বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৬

একজন সহকর্মীর অকালপ্রয়াণে অপূরণীয় শূন্যতা, স্মৃতি ও না-বলা কথা

উজ্জ্বল হোসাইন
একজন সহকর্মীর অকালপ্রয়াণে অপূরণীয় শূন্যতা, স্মৃতি ও না-বলা কথা

কিছু বিদায় আছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কিছু চলে যাওয়া আছে, যা শুধু একটি পরিবারের আকাশ অন্ধকার করে দেয় না, একটি কর্মস্থলের আলোও নিভিয়ে দেয়। কিছু মানুষের অনুপস্থিতি এমন এক শূন্যতা তৈরি করে, যেখানে প্রতিদিনের পরিচিত দৃশ্যগুলোও হঠাৎ অচেনা হয়ে ওঠে। যে মানুষটির সঙ্গে গতকালও কথা হয়েছে, যার মুখে দেখা গেছে চিরচেনা হাসি, যার সঙ্গে কাজের ফঁাকে হয়েছে খুনসুটি, মতের অমিল কিংবা সামান্য অভিমানÑপরদিন সেই মানুষটিই আর পৃথিবীতে নেই! খবরটি শুনতে হয়, বিশ্বাস করতে হয়, অথচ মন কিছুতেই তা মেনে নিতে চায় না। মনে হয়, এই বুঝি দরজা ঠেলে সে প্রবেশ করবে, পরিচিত কণ্ঠে কিছু একটা বলবে, তারপর কম্পিউটারের সামনে বসে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। দরজা খোলে, মানুষ আসে, কাজ শুরু হয়; শুধু সেই মানুষটি আর ফিরে আসে না।

দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠের দক্ষ কর্মী, চঁাদপুর শহর প্রতিনিধি ও কম্পিউটার অপারেটর মো. মোস্তফা কামাল খান সুজনের অকালমৃত্যু আমাদের জন্য তেমনই এক অপূরণীয় শূন্যতার নাম। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে তঁার চলে যাওয়া যেন আমাদের প্রতিদিনের কর্মজীবনের একটি পরিচিত অধ্যায়কে চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। ১৮ অক্টোবর রাতেও যিনি হাসিমুখে অফিসের কাজ শেষ করে সহকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন, পরদিন সকালে তঁার নিথর দেহ ফিরে আসার সংবাদ আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে। যে বিদায়কে আমরা প্রতিদিনের মতো একটি সাধারণ বিদায় ভেবেছিলাম, সেটিই যে জীবনের শেষ বিদায় হয়ে থাকবে, তা কি একবারও কল্পনা করেছিলাম?

আজ সুজন নেই। আছে তঁার ব্যবহৃত কম্পিউটার, কাজের স্মৃতি, পরিচিত কর্মস্থল, সহকর্মীদের চোখে জমে থাকা অশ্রু আর বুকের ভেতর অব্যক্ত হাহাকার। আছে এমন কিছু কথা, যা তঁাকে আর কখনো বলা হবে না। আছে এমন কিছু অভিমান, যার উত্তর দেওয়ার জন্যও তিনি আর ফিরে আসবেন না।

সুজনকে নিয়ে লিখতে বসে প্রথমেই মনে পড়ছে তঁার হাসিমুখ। মানুষটির সঙ্গে যেখানেই দেখা হতো, মুখে হাসি লেগেই থাকত। সেই হাসি ছিল তঁার ব্যক্তিত্বের একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য। কর্মব্যস্ত অফিসে নানা ধরনের চাপ, কাজের তাড়া, সময়সীমা মেনে সংবাদপত্র প্রকাশের দায়িত্বÑসবকিছুর মধ্যেও তঁার মুখে হাসির উপস্থিতি আমাদের ভালো লাগত। কর্মক্ষেত্রে সবাই সমানভাবে হাসিখুশি থাকতে পারেন না। কেউ কাজের চাপে গম্ভীর হয়ে পড়েন, কেউ নিজের সমস্যা আড়াল করতে চান, কেউবা সামান্য বিষয়েও বিরক্ত হয়ে ওঠেন। কিন্তু সুজনের মধ্যে ছিল একধরনের সহজ-স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্য, যা সহকর্মীদের সঙ্গে তঁার সম্পর্ককে প্রাণবন্ত করে তুলত।

একটি সংবাদপত্রের অফিস বাইরে থেকে যতটা সাধারণ মনে হয়, ভেতরে তার কর্মপরিবেশ ততটাই ব্যস্ত ও দায়িত্বপূর্ণ। খবর সংগ্রহ, সম্পাদনা, কম্পোজ, পৃষ্ঠাসজ্জা, প্রুফ দেখা, ছাপা ও পত্রিকা পাঠকের হাতে পেঁৗছে দেওয়াÑপ্রতিটি ধাপে অনেক মানুষের সমন্বিত শ্রম প্রয়োজন। সেখানে একজনের কাজের সঙ্গে আরেকজনের কাজ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কারও সামান্য ভুলে অন্যের কাজ আটকে যেতে পারে, আবার একজনের সহযোগিতায় জটিল কাজও সহজ হয়ে উঠতে পারে। এই কর্মপরিবেশে সুজন ছিলেন পরিচিত, দক্ষ ও দায়িত্বশীল একজন মানুষ।

