শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ১৭:০৭

স্বাধীনতার প্রহরীর আরোগ্যের সংগ্রাম: জাতি আজ এক ঐতিহাসিক আবেগের সন্ধিক্ষণে!

মো. জাকির হোসেন
স্বাধীনতার প্রহরীর আরোগ্যের সংগ্রাম: জাতি আজ এক ঐতিহাসিক আবেগের সন্ধিক্ষণে!
ছবি:স্বাধীনতার প্রহরী, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, আপোসহীন গণতন্ত্রের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ দমন-পীড়ন, স্বৈরাচারী শাসন এবং গণতন্ত্র হরণের অন্ধকার পেরিয়ে, দেশ এগিয়ে চলেছে মুক্ত গণতন্ত্রের আলোর পথে। এই রাজনৈতিক মুক্তির জোয়ার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক নবজাগরণের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে—তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দেশের মানুষের দুঃখ, আকাঙ্ক্ষা এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন—সবকিছুর মধ্যমণি হিসেবে তিনি আজও অনড়, দৃঢ়, এবং আপোসহীন গণতন্ত্রের প্রতীক

তবে এই আশা ও উল্লাসের মাঝেও জাতি গভীর উদ্বেগে নিমজ্জিত। কারণ স্বাধীনতার প্রহরী, তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী, আপোসহীন গণতন্ত্রের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজও শারীরিকভাবে দুর্বল। দীর্ঘ বন্দিজীবন, চিকিৎসা বঞ্চনা এবং বহু বছর ধরে রাজনৈতিক হেনস্তার শিকার হওয়ায় তাঁর সুস্থতার পথ জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি। রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুহূর্তে যখন তাঁর প্রজ্ঞা ও নেতৃত্ব সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল—এ যেন ইতিহাসের এক করুণ বাস্তবতা। কিন্তু একই সঙ্গে এও সত্য যে এই জাতি তাঁর ফেরার অপেক্ষায়, তাঁর কণ্ঠের ঘোষণার অপেক্ষায়, তাঁর নির্দেশনার অপেক্ষায় অস্থির।

দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং জনগণের মুক্তির আন্দোলনের সাফল্য—সবই যেন থমকে যাচ্ছে একটাই প্রশ্নের সামনে: তিনি কেমন আছেন? তিনি কি সুস্থ হয়ে উঠছেন? তিনি কি আবার নেতৃত্ব দেবেন? এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন নয়; এটি একটি জাতির প্রশ্ন। কারণ এই দেশের মানুষ জানে—জাতীয় নেতৃত্বের শূন্যস্থান পূরণের ক্ষমতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা একমাত্র তাঁরই আছে। এই উপ-সম্পাদকীয় সেই প্রত্যাশার, সেই কৃতজ্ঞতার, সেই রাজনৈতিক পটভূমির এক বর্ণনা—যেখানে দেশনেত্রীর আরোগ্য কেবল একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; এটি জাতীয় স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার কেন্দ্রবিন্দু।


২. আরোগ্যের সফর: আইনি মুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য-সংকট

বেগম খালেদা জিয়া বহু বছর ধরেই নানা জটিল ও মারাত্মক রোগে আক্রান্ত। তাঁর প্রধান শারীরিক সমস্যাগুলো হলো—লিভার সিরোসিস, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, তীব্র হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, আর্থ্রাইটিস ও অন্যান্য বার্ধক্যজনিত সমস্যা। দীর্ঘ কারাবাস, চিকিৎসার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চনা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা তাঁর অবস্থাকে জীবন-মৃত্যুর সীমায় নিয়ে গিয়েছিল। তাঁর প্রতিটি শারীরিক কষ্ট যেন দেশের মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে।

সম্প্রতি দেশে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ফলস্বরূপ, আইনি বাধা দূর হওয়ার পর তিনি বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পান। এই বিদেশ সফর ছিল জাতির জন্য এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি ছিল—

  • আইনি বাধা অতিক্রমের বিজয়
  • চিকিৎসার স্বাধীনতা লাভের মানবিক নিশ্চয়তা
  • রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি

