প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৪, ০০:০০
আমির খসরু মাহমুদের বক্তব্য

রাজনীতিবিদদের মধ্যে অনেকেই সঠিক কথা না বলে দলের প্রধানকে খুশি করার জন্যে বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য প্রদানের প্রবণতায় ভুগতে দেখা যায়। কেউ কেউ সস্তা বাহবা পাওয়ার জন্যে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে কথা বলা, প্রকৃত চিত্র তুলে না ধরে মিথ্যাচার করতেও দেখা যায়। আর ২-৪ জন রাজনীতিবিদ স্রোতের বাইরে কথা বলতে গিয়ে জনগণের আসল মনোভাব ও দেশের সত্যিকার অবস্থা তুলে ধরার সাহসী প্রয়াস চালান। এরা দলের বাইরে জনপ্রিয় থাকলেও দলের ভেতরে অপ্রিয় হয়ে যান। সেজন্যে এমন রাজনীতিবিদের সংখ্যা ২-৪ জন থেকে একেবারে নগণ্য তথা শূন্যের কোঠায় নেমে আসার পরিস্থিতি সবসময় বিদ্যমান থাকে। অনেকে এমতাবস্থায় দল পরিবর্তনও করেন। আবার পোড় খাওয়া মানসিকতা থেকে এমন নগণ্য সংখ্যাটা হঠাৎ বেড়েও যায়। এমন বেড়ে যাওয়া রাজনীতিবিদদের একজন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী--এটা ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-উত্তর তাঁর কিছু বক্তব্য থেকে আঁচ করা যায়। তিনি নোয়াখালীতে বন্যা উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শন করতে গিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতের পরিবর্তন না বুঝলে, বিএনপির রাজনীতি আগামী দিনে কঠিন হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যে লুটপাট, চাঁদাবাজি, যে মাস্তানি, যে দখল করেছে, সেটা কি আমরা করতে পারব? আপনারা কি সেটা করতে পারবেন? বাধা দিতে হবে। গত ১৪-১৫ দিনে বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতের যে পরিবর্তন, আমরা যদি সেটা না বুঝি, বিএনপির রাজনীতি আগামী দিনে কঠিন হয়ে যাবে। সবাইকে জনগণের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। কোনো ধরনের অন্যায় অবিচার করতে দেওয়া যাবে না। চাঁদাবাজি, মাস্তানি, দখলদারি করতে দেওয়া যাবে না। যারা করবে তাদেরকে বাধাগ্রস্ত করতে হবে। তিনি শনিবার (২৪ আগস্ট ২০২৪) সন্ধ্যায় নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চেউয়াখালী বাজারে বন্যা দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ টেনে আমির খসরু মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের মালিক হচ্ছে জনগণ। শেখ হাসিনাও নয়, তার পরিবারও নয়। এ বিশ্বাস কিন্তু বিএনপিকে রাখতে হবে। ওই যে বিতাড়িত স্বৈরাচার,ফ্যাসিস্ট, দুর্নীতিবাজ, নিপীড়নকারী চলে গেছে, তা দেখে আমাদেরকে পরিবর্তন হতে হবে। আমরা আবার সে দিকে চলে যেতে পারব না। বাংলাদেশের মানুষের মনমানসিকতা, মনোজগত পরিবর্তন হয়ে গেছে। সেই ফ্যাসিস্ট পালানোর পরে, বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতের বড়ো পরিবর্তন আসছে। তারা একটি সুষ্ঠু সামাজিক শান্তিপূর্ণ ন্যায় বিচারের বাংলাদেশ দেখতে চায়। সকল নাগরিকের সমান অধিকার দেখতে চায়। দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের আজকে যে প্রত্যাশা- আকাঙ্ক্ষা জেগেছে, যে নূতন সূর্য উঠেছে বাংলাদেশে, সেটাকে মাথায় রাখতে হবে। রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। তা না হলে বেশি দিন টিকা যাবে না। বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ নাগরিকের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। তাদের মনোজগত বুঝতে হবে না। যুবকের চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, চাহিদা বুঝতে হবে। তিনি আরো বলেন, এই বর্তমান সরকার আমাদের আন্দোলনের ফসল। ১৬ বছর ধরে আমাদের নেতা-কর্মীদের গুম, খুন, মিথ্যা মামলা, চাকরি হারানো, ব্যবসা হারানো, পথে পথে ঘুরে বেড়ানো, পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু, নিপীড়ন নির্যাতন, তার প্রতিবাদ যে বিএনপি করেছে তার ফলস্বরূপ ১৬ বছর পরে ছাত্রদের আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার প্রচেষ্টায় সেটার সুফল আমরা পেয়েছি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, চোখ, কান খোলা রাখতে হবে। এই ফ্যাসিস্ট বিতাড়িত হওয়ার পরে শেখ হাসিনার সহযোগী ও তার ষড়যন্ত্রের সাথে যারা জড়িত ছিল তারা বসে নেই। আপনারা ভুল করবেন, তারা কিন্তু ভুলের সুযোগ নিয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করবে। এজন্যে ভুল করা যাবে না। যারা পরাজিত শক্তি তারা কিন্তু এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছে। সুতরাং আমাদেরকে জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধভাবে যে আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি হয়েছে, সকলে মিলে সেটা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। একটি গোষ্ঠী বাংলাদেশের অর্থ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করে সম্পদ পুঞ্জীভূত করে, বাকি মানুষ অর্থাভাবে, খাদ্যাভাবে দিন কাটাবে। সেই বাংলাদেশ আমরা আর দেখতে চাই না।
রাজনীতি সচেতন, রাজনীতি নিয়ে সামান্যটুকুও ভাবেন কিংবা নিরপেক্ষভাবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন, তাদের কাছে অবশ্যই জনাব আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উপরোল্লিখিত বক্তব্য ভালো লাগবে কিংবা চিন্তার জগতে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হবে। তিনি তাঁর মতো করে কথাটুকু বলেছেন। এতে তিনি দেশের মানুষের মনোজগতের বড়ো পরিবর্তনের বিষয়টিতে অনেক বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন, যেটা সমকালীন প্রেক্ষাপটের আলোকে তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই বলেছেন বলে তাঁর বাচনভঙ্গিতে মনে হয়েছে। আমরা এ প্রসঙ্গে স্মরণ করি সেই বিখ্যাত কথা 'দি ভয়েস অব পিপল ইজ দি ভয়েস অব গড' (মানুষের কণ্ঠস্বরই স্রষ্টার কণ্ঠস্বর)। কথা হলো, মানুষের কণ্ঠস্বর কি শাসকদল সবসময় উপলব্ধির চেষ্টা করে? না চোখ বন্ধ করে প্রলয় ঠেকানোর চেষ্টা করে? আমাদের মতে, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরেই ফুটে উঠে তার মনের কথা। এ কথা শাসকদলকে পড়বার পারঙ্গমতা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যর্থতায় কোনো নির্বাচন লাগে না, ছোট উপলক্ষ থেকেই দমন-পীড়নে সৃষ্টি হয় বিস্ফোরণ, যেটার জ্বলন্ত উদাহরণ পাঁচ আগস্ট দু হাজার চব্বিশ। এ বিস্ফোরণের ইতিবাচক ফলাফলকে টেকসই করতে প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ আমির খসরু মাহমুদের কথাগুলো ভবিষ্যতের শাসন ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলের নেতা-কর্মীদের হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করতেই হবে বলে আমরা মনে করি।