দীর্ঘ ছয় বছর ধরে দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংবাদপত্রের প্রতিটি সংখ্যার পেছনে তঁার শ্রমের অংশ ছিল। পাঠক হয়তো পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত সংবাদ পড়েন, শিরোনাম দেখেন, ছবির দিকে তাকান; কিন্তু সেই সংবাদকে পাঠযোগ্য ও প্রকাশযোগ্য করে তুলতে যঁারা নেপথ্যে কাজ করেন, তঁাদের অনেকেই চেনেন না। সুজন ছিলেন সেই নেপথ্যের কর্মীদের একজন, যঁাদের শ্রম ছাড়া সংবাদপত্রের দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখা কঠিন।

আজ তঁার অনুপস্থিতিতে উপলব্ধি করছি, একটি কর্মস্থলে একজন মানুষের গুরুত্ব কেবল তঁার পদবি কিংবা দায়িত্বের পরিধি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তিনি কতটা আন্তরিক ছিলেন, কতটা সহযোগিতা করতেন, কতটা আপন করে নিতে পারতেন অন্যদেরÑএসবের ওপরও নির্ভর করে তঁার প্রকৃত মূল্য। সুজনের ক্ষেত্রে এই মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমাদের বারবার তঁার হাসিমুখ, কর্মনিষ্ঠতা ও সহকর্মীদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্কের কথাই মনে পড়ছে।

একসঙ্গে কয়েকজনের সমন্বিত কাজ আর হবে না

কর্মক্ষেত্রে কিছু কাজ থাকে, যা একজন মানুষ একা করলেও তার প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠের ব্যস্ত কর্মপরিবেশে আমাদেরও এমন অনেক কাজ ছিল, যেখানে কয়েকজনের সমন্বয়, পরস্পরের সহযোগিতা এবং একে অন্যের ওপর নির্ভরতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কখনো কাজের তাগিদে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, কখনো একটি বিষয় নিয়ে একাধিকবার আলোচনা করতে হয়েছে, কখনো কারও ভুল শুধরে দিতে হয়েছে, আবার কখনো কাজের ফঁাকে হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠেছি আমরা।

সেই সমন্বিত কর্মযজ্ঞে সুজন ছিলেন আমাদের একজন পরিচিত সঙ্গী। এখন মনে হয়, একসঙ্গে বসে কাজ করার সেই মুহূর্তগুলো কত মূল্যবান ছিল! তখন হয়তো বুঝিনি, প্রতিদিনের এই সাধারণ সময়গুলোই একদিন স্মৃতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠবে। অফিসের টেবিলে বসে কাজ করা, প্রয়োজনীয় তথ্য খেঁাজা, কম্পিউটারের সামনে ব্যস্ত থাকা, কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা কিংবা কাজের শেষে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলাÑএসবই ছিল আমাদের স্বাভাবিক জীবন। অথচ সুজনের চলে যাওয়ার পর সেই স্বাভাবিকতার ভেতরেই আমরা খুঁজে পাচ্ছি অসাধারণ এক শূন্যতা।

কাজের জায়গায় মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করতে করতে সহকর্মীরা পরিবারের সদস্যদের মতো হয়ে ওঠেন। তাদের অভ্যাস জানা হয়, রাগ-অভিমান বোঝা হয়, হাসির ধরন চেনা হয়, এমনকি কারও নীরবতা দেখেও তার মনের অবস্থা অনুমান করা যায়। সুজনও আমাদের কাছে কেবল একজন কর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন পরিচিত কর্মপরিবেশের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এখন কাজের প্রয়োজনে যখন আমরা একত্র হব, হয়তো কোনো মুহূর্তে মনে হবে, সুজন থাকলে বিষয়টি সহজ হতো। কোনো আলোচনা চলতে চলতে মনে পড়বে, এ সময় সে নিশ্চয়ই কোনো মন্তব্য করত। কাজের ফঁাকে হাসির উপলক্ষ তৈরি হলে মনে পড়বে, সুজন থাকলে হয়তো সেও হাসিতে যোগ দিত। এভাবেই একজন মানুষের অনুপস্থিতি প্রতিদিনের অসংখ্য ছোট ছোট মুহূর্তে নিজেকে জানান দেয়।

একজন কর্মীর জায়গায় আরেকজন কর্মী আসতে পারেন। প্রতিষ্ঠান তার কাজ চালিয়ে নিতে পারে। সময়ের প্রয়োজনে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া যায়, নতুন মানুষকে কাজ শেখানো যায়, কর্মপরিকল্পনাও বদলানো যায়। কিন্তু যে মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে একটি দলের সঙ্গে নিজের স্বভাব, অভ্যাস ও সম্পর্কের সমন্বয় ঘটিয়েছেন, তঁার জায়গা কি এত সহজে পূরণ হয়? কাজের শূন্যতা হয়তো একসময় পূরণ হবে, কিন্তু মানুষটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি ও অনুভূতির শূন্যতা থেকে যাবে।

আমাদের সার্কুলেশন ম্যানেজার সোহাঈদ খান জিয়ার সঙ্গে সুজনের খুনসুটি ছিল অফিসের পরিচিত দৃশ্যগুলোর একটি। তঁাদের মধ্যে কথাবার্তা, হাসি-ঠাট্টা কিংবা পরস্পরকে নিয়ে মজার মন্তব্যÑএসবের মধ্য দিয়ে কর্মক্ষেত্রে একধরনের প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হতো। অফিসের কাজের চাপের মধ্যে এমন আন্তরিক সম্পর্ক কর্মীদের মানসিক স্বস্তি দেয়। দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে মানুষের মধ্যে যে আপনত্ব গড়ে ওঠে, খুনসুটি তারই একটি সহজ প্রকাশ।

