শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪২

বাংলাদেশের ‘দেশজ নাট্যশৈলী’র কেন্দ্রীয় আঙ্গিক নির্ধারণে পদক্ষেপ

মোস্তফা কামাল যাত্রা
বাংলাদেশের ‘দেশজ নাট্যশৈলী’র কেন্দ্রীয় আঙ্গিক নির্ধারণে পদক্ষেপ

এক দেশ, বহু জাতি। জাতি-নির্ভর একক দেশ খুঁজে পাওয়া কঠিন। ‘বাঙাল’ থেকে ‘বাঙালি’ আর ‘বাঙালি’ থেকে ‘বাংলাদেশি’ কিন্তু বাংলাদেশে কি একটিই জাতি? নিশ্চয়ই নয়। তাই ‘দেশজ নাট্য’ (ইন্ডিজিনাস থিয়েটার) এবং ‘জাতীয় নাট্য’-র (ন্যাশনাল থিয়েটার) কেন্দ্রীয় রূপ চূড়ান্ত করা খুব সহজ বিষয় নয়। সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে পেঁৗছানো একটি দেশের ‘দেশজ’ বা ‘জাতীয়’ যে অভিধাতেই বলি না কেন, একটি কেন্দ্রীয় নাট্যশৈলী নেই তা ভাবা যায় না। সীমানা বা মানচিত্রগত স্বীকৃত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে বসবাসকারী বহুজাতিক জনগোষ্ঠীর চর্চিত যে নাট্যধারাসমূহ রয়েছে, তার মধ্যে অবশ্যই একটি দেশজ আবাহ দৃশ্যমান। তবে চর্চিত সেই দেশজ নাট্যধারাসমূহের সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় বা জাতীয় স্বরূপ অদ্যাবধি রাষ্ট্রযন্ত্রের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জাতীয় নাট্যশালা চূড়ান্ত করতে পারেনি। দেশব্যাপী চর্চিত নাট্যধারাসমূহের ব্যুৎপত্তি আর উৎপত্তিগত দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, তার সবগুলো এই ভূমি থেকে উদ্ভূত নয়। আবার ধর্মীয় আগ্রাসন বিবেচনায় সংস্কৃত নাট্যের উদ্ভব এই বঙ্গে হলেও, তা কি পুরোপুরি দেশজ? ইতিহাসের কালপর্বে ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রভাবজাত সময়ে গেরাসিম লেবেদেফ কর্তৃক প্রসেনিয়াম ধারায় যে নাট্যচর্চার সূচনা হয়েছিলো এই অঞ্চলে, তার বঙ্গীয় স্বরূপও কি আমাদের দেশজ নাট্য? উত্থাপিত প্রশ্ন দুটির যৌক্তিক উত্তর খুঁজে পেতে গবেষণামূলক বিশ্লেষণের পথপরিক্রমা অনুসরণ অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশের প্রাগৈতিহাসিকতা এবং ভূ-প্রকৃতির গঠনকে বিবেচনায় নিয়ে এই প্রসঙ্গে আলোকপাত করা জরুরি। কারণ প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে বঙ্গ অঞ্চলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ভূ-প্রকৃতিগত দিক বিবেচনায় সৃষ্ট নাট্যঘরানাই হলো ঐ ভূমির নিজস্ব নাট্য। সেখানে জাতপ্রথা মুখ্য বিবেচনা নয়। জাতিভেদে স্ব স্ব নাট্য থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই জাতীয় নাট্যের কেন্দ্রীয় স্বরূপ নির্ধারণ বা স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক পরম্পরার গতিপ্রকৃতির আলোকে মৌলিক কতগুলো বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের সীমান্ত তথা মানচিত্রের অভ্যন্তরে বসবাসকারী জাতি ও নৃগোষ্ঠীগুলোর চর্চিত নাট্যক্রিয়া বহুমাত্রিক। সুতরাং, সেখানে জাতীয় নাট্যের কেন্দ্রীয় বা রাষ্ট্রীয় ঘরানা সুনির্দিষ্টকরণের ক্ষেত্রে অনেক বিষয়ে সচেতন বিবেচনা প্রণিধানযোগ্য। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে প্রসেনিয়াম ধারণার বেড়াজালে এই অঞ্চলের নাট্যচরিত্রকে গণ্ডিবদ্ধ করা যৌক্তিক নয়। কারণ মূলত এই অঞ্চলে চর্চিত নাট্যশৈলীসমূহ মুক্তাঙ্গন আদলের, অর্থাৎ উন্মুক্ত আবহের। তাই বাংলাদেশের দেশজ নাট্যের স্বরূপ নির্ধারণে এ দেশের সীমানায় বসবাসকারী নৃগোষ্ঠীসমূহের চর্চিত নাট্যশৈলীগুলোর একটি সমন্বিত রূপ নির্ধারণ অত্যাবশ্যক। এই সমন্বিত স্বরূপ নির্মাণে প্রয়োজন প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে প্রথার ভিত্তিতে যে সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি হয়েছিলো, তাকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের একক বৈচিত্র্যমণ্ডিত নাট্যঘরানার সংশ্লেষে একটি সম্মিলিত নাট্যধারার উদ্ভব ঘটানো; যাতে নব্যনাট্যের প্রকৃতি জাতিসত্তার ঊর্ধ্বে উঠে দেশজ চরিত্র ধারণ করতে সমর্থ হয়। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রগণ কর্তৃক যে স্বতন্ত্র নাট্যানুশীলন এই বঙ্গদেশে প্রাচীনকালে সূচিত হয়ে নানা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আজও এ অঞ্চলে (বিশেষ করে বর্তমান বাংলাদেশে) চর্চিত হচ্ছে তাকে ব্যাপক গবেষণার মধ্য দিয়ে একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য নাট্য-আদলে রূপান্তরিত করা। এক্ষেত্রে পরিবেশনা (প্রেজেন্টেশন) থেকে উপস্থাপনা (রি-প্রেজেন্টেশন) প্রক্রিয়ার নানান ধাপ ও নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির যৌক্তিক ও মৌলিক প্রসঙ্গগুলোর মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। প্রশ্ন হলো বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বঁাধার এই গুরুদায়িত্ব কার? রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অদ্যাবধি