প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০২
রথযাত্রা ও বাঙালি সনাতনীদের উৎসব

ভারতবর্ষের বাঙালি সনাতনীদের বিবিধ পার্বণ ও উৎসবের মধ্যে অন্যতম যাত্রা (আগম ও নিগম) উৎসব রথযাত্রা। আর এই উৎসবের মূলে শ্রীচৈতন্যদেব। সনাতনী বাঙালি হিন্দুদের বর্ণবৈষম্য, জাতপাত ও নানা কুসংস্কার থেকে পরিত্রাণ পেতেই প্রভুর আগমন এবং বৈষ্ণবীয় ধারায় এক যুগান্তকারী আন্দোলনের সূচনা তিনি করেছিলেন কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে। তঁার একাচার নীতির ভাবধারার অন্যতম মহামিলনের দৃষ্টান্ত রথযাত্রা উৎসব, এককথায় বলা যায় ভক্ত ও ভগবানের মিলন। তিনি দীর্ঘ দিনের সনাতনী প্রথাগত ভাবধারায় পরিচালিত আবদ্ধ ভগবানের বিগ্রহকে রাজপথে ভক্তদের মাঝে নিয়ে এসেছেন। কিন্ত কেন এমন কর্মকাণ্ড?
নীলাচলে মহাপ্রভু জয় জগন্নাথ...নবদ্বীপের পাঠ চুকিয়ে তিনি যখন নীলাচল তথা উরিষ্যার পুরীতে চলে যাচ্ছেন, তখন তঁার পার্ষদ ও ভক্তগণ শূন্যতা পোষণহেতু (!) অশ্রুসিক্ত নয়নে মিনতি করে বলেছিলেন, বাঙলা ছেড়ে তুমি প্রভু ( চৈতন্যদেব) যাচ্ছ নীলাচলে ( পুরীতে), আমরাও যাবো তোমায় অনুসরণ করে পুরীর জগন্নাথ দর্শনে। তোমায় ছাড়া আমরা থাকবো কেমনে?
বাংলার ভক্তদের এমন আকুতির কারণেই মহাপ্রভু জগন্নাথকে নিয়ে আসলেন বাঙলার ঘরে ঘরে। কিন্তু তিনিই যে জগন্নাথ তাহা গোপনেই রাখলেন রাধাকান্ত ভাব প্রকাশে। বর্ষ গণনায় আষাঢ়ের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে বাঙালির ঘরে ঘরে জগন্নাথের রথযাত্রার এমন আয়োজনের মূলেই তিনি জগন্নাথরূপী চৈতন্যদেব।বাঙালির এ উৎসব এখন সমগ্র বিশ্বে এক প্রকার ভক্তি আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ভক্তগণ তঁার স্বরূপ উপলব্ধি করায়,
“নীলাচলে মহাপ্রভু, জয় জগন্নাথ। যেই গৌর সেই কৃষ্ণ, সেই জগন্নাথ।।”
এ উৎসবের পেছনে কেবল লীলা ও কল্পকাহিনী সাধারণ সংসারী জীবনের জন্যে প্রযোজ্য হলেও জ্ঞানমার্গে বিচরণরত তত্ত্বদর্শীদের চিন্তা ও চেতনায় প্রকাশিত হয়ে জন্মান্তরের রহস্য এবং মুক্তির বিধান। এককথায় বলতে হয় মুক্তিকামী মানুষের মুক্তির বিধান, যা সনাতনী দর্শনে জীবের একমাত্র কাম্য।
যুঞ্জন্নেবং সদাত্মানং যোগী নিয়তমানসঃ।
শান্তিং নির্বাণপরমাং মৎসংস্থামধিগচ্ছতি \ গীতা-১৫/৬
গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, জীবের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত জগতে আসা- যাওয়া আর এটাই পুনঃজন্ম বা জন্মান্তরবাদ। এটা অন্য মতাদর্শরা প্রত্যক্ষভাবে না মানলেও সনাতনী হিন্দুরা প্রত্যক্ষভাবেই মানেন বলে মানুষ জন্মের পর থেকে যোগ সাধনার পথ অবলম্বন করে যোগী হবার চেষ্টা করেন, তথা নিজের মাঝে নিজের সত্তাকে খুঁজে বেড়ায়।
যোগ সাধনার শর্তই হচ্ছে নিজের মন বা চিত্তকে সংযত করা, সংযত করতে পারলেই চিত্ত স্থির হয় আর স্থিরচিত্তে যোগী নির্বাণরূপ পরম শান্তি লাভ করেন। এই শান্তি তখনই অনুভূত হয়ে থাকে, যখন তঁার তথা পরমেশ্বরে চিত্ত স্থিত হয় বা ব্রহ্মস্থিতি লাভ হয়, আর এই ব্রহ্মস্থিতিই মুক্তি।
ব্রহ্ম, আত্মা, ভগবান (জগন্নাথ, বলদেব, সুভদ্রা) একই শব্দে প্রকাশ পায়, যখন মানবের মধ্যে শুদ্ধ ভক্তির উদয় হয় আর শুদ্ধ ভক্তি হতে হবে আবরণশূন্য (জগন্নাথ বিগ্রহ হস্তপদ বিহীন)। আমাদের মাঝে শুদ্ধ ভক্তির উদয় না হবার কারণই আবরণ দ্বারা তথা বিভিন্ন নিয়ম- কানুন বা বিধিতে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছ। কিন্তু আমরা যখন মায়ের কোলে উত্তানশায়ী বা ঘুমের কোলে ব্রহ্মে অবস্থিতিতে ছিলাম, যা মনের গোচরে নেই, তখন তো কোনো বিধি-বিধান ছিলো না।
শ্রীমদ্ভাগবত গীতার অষ্টম অধ্যায়ের ‘অক্ষরব্রহ্ম যোগ’-এর ২৪ থেকে ২৭ শ্লোকের তাৎপর্যে সনাতনের দেবযান ও পিতৃযান, জন্ম-মৃত্যু এবং পরমগতি আলোচনায় শ্রীকৃষ্ণ প্রিয় সখা অর্জুনের মাধ্যমে জগৎকে জ্ঞান প্রদান করেছেন। ভগবানের এমন জ্ঞানপ্রদ উপদেশ নিয়ে ভারতীয় ঋষীদের গবেষণা থেকে আমার নিম্নোক্ত আহরণ।
আত্মা অমর অবিনশ্বর। প্রাক্তন কর্মবেশে আত্মা জড়দেহ ধারণ করে পুনঃ পুনঃ পৃথিবীতে ( সৌরজগতের অন্য গ্রহেও হতে পারে) অবতীর্ণ হয় এবং প্রতি জন্মে সে কিছুটা আত্মোৎকর্ষের সুযোগ লাভ করে। তবে অবশ্য বিধাতার নিয়মেই
ভূলোকে তার ক্রমোন্নতি, ফলে মুক্তিকাঙ্ক্ষী মানব চায় সভ্য থেকে সুসভ্য হয়ে এক দিব্য জীবন লাভ করতে। এমন দিব্য জীবন লাভাকাঙ্ক্ষায় যখন জগন্নাথ, ভাই বলদেব ও বোন সুভদ্রাকে নিয়ে রথে আসীন হয়ে যাত্রাপথে রাজপথে নেমে আসেন, তখনই মুক্তিকামী ভক্তগণ রথের রজ্জু স্পর্শের জন্যে আকুতি নিবদেন করে টেনে নিয়ে চলেন জীবের দেহস্থ রথে আসীন প্রাণরূপ সত্তাকে।
জয় জগন্নাথ! রথযাত্রা উৎসবে জগতের সকলকে জানাই প্রণাম ও অভিনন্দন।
-লেখক : সনাতনী গবেষক ও শারদাঞ্জলি ফোরামের একজন সারথী। তাং-১৫/০৭/২০২৬ খ্রি.।