আজ সেই দৃশ্যগুলো মনে পড়লে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। সোহাঈদ খান জিয়ার সঙ্গে সুজনের সেই চেনা কথোপকথন আর হবে না। তঁাদের পরিচিত হাসি-ঠাট্টা ও রাগ-অভিমানের মুহূর্তগুলো আর ফিরে আসবে না। হয়তো কোনো একদিন কাজের ফঁাকে জিয়া ভাইয়ের মনে পড়বে সুজনের কথা। হয়তো কোনো পুরোনো প্রসঙ্গ উঠবে, কেউ বলবেন, ‘সুজন থাকলে এখন কী বলত!’ তারপর কিছুক্ষণের জন্য থেমে যাবে কথাবার্তা। কারণ, স্মৃতি কখনো কখনো আনন্দের দরজা খুলে দেয়, আবার সেই আনন্দের মধ্যেই অনুপস্থিতির বেদনা আরও তীব্র করে তোলে।

আমরা প্রায়ই ভাবি, কর্মক্ষেত্রের খুনসুটি খুব সাধারণ ব্যাপার। আজ একজন আরেকজনকে কিছু বললেন, কাল আবার হাসতে হাসতে কাজ শুরু করলেন। কিন্তু এসব ছোট ছোট মুহূর্তই আসলে একটি প্রতিষ্ঠানের মানবিক পরিবেশ তৈরি করে। অফিস শুধু কাজের স্থান নয়; এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠারও জায়গা। সুজনের মতো হাসিখুশি মানুষেরা সেই পরিবেশকে সহজ ও প্রাণবন্ত করে তোলেন।

সুজনের সঙ্গে জিয়ার সম্পর্কের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সহকর্মীদের মধ্যে আন্তরিকতা কতটা মূল্যবান। কাজের চাপ, মতবিরোধ কিংবা দায়িত্বের পার্থক্য থাকলেও হাসি-ঠাট্টা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা কর্মপরিবেশকে সুন্দর করে। মানুষ চলে গেলে এসব সম্পর্কের মূল্য আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়। তখন মনে হয়, প্রতিদিনের সেই সামান্য হাসি, ছোট্ট কথোপকথন কিংবা মজার মুহূর্তগুলোকে আরও যত্ন করে ধরে রাখা উচিত ছিল।

মতানৈক্যে থেমে যাওয়া, অভিমান জমিয়ে রাখা

সুজনের ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে। কোনো বিষয়ে মতানৈক্য হলে সে অনেক সময় নিজেই থেমে যেত, যেন একজন পরাজিত সৈনিক নীরবে নিজের অবস্থান থেকে সরে দঁাড়াচ্ছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, বিষয়টি নিয়ে তার আর কোনো কথা নেই। যেন সে মেনে নিয়েছে, আলোচনায় আর এগোবে না। কিন্তু আমি জানতাম, তার মনে অনেক অভিমান জমা থাকত। সেই অভিমান সে সহজে প্রকাশ করত না।

মানুষের মনের ভেতরটা বাইরে থেকে দেখা যায় না। কেউ রাগ করলে তা প্রকাশ করে ফেলেন, কেউ প্রতিবাদ করেন, কেউ তর্কে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে চান। আবার কেউ কেউ আঘাত পেলেও চুপ করে থাকেন। তাদের নীরবতাকে আমরা অনেক সময় সম্মতি বলে ধরে নিই, তাদের থেমে যাওয়াকে পরাজয় মনে করি। কিন্তু নীরবতারও নিজস্ব ভাষা আছে। সেখানে কখনো ক্লান্তি থাকে, কখনো আত্মসম্মান, কখনো সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা, আবার কখনো এমন অভিমান থাকে, যা মুখে প্রকাশ করার মতো সাহস কিংবা ইচ্ছা মানুষ খুঁজে পান না।

সুজনের সেই নীরব হয়ে যাওয়ার মুহূর্তগুলো এখন নতুন করে মনে পড়ছে। তখন হয়তো আমরা ভাবতাম, সে আর কথা বাড়াতে চায় না। হয়তো বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়ে গেছে বলে ধরে নিতাম। কাজের ব্যস্ততায় অন্য কাজে মন দিতাম। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, সেই নীরবতার ভেতরে কত কথা জমে ছিল, আমরা কি তা যথেষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম?

তবে সুজনের মনের প্রতিটি অনুভূতি আমরা জানতাম, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। একজন মানুষের অন্তর্গত বেদনা পুরোপুরি বোঝা অন্য মানুষের পক্ষে কঠিন। আমরা কেবল তার আচরণ, কথাবার্তা ও পরিচিত অভ্যাস থেকে কিছুটা অনুমান করতে পারি। তঁার চলে যাওয়ার পর সেই স্মৃতিগুলো আমাদের আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।

মৃত্যু মানুষকে শুধু হারানোর বেদনা দেয় না; কখনো কখনো নিজের আচরণ নিয়েও ভাবতে বাধ্য করে। আমরা কি সহকর্মীর কথা মন দিয়ে শুনি? মতের অমিল হলে তাকে সম্মান করি? কেউ নীরব হয়ে গেলে তার অনুভূতির খেঁাজ নিই? কারও মুখের হাসির আড়ালে জমে থাকা অভিমান বোঝার চেষ্টা করি? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদের কাছেই খুঁজতে হবে।

জীবনের সব মতবিরোধের নিষ্পত্তি হয় না। সব কথা বলা হয়ে ওঠে না, সব অভিমানও দূর করা যায় না। তবু মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটু বেশি সহমর্মিতা, একটু বেশি ধৈর্য এবং একটু বেশি আন্তরিকতা অনেক অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে। সুজনের স্মৃতি আমাকে সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।