বিদেশ থেকে উন্নত চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরা আশার আলো দেখালেও, তাঁর চিকিৎসা এখনও জটিল, কঠোর এবং দীর্ঘমেয়াদি। চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন—"তাঁর উন্নতি হলেও সম্পূর্ণ সুস্থ হতে সময় লাগবে।" এই দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন (Rehabilitation) প্রক্রিয়ায় দেশনেত্রীর মনোবল দৃঢ় থাকলেও, তাঁর শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। নাগরিক হিসেবে আমরা শুধু উদ্বিগ্ন নই—আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত হচ্ছি নেতৃত্বশূন্যতার কঠিন বাস্তবতার জন্য এবং একই সাথে প্রার্থনা করছি তাঁর দ্রুত আরোগ্যের জন্য।


৩. নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় খালেদা জিয়ার উপস্থিতি কেন অপরিহার্য?

দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট পরিবর্তনের এই মুহূর্তে অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও জনগণের প্রতি অটল আস্থা—এই তিনটি গুণ একসঙ্গে ধারণ করে এমন নেতৃত্ব আজ বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। এই তিনটি গুণই সর্বোচ্চ মাত্রায় ধারণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তাঁর উপস্থিতি অনিবার্য।

৩.১ সংকটময় মুহূর্তে স্থিরতা ও দৃঢ়তার প্রতীক

সামরিক শাসন প্রতিরোধ থেকে শুরু করে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসন হটিয়ে ভোটাধিকার আন্দোলন পর্যন্ত—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন ফ্রন্টলাইনে। এখন যখন দেশ একটি নতুন রাজনৈতিক দিগন্তে হাঁটছে, তখন এই অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়কের দিকনির্দেশনা অপরিহার্য। তিনি সুস্থ থাকলে—

  • নীতি নির্ধারণ ও সুসংগঠন: বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সঠিক নীতি নির্ধারণ এবং দল ও জোটকে সুসংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রজ্ঞা অদ্বিতীয়।
  • আন্তর্জাতিক সমর্থন: আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্গঠন এবং বৈশ্বিক গণতন্ত্রকামীদের আস্থা অর্জনে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা অসীম।
  • ভোট পুনর্গঠন: একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থার পুনর্গঠনে তাঁর ভূমিকা হবে প্রধান চালিকাশক্তি।

৩.২ জাতীয় ঐক্য গঠনের একমাত্র বিশ্বস্ত নেতৃত্ব

আজ দেশে রাজনৈতিক বিভাজন বহু বছরের। তবুও একটি বিষয় এককথায় স্বীকার করতে হয়: এই জাতি বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে একত্রিত হতে পারে। তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর সংগ্রামের বৈধতা এবং তাঁর সর্বজনীন জনপ্রিয়তা—সবকিছুই তাঁকে জাতীয় ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছে। তাঁর অসুস্থতা এই ঐক্যের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। সুস্থ হয়ে তিনি ফিরে এলে—সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে এক ছাতার নিচে আনা সহজ হবে এবং দেশকে স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।


৪. ইতিহাসের মাইলফলক: ১৯৯১ থেকে আজকের বাস্তবতা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান অপরিসীম। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের গণতন্ত্রকে বহু চরম সংকট থেকে রক্ষা করেছেন

১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর মুক্ত গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার সময় বেগম জিয়া দেশের জনগণের আস্থা অর্জন করেছিলেন। সেই সময়ে তাঁর দৃষ্টি, প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতা দেশের জন্য মাইলফলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে সংসদীয় পদ্ধতির গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় এবং তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা জানি, দেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের পথে অগ্রগতি নিশ্চিত করতে এই নেত্রীর নেতৃত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যক্তিগতভাবে তিনি বহু বাধা অতিক্রম করেছেন—কারাগার, চিকিৎসা বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক হেনস্তার মধ্য দিয়ে। কিন্তু কখনোই দেশের জনগণের আস্থা হারাননি। তাঁর এই ত্যাগ, ধৈর্য এবং আপোসহীন মনোভাব তাঁকে জনগণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