কি কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো মনোনীত কমিটিকে সেই দায়িত্ব অর্পণ করেছে, যারা আলোচ্য অভিধা চূড়ান্তকরণে কাজ করবে? বিশ্বের যেসব দেশে জাতীয় বা দেশজ নাট্য রয়েছে, তা নির্ধারণে সেই সব দেশ বা রাষ্ট্র কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছিলো এক্ষেত্রে সেই অভিজ্ঞতা সর্বাগ্রে আমাদের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের জানা প্রয়োজন। যদিও সেই সব রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রের ভূ-প্রকৃতি ও প্রেক্ষাপটের পার্থক্য রয়েছে, তথাপি তা জানা থাকলে সে সম্পর্কে অন্তত একটি স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে। নিশ্চয়ই সেই অভিজ্ঞতা আমাদের দেশজ নাট্যের জাতীয় স্বরূপ সুনির্দিষ্টকরণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। আমার বিবেচনায়, আমাদের দেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় অনতিবিলম্বে এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি জাতীয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশের ‘জাতীয়’ নয়, বরং ‘দেশজ নাট্য-আঙ্গিক’ চূড়ান্তকরণের পথ প্রশস্ত করবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জাতীয় নাট্যশালার অবকাঠামোকে ব্যবহার করে, মনোনীত বা নির্বাচিত কমিটির নেতৃত্বে সবার মতামত নিয়ে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নাট্যশৈলী নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে সর্বাগ্রে একটি নীতিগত কাঠামো অনুমোদন করা সময়ের দাবি। সর্বজনগ্রহণযোগ্য ও অনুমোদিত সেই কাঠামোর (নীতিমালা) আলোকে জাতীয় নাট্যশালার অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে একটি রূপরেখা (রোডম্যাপ) অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এই কাজটি সুসম্পন্ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যাতে গঠিত রাষ্ট্রীয় কমিটি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই কাজটি সুসম্পন্ন করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে সমর্থ হন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিস্থ জাতীয় নাট্যশালায় নিযুক্ত জনবলের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নাট্যশৈলী সুনির্দিষ্ট করার জন্যে উল্লেখিত খণ্ডিত প্রস্তাবটি বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হোক, যাতে দ্রুততম সময়ে জাপানের ‘নো’ ও ‘কাবুকি’ এবং চীনের ‘অপেরা’-র ন্যায় বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নাট্যশৈলী তথা ঘরানার জাতীয় স্বরূপ সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়। এটি জাতীয় স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি একটি বিষয়। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দেশের বিশিষ্টজনদের অভিমত ও পরামর্শ এই প্রস্তাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। বাংলাদেশের নাট্যনেতৃত্ব যেখানে বিশ্বনাট্যসভার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেখানে কালক্ষেপণ না করে অনতিবিলম্বে এ প্রসঙ্গে একটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, যাতে বাংলাদেশের ‘দেশজ’ বা ‘ইন্ডিজিনাস’ নাট্যশৈলীর কেন্দ্রীয় আঙ্গিক নির্ধারণোত্তর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত হয়। অন্যথায় বিশ্বনাট্যসভায় আমাদের নাট্যনেতৃত্বকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) কেন্দ্রীয় পর্ষদ অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস যেহেতু বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নাট্যব্যক্তিত্বদের দ্বারা পরিচালিত বা প্রভাবিত হয়, সেহেতু বিশ্বনাট্যসভায় এ ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার পূর্বেই দেশজ নাট্যের কেন্দ্রীয় বা জাতীয় রূপ সুনির্দিষ্টকরণ বাংলাদেশের জন্য অত্যাবশ্যক। তা ‘জাতীয় নাট্য’ অভিধায় না হয়ে ‘দেশজ নাট্য’ শিরোনামেই হওয়া যুক্তিযুক্ত হবে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মানিত সচিব ও উপসচিব মহোদয়দের কাছে বিনম্র প্রত্যাশাÑপ্রস্তাবিত প্রসঙ্গটি দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নবনিযুক্ত মহাপরিচালক মহোদয়ের অন্যতম প্রধান কাজ হিসেবে সম্পাদনের নির্দেশনা দিয়ে জাতীয় নাট্য-কাঠামোকে সুসমৃদ্ধ করার একটি গঠনমূলক পদক্ষেপ নেবেন। লেখক : মোস্তফা কামাল যাত্রা, অতিথি শিক্ষক, নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক: ইউনাইটেড থিয়েটার ফর সোশ্যাল অ্যাকশন (UTSA) ওয়েবসাইট : wwww w.utsabd.org ইমেইল : [email protected]

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়