সুজনের মধ্যে আমি যে গুণগুলো লক্ষ করেছি, তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল উদ্ভাবনী চেতনা এবং শেখার প্রবল আগ্রহ। তিনি শুধু প্রচলিত নিয়মে কাজ করে দায়িত্ব শেষ করতে চাইতেন না; নতুন কিছু জানার, বোঝার এবং শেখার আগ্রহ তঁার মধ্যে ছিল। কর্মজীবনে এই আগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রযুক্তি ও সংবাদমাধ্যমের জগৎ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। কম্পিউটার, পৃষ্ঠাসজ্জা, ডিজিটাল যোগাযোগ ও সংবাদ প্রকাশের পদ্ধতিতে প্রতিদিনই নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হচ্ছে। এসবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে শেখার বিকল্প নেই।

একজন দক্ষ কর্মীর প্রকৃত পরিচয় শুধু তিনি বর্তমানে কতটা জানেন, তা দিয়ে হয় না; তিনি নতুন কিছু শেখার জন্য কতটা প্রস্তুত, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সুজনের মধ্যে আমি সেই মানসিকতা দেখতে পেয়েছি। তঁার আগ্রহ ছিল, জানার চেষ্টা ছিল, নিজের কাজকে আরও ভালোভাবে করার আকাঙ্ক্ষা ছিল। এসব গুণ একজন মানুষকে পেশাগতভাবে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।

আমাদের সমাজে অনেক সময় নেপথ্যের কর্মীদের দক্ষতা যথাযথভাবে আলোচনায় আসে না। সংবাদপত্রের পাঠক একজন প্রতিবেদক, সম্পাদক কিংবা পরিচিত সংবাদকর্মীর নাম জানেন। কিন্তু পত্রিকার উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় যারা নীরবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, তাদের অবদান আড়ালেই থেকে যায়। অথচ প্রযুক্তিগত দক্ষতা, মনোযোগ, ধৈর্য ও দ্রুত কাজ করার সক্ষমতা ছাড়া একটি সংবাদপত্রের নিয়মিত প্রকাশনা কঠিন।

সুজন ছিলেন এমনই একজন কর্মী, যঁার কাজের গুরুত্ব আমরা তঁার সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করতে গিয়ে অনুভব করেছি। তঁার শেখার আগ্রহ এবং উদ্ভাবনী মানসিকতা তঁাকে আরও এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দিয়েছিল। জীবনের পথচলা দীর্ঘ হলে হয়তো তিনি আরও নতুন দক্ষতা অর্জন করতেন, নিজের কর্মজীবনে আরও সাফল্য যোগ করতেন। হয়তো একদিন তঁার অভিজ্ঞতা নতুন কর্মীদের শেখার উপকরণ হয়ে উঠত। কিন্তু সেই সম্ভাবনাগুলো এখন অসমাপ্ত রয়ে গেল।

মানুষের জীবনে অসমাপ্ত কাজ ও অপূর্ণ স্বপ্নের সংখ্যা কম নয়। কেউ একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই চলে যান, কেউ নতুনভাবে জীবন সাজানোর প্রস্তুতির মধ্যেই হারিয়ে যান। সুজনের ক্ষেত্রেও আমাদের মনে প্রশ্ন জাগেÑআরও কত কিছু শেখার ছিল তার, কত পরিকল্পনা ছিল, কত স্বপ্ন ছিল! এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো কখনো জানা হবে না। কিন্তু তার শেখার আগ্রহ আমাদের জন্য একটি শিক্ষা হয়ে থাকতে পারেÑযত দিন বেঁচে থাকি, শেখার দরজা যেন বন্ধ না করি।

সহকর্মীর সেই বিশ্বাস ও অমূল্য উৎসাহ

সুজনের সঙ্গে আমার সম্পর্কের স্মৃতিগুলোর মধ্যে একটি কথা বারবার ফিরে আসছে। সে আমাকে প্রায়ই বলত, “আপনাকে কেউ আর ধরতে পারবেন না, আপনি অনেক উপরে উঠবেন।” কথাটি সে কী আন্তরিকতা নিয়েই না বলত! কথার মধ্যে ছিল উৎসাহ, বিশ্বাস এবং একজন সহকর্মীর প্রতি অন্য একজন সহকর্মীর শুভ কামনা।

বয়সে আমরা সমান হলেও সুজন আমাকে সব সময় ‘আপনি’ বলেই সম্বোধন করত। এই সম্বোধনের মধ্যে আমি তঁার ভদ্রতা, শ্রদ্ধাবোধ ও ব্যক্তিত্বের পরিচয় পেতাম। অনেক সময় মানুষ বয়স, পদবি কিংবা সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে সম্বোধন বদলে ফেলেন। কিন্তু সুজনের ক্ষেত্রে এই ‘আপনি’ বলার অভ্যাসটি ছিল খুব পরিচিত ও স্বাভাবিক। আজ সেই শব্দটিও আমার কাছে স্মৃতির অমূল্য সম্পদ।

কর্মজীবনে আমরা সবাই কোনো না কোনো সময় উৎসাহের প্রয়োজন অনুভব করি। দীর্ঘ পথ চলতে গিয়ে ক্লান্তি আসে, বাধা আসে, ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়। কখনো নিজের সামথর্য নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। এমন সময় পরিচিত কারও মুখে আন্তরিক প্রশংসা কিংবা আশাবাদী একটি বাক্য নতুন শক্তি জোগায়। অনেক বড় বক্তৃতা নয়, অনেক মূল্যবান উপহারও নয়Ñকখনো শুধু কয়েকটি আন্তরিক শব্দই মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।

