বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৫

স্থানীয় প্রশাসনের এমন কাজ ছোট হলেও প্রভাব কিন্তু ব্যাপক

অনলাইন ডেস্ক
স্থানীয় প্রশাসনের এমন কাজ ছোট হলেও প্রভাব কিন্তু ব্যাপক

সমাজে মানবিকতা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় কতোটা গভীর হতে পারে, তার একটি বেদনাদায়ক উদাহরণ ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা জয়নব ভানুর ঘটনা। ছয় ছেলে ও চার মেয়ের মা হয়েও বার্ধক্যে নিজের সন্তানদের কারও ঘরে ঠঁাই না পাওয়া শুধু একটি পরিবারের দুর্ভাগ্য নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের পর শাহরাস্তি উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বৃদ্ধার মাথা গেঁাজার ঠঁাই নিশ্চিত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, স্থানীয় প্রশাসনের ছোট উদ্যোগও মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

সংবাদটি প্রকাশের পর শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরা খাতুন সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টির সত্যতা যাচাই করেন। পারিবারিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে জয়নব ভানুকে তঁার সেজো ছেলে আনোয়ার হোসেনের বাসায় থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতেও তঁার খেঁাজখবর নেওয়া এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নজরদারিতে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এই তৎপরতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কারণ, প্রশাসনের দায়িত্ব কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কিংবা সরকারি উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অসহায় মানুষের পাশে দঁাড়ানো এবং তাদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করাও জনসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে এই ঘটনায় স্বস্তির পাশাপাশি গভীর উদ্বেগের বিষয়ও রয়েছে। যে মা সন্তানদের লালন-পালন করে বড় করেছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তঁার জন্য সন্তানদের ঘরে সামান্য জায়গাও না পাওয়া আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধকে প্রশ্নের মুখে দঁাড় করায়। পারিবারিক ও সম্পত্তিগত বিরোধ থাকতে পারে, মতের অমিলও হতে পারে; কিন্তু কোনো বিরোধই একজন বৃদ্ধা মায়ের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার অজুহাত হতে পারে না। মা-বাবার ভরণপোষণ ও দেখাশোনা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনেও এ বিষয়ে সন্তানের দায়িত্ব নির্ধারিত রয়েছে।

এখানে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একটি সংবাদ শুধু ঘটনার বিবরণ প্রকাশ করেনি; বরং প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একজন অসহায় মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি করেছে। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা যে সমাজের প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের কণ্ঠস্বর হতে পারে, জয়নব ভানুর ঘটনা তারই প্রমাণ। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিয়েছে, প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে জনস্বার্থভিত্তিক কার্যকর যোগাযোগ থাকলে অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব।

তবে বৃদ্ধার জন্য আপাতত আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাই শেষ কথা নয়। সেখানে তঁার নিরাপত্তা, নিয়মিত খাবার, চিকিৎসা, যত্ন এবং মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দু মাস পর পুনরায় খেঁাজ নেওয়ার ঘোষণা ইতিবাচক। কিন্তু মানবিক সহায়তার কার্যকারিতা নির্ভর করে তার ধারাবাহিকতার ওপর। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজের সচেতন মানুষ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদেরও এ দায়িত্বে এগিয়ে আসতে হবে।

জয়নব ভানুর ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পাশে দঁাড়াতে সব সময় বড় প্রকল্প কিংবা বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি উদ্যোগ, একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত কিংবা সময়মতো নেওয়া একটি পদক্ষেপই কারও জীবনে আশার আলো জ্বালাতে পারে। তাই স্থানীয় প্রশাসনের এমন কাজ ছোট হলেও তার প্রভাব ব্যাপকÑএটি শুধু একজন বৃদ্ধার আশ্রয় নিশ্চিত করার বিষয় নয়; বরং মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও জনসেবার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনারও একটি সুযোগ। এই উদ্যোগ যেন সাময়িক সমাধানে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সমাজের প্রতিটি অসহায় ও অবহেলিত মানুষের পাশে দঁাড়ানোর প্রেরণা হয়ে ওঠে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়