও তেড়েফুরে খেলতে পারেননি তারাও। ৩২ বলের জুটিতে তারা যোগ করেন ৩৬ রান।
ডাউন দ্য উইকেটে তুলে মারতে গিয়ে আউট হন মাহমুদউল্লাহ। হ্যাজলউডের বলে দৌড়ে গিয়ে দারুণ এক ক্যাচ নেন ময়েচেস হেনড্রিকস। মাহমুদউল্লাহর ২০ বলে সমান রানের ইনিংসটিতে ছিল একটি ছক্কার মার।
এরপর নুরুল হাসান সোহানও উইকেটে টিকতে পারেননি। অ্যান্ড্রু টাইয়ের এক ডেলিভারি অনেকটা সামনে এগিয়ে গিয়ে ওয়াইডের কাছাকাছি জায়গা থেকে তুলে মারেন তিনি, ৪ বলে ৩ রান করে হন মিচেল মার্শের ক্যাচ।
৮৬ রানের মধ্যে ৪ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। এর মধ্যে ১৪.৩ ওভারও পার হয়ে যায়। উইকেটে ভরসা হয়ে ছিলেন সাকিব। তিনিও অবশ্য টি-টোয়েন্টি মেজাজে খেলতে পারেননি। তবে স্লো উইকেটে তার ৩৩ বলে ৩ বাউন্ডারিতে গড়া ৩৬ রানের ইনিংসটিকে একেবারে খারাপ বলা যাবে না। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার বোল্ড হন হ্যাজেলউডের এক স্লোয়ারে।
শামীম হোসেন পাটোয়ারী আন্তর্জাতিক আঙিনায় এবারই প্রথম কঠিন বোলিংয়ের মুখে পড়েন। স্টার্কের টানা দুই বলে দুই করে চার রান নিলেও পরে দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে পরাস্ত হন তরুণ এই ব্যাটসম্যান (৩ বলে ৪), উপড়ে যায় লেগস্ট্যাম্প।
আফিফ হোসেন শেষ ওভারের শেষ বলে এসে আউট হয়েছেন সেই স্টার্কের বলেই। এবারও বোল্ড, ১৭ বলে ৩ বাউন্ডারিতে ২৩ রান করে ইনিংসের শেষ বলে উইকেট হারান আফিফ।
অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিলেন হ্যাজলেউড। ৪ ওভারে মাত্র ২৪ রানে ৩টি উইকেট নেন এই পেসার। স্টার্কের শিকার ২টি।