সুজন আমাকে যে কথাগুলো বলত, সেগুলো আজ নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসছে। তখন হয়তো স্বাভাবিকভাবে শুনেছি, হাসিমুখে উত্তর দিয়েছি কিংবা কাজের ব্যস্ততায় কথাটি মনে রাখার মতো করে ভাবিনি। আজ বুঝতে পারছি, একজন সহকর্মীর আন্তরিক উৎসাহও কত বড় সম্পদ। আমার এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় সে বিশ্বাস করত। তার সেই বিশ্বাসের কথা আজ মনে পড়লে একদিকে ভালো লাগে, অন্যদিকে বুকের ভেতর কষ্ট জমে ওঠে।

আমি ভাবি, যে মানুষটি আমাকে এত উৎসাহ দিয়েছে, তার নিজের জীবনেও তো ছিল সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। সেও নিশ্চয়ই আরও ভালো কিছু করতে চেয়েছিল, আরও কিছু শিখতে চেয়েছিল, পরিবারকে নিয়ে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে চেয়েছিল। তার সেই স্বপ্নগুলোর কথা ভাবলে নিজের সাফল্যের আকাঙ্ক্ষাও নতুনভাবে বিবেচনা করতে হয়। জীবনে উপরে ওঠা মানে শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; মানুষের প্রতি সম্মান, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যাওয়াও সাফল্যের অংশ।

সুজনের বলা কথাগুলো আমার কাছে এখন একধরনের দায়বদ্ধতা। সে যে বিশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলেছিল, সেই বিশ্বাসকে সম্মান জানাতে হলে আমাকে কাজ করে যেতে হবে, নিজেকে আরও উন্নত করতে হবে, মানুষের পাশে থাকতে হবে। আর তার স্মৃতিকে ধারণ করতে হলে মনে রাখতে হবেÑআমরাও যেন অন্যদের উৎসাহ দিতে কার্পণ্য না করি। কারণ, আমাদের একটি আন্তরিক বাক্য কারও জীবনে আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু আজ তাকে আর বলা হবে নাÑ‘সুজন, তোর কথাগুলো আমার মনে আছে। তোর সেই বিশ্বাস আমি ভুলিনি। তুই যে আশা নিয়ে আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে বলতিস, সেই কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে।’ এই না-বলা কথাগুলোই হয়তো এখন আমার ব্যক্তিগত শোকের অন্যতম গভীর অংশ।

অনেক অভিমান নিয়ে চলে গেলি, সুজন

এই কথাটি লিখতে গিয়ে কলম থেমে আসেÑ‘অনেক অভিমান নিয়ে চলে গেলি, সুজন।’

এটি কোনো অভিযোগ নয়, কোনো অজানা ঘটনার ব্যাখ্যাও নয়। এটি আমার মনের গভীরে জমে থাকা এক সহকর্মীকে হারানোর বেদনা, তঁার নীরব স্বভাবের কথা মনে করে নিজের কাছে ফিরে আসা কিছু প্রশ্নের প্রকাশ। জীবিত অবস্থায় আমরা কত কথা বলি, কত কাজ করি, কত বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করি। কখনো মনে করি, সামনে আরও অনেক দিন আছে; আজ না হলে কাল কথা হবে, আজকের অভিমান কাল মিটে যাবে, কোনো অসমাপ্ত আলোচনা অন্য একদিন শেষ করা যাবে।

কিন্তু মৃত্যু আমাদের সেই নিশ্চয়তাটুকু কেড়ে নেয়। তখন মনে হয়, যে কথাটি আজ বলা যেত, তা কেন বললাম না? যে মানুষটির সঙ্গে একটু বেশি সময় কাটানো যেত, তার জন্য কেন আরও কিছুটা সময় বের করলাম না? কোনো বিষয়ে মনোমালিন্য হলে কেন আন্তরিকভাবে জানতে চাইলাম না, তার মনে কষ্ট লেগেছে কি না? কেন ধরে নিলাম, সবকিছু ঠিক আছে?

সুজনের চলে যাওয়া আমাকে এসব প্রশ্নের মুখোমুখি দঁাড় করিয়েছে। তবে মানুষের জীবনকে শুধু আফসোসের মধ্যে আটকে রাখাও ঠিক নয়। আমরা কেউই সব সময় নিখুঁত আচরণ করতে পারি না। কর্মক্ষেত্রে মতবিরোধ থাকবে, কথার ভুল বোঝাবুঝি থাকবে, রাগ-অভিমানও থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসবের মধ্যেও যেন আমরা মানুষের মর্যাদা ও অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকি।

সুজন যদি কখনো মনে কষ্ট পেয়ে থাকে, যদি কোনো কথায় অভিমান জমিয়ে থাকে, আজ তার কাছে ক্ষমা চাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। এই অসহায়ত্বই মৃত্যুর নির্মমতা। মানুষ চলে গেলে তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ থাকে না; থাকে কেবল নিজের মনের ভেতর কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া। সেই কথোপকথনের কোনো উত্তর আসে না, তবু মানুষ কথা বলে যায়।

আজ মনে হচ্ছে, সুজনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের যে অংশগুলো অসমাপ্ত থেকে গেল, সেগুলো আর কোনোদিন পূর্ণ হবে না। তার হাসি, তার নীরবতা, তার খুনসুটি, তার শেখার আগ্রহ, তার উৎসাহ দেওয়ার অভ্যাসÑসবকিছুই এখন স্মৃতির অংশ। সে আর ফিরে এসে বলবে না, ‘আপনি অনেক উপরে উঠবেন।’ কোনো আলোচনায় মতবিরোধ হলে আর নীরবে সরে দঁাড়াবে না। সোহাঈদ খান জিয়ার সঙ্গে আর খুনসুটিতে মেতে উঠবে না।

কত সাধারণ দৃশ্য, অথচ কত অসাধারণ হয়ে উঠেছে আজ!

