প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২৬
নিষিদ্ধ সত্ত্বেও কারেন্ট জালের মতোই ট্রাক্টরের বহুল ব্যবহার?

আইন আছে, নিষেধাজ্ঞা আছে, আছে জনদুর্ভোগ ও সড়ক ধ্বংসের বাস্তব চিত্র-তবু থামছে না ট্রাক্টরের অবাধ চলাচল। চাঁদপুরের গ্রামীণ সড়কগুলোতে কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য নির্মিত ট্রাক্টর ও ট্রলির বেপরোয়া ব্যবহার এখন যেন নিয়ন্ত্রণহীন এক তাণ্ডবে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বালু পরিবহনে এসব যান ব্যবহারের কারণে একদিকে সরকারি অর্থে নির্মিত সড়ক দ্রুত নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন হয়ে উঠছে দুর্বিষহ। প্রশ্ন হচ্ছে, নিষিদ্ধ হওয়ার পরও কারেন্ট জালের মতোই এসব ট্রাক্টরের ব্যবহার এত ব্যাপক কেন?
কৃষিকাজে ট্রাক্টরের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু কৃষিকাজের জন্য অনুমোদিত যান যখন জনবহুল সড়কে বাণিজ্যিকভাবে বালু, মাটি বা অন্যান্য ভারী পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হয়, তখন সেটি নিছক নিয়মভঙ্গ নয়-এটি জনস্বার্থের প্রতি সরাসরি অবজ্ঞা। চাঁদপুর সদরসহ জেলার আটটি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ ও সংযোগ সড়কে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা প্রশাসনিক নজরদারির দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
একটি সড়ক নির্মাণে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। সেই সড়ক যদি অতিরিক্ত ভার বহনকারী যান চলাচলের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে যায়, তাহলে ক্ষতি শুধু একটি রাস্তার নয়; অপচয় হয় জনগণের করের টাকা, বাধাগ্রস্ত হয় যোগাযোগব্যবস্থা, ব্যাহত হয় শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহনসহ মানুষের দৈনন্দিন জীবন। একবার রাস্তা নষ্ট হওয়ার পর আবার সরকারি অর্থে তা মেরামত করা হয়। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ট্রাক্টর চলাচল বন্ধ না হলে সেই মেরামতও হয়ে পড়ে অর্থহীন। এটি কার্যত সরকারি অর্থের অপচয়ের এক দুষ্টচক্র।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রতিবেদনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অনভিজ্ঞ চালকদের বেপরোয়া গতিতে ট্রাক্টর চালানোর অভিযোগ এসেছে। বিকট শব্দ, ধুলোর আস্তরণ এবং ভারী যান চলাচলের কারণে পথচারী ও স্থানীয়দের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক জনজীবনের অংশ হতে পারে না। আজ সড়ক ভাঙছে, কাল হয়তো ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা ঘটার পর দায় নির্ধারণের চেয়ে দুর্ঘটনা ঠেকানোই রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অবশ্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় ট্রাক্টর ও ট্রলির অবৈধ ব্যবহার চলছে। অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর। কারণ কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড কেবল চালক বা মালিকের একার পক্ষে দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়; এর পেছনে যদি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক প্রশ্রয় থাকে, তবে সেই প্রশ্রয়দাতাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আইন সবার জন্য সমান-প্রভাবশালী ও সাধারণের জন্য আলাদা আইন থাকতে পারে না।
এখানে কারেন্ট জালের উদাহরণটিও প্রাসঙ্গিক। যেমন নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল মাছের প্রজনন ও জলজসম্পদ ধ্বংস করে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত ভারী ট্রাক্টর গ্রামীণ অবকাঠামোর স্থায়িত্ব নষ্ট করে এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বার্থের ক্ষতি করে। পার্থক্য শুধু মাধ্যমের; উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড বন্ধে আইনের প্রয়োগ জরুরি। নিষেধাজ্ঞা কাগজে থাকলে তার কোনো মূল্য নেই; আইনের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয় প্রয়োগে।
তাই শুধু মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে কয়েকটি ট্রাক্টর আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত ও সমন্বিত নজরদারি। অবৈধ বালু পরিবহন বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, নিষিদ্ধ যানবাহনের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অনভিজ্ঞ চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যেসব সড়ক অতিরিক্ত ভারী যান চলাচলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
চাঁদপুরের গ্রামীণ সড়ক জনগণের সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষা করা প্রশাসনের দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের গাফিলতি বা প্রভাবশালীদের চাপ মেনে নেওয়া জনস্বার্থবিরোধী। নিষিদ্ধ ট্রাক্টরের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় সড়ক ধ্বংস, জনদুর্ভোগ ও সরকারি অর্থের অপচয়ের এই চক্র আরও বিস্তৃত হবে।
প্রশ্ন তাই থেকেই যায়-নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও যদি ট্রাক্টর অবাধে চলতে পারে, তবে আইনটি আসলে কার জন্য? আর প্রশাসনের নীরবতা যদি অবৈধ কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করে, তাহলে নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনই বা কী? এখন সময় কাগজের নিষেধাজ্ঞাকে বাস্তব প্রয়োগে রূপ দেওয়ার। জনস্বার্থে সড়ক বাঁচাতে হলে নিষিদ্ধ ট্রাক্টরের এই তাণ্ডব থামাতেই হবে।