৪.১ পুনর্গঠনের পথে তাঁর অমূল্য ভূমিকা

তিনি সুস্থ থাকলে দেশের পুনর্গঠনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অমূল্য ভূমিকা রাখতে পারবেন। যেমন:

  • বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
  • মানবাধিকার সুরক্ষা: গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিতকরণ।
  • অর্থনীতি পুনর্জাগরণ: অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক আস্থা পুনরুদ্ধারে সঠিক দিকনির্দেশনা।
  • প্রশাসনের জবাবদিহি: প্রশাসনকে জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব করতে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ।

৫. জনমতের স্রোত: আরোগ্যের জন্য জাতির প্রার্থনা

দেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে বেগম জিয়ার সুস্থতার জন্য দোয়া করছে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডায় তাঁর সুস্থতার জন্য প্রার্থনা হচ্ছে। এটি কেবল মানবিক সহানুভূতি নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সংকেত—যা দেখাচ্ছে জনগণ তাঁর ওপর আস্থা ও আশা রাখে।

গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে প্রবাসী নাগরিকরা পর্যন্ত, সব শ্রেণি থেকে মানুষের কণ্ঠে একটাই বার্তা—"আমাদের নেত্রী সুস্থ হয়ে উঠুন।" এই আবেগ রাজনৈতিক উত্তরণ, সামাজিক ঐক্য এবং জাতির নৈতিক শক্তিকে উজ্জীবিত করছে। দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা যাচ্ছে—এটি এক অনন্য মানবিক ঐক্য। যে দেশ আজ পুনর্জাগরণের পথে, সেই দেশ তার নেত্রীকে সুস্থ দেখতে চায়।

৫.১ বিএনপি’র মনোবল ও জাতীয় বিকল্প নেতৃত্ব

আজকের প্রেক্ষাপটে বিএনপি কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি মতাদর্শ এবং একটি জাতীয় বিকাশের যাত্রা। এই যাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর সুস্থতা না থাকলে—

  • দলীয় মনোবল হ্রাস পাবে।
  • তৃণমূলের প্রেরণা দুর্বল হবে
  • জাতীয় বিকল্প নেতৃত্ব অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

এই কারণে তাঁর আরোগ্য শুধু দলীয় প্রয়োজন নয়, এটি জাতীয় প্রয়োজন


৬. উপসংহার: তিনি সুস্থ হলেই জাতি সুস্থ হবে

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা। নেত্রীর অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও জনগণের প্রতি অটল আস্থা ছাড়া এটি অসম্ভব। বেগম জিয়া ছাড়া অন্য কেউ এই স্থিতিশীলতা, অভিজ্ঞতা ও জনগণের আস্থা একত্র করে দেশকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারবে না।

তিনি সুস্থ হয়ে ফিরলে—গণতন্ত্রের যাত্রা সমৃদ্ধ হবে, রাষ্ট্র স্থিতিশীল হবে, দল শক্তিশালী হবে, জনগণ আস্থা পাবে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও নিশ্চয়তা পাবে। তাঁর নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা, জনপ্রিয়তা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশকে দেবে নতুন দিকনির্দেশনা।

বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি জাতির জন্য এক চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তাঁর সুস্থতা ছাড়া দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন। তাঁর আরোগ্যলাভ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক মানচিত্রকে স্থিতিশীল করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে

আজ আমাদের প্রার্থনা কেবল একজন নেত্রীর জন্য নয়; এটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য। বেগম খালেদা জিয়া সুস্থ হয়ে উঠুন। তিনি শক্তি ফিরে পান। তিনি আবারও আমাদের গণতান্ত্রিক যাত্রার পথনির্দেশক হোন।

কারণ—তিনি সুস্থ হলেই জাতি সুস্থ হবে।

হে আল্লাহ, স্বাধীনতার প্রহরী বেগম খালেদা জিয়াকে পূর্ণ আরোগ্য দান করুন। তাঁর স্বাস্থ্য, শক্তি ও প্রজ্ঞায় বাংলাদেশ আবার আলোর পথে চলুক। আমিন।

— মো. জাকির হোসেন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি

তারিখ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়