একটি পরিবার, তিনটি শিশুর ভবিষ্যৎ

সুজনের এই অকালমৃত্যুতে শোক শুধু আমাদের কর্মস্থলে সীমাবদ্ধ নয়। তঁার পরিবারের জন্য এটি এক গভীর ব্যক্তিগত বিপর্যয়। একজন স্বামীকে হারিয়েছেন তঁার স্ত্রী, একজন সন্তানকে হারিয়েছেন তঁার মা, একজন ভাইকে হারিয়েছেন তঁার ভাইবোনেরা। আর দুই মেয়ে ও এক ছেলে হারিয়েছে তাদের বাবাকেÑযিনি ছিলেন তাদের নির্ভরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়।

পৃথিবীতে পিতার অনুপস্থিতি কোনো শিশুর জীবনে কতটা গভীর প্রভাব ফেলে, তা ভাষায় সম্পূর্ণ প্রকাশ করা যায় না। বাবার হাত ধরে চলা, বাবার কাছে আবদার করা, অসুস্থ হলে বাবার স্নেহ পাওয়া, স্কুলের গল্প বলা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার মতো অসংখ্য মুহূর্তে শিশুরা বাবাকে খুঁজে পায়। একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনেও বাবার ভূমিকা থাকে নানা মাত্রায়। তঁার অনুপস্থিতিতে পরিবারকে শুধু আবেগের শূন্যতা নয়, বাস্তব জীবনের বহু চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হতে হয়।

সুজনের সন্তানদের সামনে এখন দীর্ঘ জীবন পড়ে আছে। তারা বড় হবে, পড়াশোনা করবে, জীবনের নানা পর্যায় অতিক্রম করবে। কিন্তু তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে বাবার অনুপস্থিতি হয়তো বারবার অনুভূত হবে। স্কুলের কোনো অনুষ্ঠানে, পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনে, নতুন কোনো অর্জনের মুহূর্তে কিংবা জীবনের কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দঁাড়িয়ে তারা বাবাকে খুঁজবে। এই অভাবের কোনো বিকল্প নেই।

এ কারণেই শোকাহত পরিবারের পাশে দঁাড়ানো আমাদের সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব। কারও মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই শোককে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ দেওয়া আরও বেশি জরুরি। বিশেষ করে অকালমৃত্যুতে উপার্জনক্ষম একজন মানুষের অনুপস্থিতি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। তাই সুজনের পরিবারের ভবিষ্যৎ, তঁার সন্তানদের শিক্ষা এবং তাদের স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার বিষয়টি আমাদের সহমর্মিতার কেন্দ্রে থাকা উচিত।

দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠ পরিবার, সহকর্মী, শুভাকাক্ষী ও সমাজের সামথর্যবান মানুষ সম্মিলিতভাবে কীভাবে পরিবারটির পাশে দঁাড়াতে পারেন, তা নিয়ে আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সামথর্য অনুযায়ী আর্থিক সহযোগিতা, সন্তানদের শিক্ষায় সহায়তা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি কোনো সহায়তা তহবিল গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। অবশ্যই এসব উদ্যোগ হতে হবে সম্মানজনক, স্বচ্ছ এবং পরিবারের প্রকৃত প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শোকের মুহূর্তে সহানুভূতির কথা বলা সহজ, কিন্তু সেই সহানুভূতিকে দীর্ঘস্থায়ী দায়িত্বে পরিণত করাই আসল পরীক্ষা। সুজন আমাদের সহকর্মী ছিলেন। তঁার পরিবারের পাশে দঁাড়ানো মানে শুধু একজন মৃত সহকর্মীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং তঁার ভালোবাসার মানুষগুলোর প্রতি আমাদের মানবিক কর্তব্য পালন করা।

নেপথ্যের কর্মীদের মূল্যায়ন জরুরি

সুজনের অকালমৃত্যু আমাদের সংবাদপত্রের কর্মপরিবেশ এবং নেপথ্যে কাজ করা কর্মীদের মূল্যায়ন নিয়েও নতুন করে ভাবতে শেখায়। সংবাদপত্র শুধু সাংবাদিক, সম্পাদক কিংবা প্রকাশকের সম্মিলিত পরিচয় নয়; এটি বহু মানুষের শ্রমে গড়ে ওঠা একটি প্রতিষ্ঠান। কম্পিউটার অপারেটর, পৃষ্ঠাসজ্জাকর্মী, সার্কুলেশন বিভাগের কর্মী, প্রুফ সংশোধনকারী, অফিস সহকারী এবং অন্যান্য কর্মীরাও এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একটি পত্রিকার পাঠক হয়তো কোনো সংবাদ প্রকাশের পেছনে কত মানুষের শ্রম ব্যয় হয়েছে, তা জানেন না। একটি শিরোনাম কতবার সংশোধিত হয়েছে, একটি পৃষ্ঠার বিন্যাস ঠিক করতে কতটা সময় লেগেছে কিংবা নির্ধারিত সময়ে পত্রিকা প্রকাশ করতে কতটা সমন্বয় দরকার হয়েছেÑএসবের বেশির ভাগই পাঠকের চোখের আড়ালে থাকে। কিন্তু আড়ালে থাকা মানেই গুরুত্বহীন হওয়া নয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি কর্মীর সম্মান, নিরাপত্তা ও কল্যাণ একটি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক দায়িত্বের অংশ। কর্মীদের কাজের স্বীকৃতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহযোগিতার ব্যবস্থা থাকা দরকার। একই সঙ্গে কর্মীদের মানসিক সুস্থতা, বিশ্রাম, কাজের চাপ ও ব্যক্তিগত সমস্যার প্রতিও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ।

সুজনের মৃত্যু থেকে কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণ বা অবহেলার সিদ্ধান্ত টেনে নেওয়ার সুযোগ নেই, যদি সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকে। কিন্তু একজন সহকর্মীর আকস্মিক চলে যাওয়া আমাদের জীবন ও কাজের বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। ব্যস্ততার কারণে আমরা অনেক সময় নিজেদের শারীরিক অবস্থা, বিশ্রাম কিংবা মানসিক ক্লান্তিকে গুরুত্ব দিই না। প্রতিষ্ঠান ও সহকর্মীদেরও উচিত একে অন্যের খেঁাজ নেওয়া, অসুস্থতা বা অস্বস্তির কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজনে যথাসময়ে চিকিৎসা নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করা।

কোনো কর্মীর অবদানকে শুধু তঁার কাজের ফল দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। তার মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবারের প্রতিও আমাদের শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সুজনের স্মৃতি আমাদের শেখায়, নেপথ্যের কর্মীদের পরিচিতি হয়তো সীমিত, কিন্তু তাদের অবদান গভীর। তাদের শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া, তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা এবং তাদের পরিবারের বিপদে পাশে দঁাড়ানো একটি সুস্থ কর্মসংস্কৃতির অপরিহার্য শর্ত।

জীবনের অনিশ্চয়তা ও স্মৃতির অমরত্ব

মৃত্যু মানুষের জীবনের এক অনিবার্য সত্য। ধর্ম, দর্শন ও মানবসভ্যতার ইতিহাসে মৃত্যু নিয়ে অসংখ্য আলোচনা হয়েছে। তবু প্রিয় মানুষের মৃত্যু সামনে এলে সব ব্যাখ্যা যেন মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। আমরা জানি, একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে। কিন্তু পরিচিত মানুষটির বিদায়ের মুহূর্তে এই জ্ঞান আমাদের শোককে কমাতে পারে না।

বিশেষ করে যখন কেউ জীবনের মধ্যগগনে, কর্মব্যস্ত সময়ে, পরিবার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা পরিকল্পনার মধ্যে চলে যান, তখন তার মৃত্যুকে মেনে নেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। সুজনের বয়স ছিল মাত্র ৪৩ বছর। এই বয়সে মানুষের সামনে সাধারণত আরও অনেক সম্ভাবনা থাকে। সন্তানদের বড় করে তোলা, পরিবারের পাশে থাকা, নিজের দক্ষতা বাড়ানো, জীবনের অপূর্ণ ইচ্ছাগুলো পূরণ করাÑএমন কত পরিকল্পনাই না থাকতে পারে!

কিন্তু জীবন সব সময় আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। এই অনিশ্চয়তা আমাদের ভীত করার জন্য নয়; বরং জীবনের মূল্য বোঝানোর জন্য যথেষ্ট। আমরা যাদের ভালোবাসি, তাদের সঙ্গে সম্পর্ককে যত্ন করা দরকার। প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলার সময়, সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করার সময়, পরিবারের সদস্যদের পাশে থাকার সময়Ñএসবকে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ, আগামী দিনের নিশ্চয়তা আমাদের হাতে নেই।

তবে মৃত্যুর কথা মনে রেখে জীবন থেকে আনন্দ কিংবা আশাবাদ হারিয়ে ফেলাও সমাধান নয়। বরং প্রতিটি দিনকে অর্থবহ করে তোলা, মানুষের প্রতি সদয় হওয়া, অন্যের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করা এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করাই হতে পারে জীবনের প্রতি আমাদের যথার্থ সম্মান।

সুজনের চলে যাওয়া আমাদের শিখিয়ে গেল, মানুষের মূল্য তার অনুপস্থিতির পর নয়, জীবিত অবস্থাতেই উপলব্ধি করা জরুরি। সহকর্মীর হাসিকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়ার পাশাপাশি তার ক্লান্তিও বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তার দক্ষতার প্রশংসা করতে হবে, শেখার আগ্রহকে উৎসাহ দিতে হবে, মতের অমিল হলে সম্মান বজায় রাখতে হবে। সম্পর্কের মধ্যে যেন অকারণ অবহেলা ও দীর্ঘস্থায়ী অভিমান জমে না থাকে, সে দিকেও নজর দিতে হবে।

চঁাদপুর প্রেসক্লাব ও দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠ পরিবারের শোক প্রকাশ, সহকর্মীদের শেষ বিদায় এবং সুজনকে নিয়ে স্মৃতিচারণ প্রমাণ করে, তিনি মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তঁার কর্মজীবনের পরিচয় ছিল দায়িত্ব, দক্ষতা ও নিষ্ঠা; আর ব্যক্তিগত পরিচয়ের বড় অংশজুড়ে ছিল হাসিমুখ, আন্তরিকতা ও সহকর্মীদের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক।

মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার কাজের চিহ্ন থেকে যায়। কোনো মানুষকে মনে রাখার জন্য সব সময় বড় কোনো কীর্তির প্রয়োজন হয় না। কারও প্রতি আন্তরিক আচরণ, অন্যকে উৎসাহ দেওয়া, কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতা করা কিংবা হাসিমুখে পাশে দঁাড়ানোও মানুষের স্মৃতিতে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারে। সুজন আমাদের কাছে সেই পরিচিত মানুষ, যঁার স্মৃতি কোনো আনুষ্ঠানিক শোকবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বিদায়, প্রিয় সহকর্মী

প্রতিদিন অফিসের ব্যস্ততা আগের মতোই ফিরে আসবে। পত্রিকা প্রকাশিত হবে, নতুন সংবাদ আসবে, কম্পিউটারের পর্দায় কাজ চলবে, সহকর্মীরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করবেন। সময়ের নিয়মে জীবনের গতি থেমে থাকবে না। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেও সুজনের অনুপস্থিতি থেকে যাবে।

কোনো পরিচিত হাসি দেখলে, কোনো কর্মীর নীরবতা চোখে পড়লে, সোহাঈদ খান জিয়ার সঙ্গে পুরোনো খুনসুটির কথা মনে হলে কিংবা নিজের কাজের ফঁাকে সুজনের উৎসাহ দেওয়া বাক্যগুলো মনে পড়লে আমরা আবারও তঁার কথা ভাবব। মনে পড়বে, বয়সে সমান হয়েও সে আমাকে ‘আপনি’ বলে ডাকত। মনে পড়বে, আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে সে আশাবাদী ছিল। মনে পড়বে, কোনো মতবিরোধে সে অনেক সময় নীরব হয়ে যেত, অথচ তার ভেতরে জমে থাকত অভিমান।

এসব স্মৃতি আমাদের কঁাদাবে, আবার আমাদের মানুষ হিসেবেও সমৃদ্ধ করবে। কারণ, শোকের ভেতর দিয়েও আমরা সম্পর্কের মূল্য শিখি। একজন মানুষ চলে গিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেন, ভালোবাসা প্রকাশ করতে দেরি করা উচিত নয়, কারও অবদানকে ছোট করে দেখা উচিত নয়, আর মানুষের প্রতি সদয় হওয়ার সুযোগকে অবহেলা করা উচিত নয়।

প্রিয় সুজন, তুই হয়তো জানিস না, তোর বলা ছোট ছোট কথাগুলো আজ কত বড় হয়ে ফিরে এসেছে। তুই যে হাসিমুখে অফিসে আসতি, যে আন্তরিকতায় কাজ করতি, যে বিশ্বাস নিয়ে আমাকে বলতিÑ‘আপনি অনেক উপরে উঠবেন’Ñএসব আর সাধারণ স্মৃতি নয়। এগুলো এখন আমাদের কাছে তোর রেখে যাওয়া অমূল্য সম্পদ।

তোর সঙ্গে আর কোনো নতুন আলোচনা হবে না। কোনো কাজের ফঁাকে তোর মুখে নতুন কিছু শেখার আগ্রহের কথা শুনব না। তোর সঙ্গে সোহাঈদ খান জিয়ার খুনসুটি দেখব না। কোনো মতবিরোধে তুই নীরবে থেমে গেলে আর তোকে বলার সুযোগ হবে নাÑ‘সুজন, মন খারাপ করিস না, কথা বল।’ জীবনের কত সাধারণ মুহূর্ত যে শেষ পর্যন্ত অসাধারণ স্মৃতি হয়ে ওঠে, তোর চলে যাওয়া আমাদের তা বুঝিয়ে দিল।

অনেক অভিমান নিয়ে চলে গেলি, সুজন। হয়তো আমাদের অনেক কথা বলা বাকি ছিল, অনেক স্মৃতি তৈরি হওয়ার বাকি ছিল, অনেক ভুল বোঝাবুঝি দূর হওয়ার বাকি ছিল। কিন্তু এখন আর কোনো আক্ষেপের উত্তর পাওয়ার সুযোগ নেই। আছে শুধু তোর জন্য গভীর ভালোবাসা, অসীম শোক এবং প্রার্থনা।

মহান আল্লাহ তোর জীবনের সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিন। তোর কবরকে প্রশস্ত ও নূরান্বিত করুন, কবরের জীবন শান্তিময় করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। তোর শোকসন্তপ্ত স্ত্রী, দুই মেয়ে, এক ছেলে, মা, ভাইবোন ও পরিবারের সবাইকে এই অসহনীয় বেদনা সহ্য করার শক্তি দিন। বিশেষ করে তোর সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুন্দর ও নিরাপদ হোক, তাদের জীবনের পথচলায় যেন মানবিক মানুষেরা পাশে দঁাড়ান।

সুজন, তুই আর অফিসে ফিরবি নাÑএই সত্যটি মেনে নিতে আমাদের সময় লাগবে। তোর পরিচিত চেয়ার, কাজের টেবিল, কম্পিউটার আর সহকর্মীদের ব্যস্ততার মধ্যে তোর অনুপস্থিতি বারবার অনুভূত হবে। কিন্তু তোর স্মৃতি আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে না।

তুই চলে গেছিস, অথচ তোর বলা কথাগুলো রয়ে গেছে। তোর হাসি রয়ে গেছে আমাদের স্মৃতিতে, তোর শ্রমের চিহ্ন রয়ে গেছে দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠের কর্মজীবনের অধ্যায়ে, আর তোর প্রতি ভালোবাসা রয়ে গেছে আমাদের হৃদয়ে। বিদায়, প্রিয় সহকর্মী সুজন। তোর জন্য আমাদের গভীর শোক, অশেষ ভালোবাসা ও অন্তহীন সমবেদনা।

অনেক অভিমান নিয়ে চলে গেলি, সুজনÑকিন্তু তোর স্মৃতি থেকে যাবে, যত দিন আমরা বেঁচে থাকি।

উজ্জ্বল হোসাইন : প্রয়াত সুজনের সহকর্মী, দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়