প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৬, ২২:৫৬
নামাজ পড়ার সংক্ষিপ্ত নিয়ম
উপমহাদেশে বেশির ভাগ মুসলমান হানাফি মাজহাব অনুসরণ করে থাকে। তাই হানাফি মাজহাব অনুসারে নামাজ পড়ার সংক্ষিপ্ত নিয়ম উল্লেখ করা হল-প্রথমে অজুসহকারে দঁাড়িয়ে যান। নামাজের নিয়ত করে উভয় হাত কান পর্যন্ত উঠান। তাকবিরে তাহরিমা বলার পর বঁা হাতের ওপর ডান হাত রেখে নাভির নিচে রাখুন। এরপর অনুচ্চৈঃস্বরে বলুন, উচ্চারণ : ‘সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়াবি হামদিকা ওয়া তাবারা কাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।’
অর্থ : হে আল্লাহ! আমরা তোমারই পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করছি, তোমার নামই বরকতপূর্ণ এবং তোমার গৌরবই সর্বোচ্চ, তুমি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। (নাসায়ি, হাদিস : ৮৮৯)। এরপর অনুচ্চৈঃস্বরে আউজুবিল্লাহ (আউজু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজিম), তারপর বিসমিল্লাহ (বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম) পড়ুন। (তাহাবি : ১/৩৪৭)।
এবার সুরা ফাতিহা পড়ুন। শেষ হলে অনুচ্চৈঃস্বরে আমিন বলুন। হানাফি মাজহাব মতে, আমিন আস্তে পড়া উত্তম। তবে জোরে আমিন বলার ব্যাপারে ইমামদের মতামত পাওয়া যায়। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক অনাকাঙ্ক্ষিত।
সুরা ফাতিহা শেষ হলে একটি সুরা অথবা তিনটি ছোট আয়াত, যা কমপক্ষে লম্বা একটি আয়াতের সমতুল্য হয় পড়ুন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৬৯৫) এই পরিমাণ তিলাওয়াত নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য আবশ্যক। তবে নামাজে কোরআন তিলাওয়াতের সুন্নত পরিমাণের বিবরণও ফিকহের কিতাবে উল্লেখ রয়েছে। অতঃপর আল্লাহু আকবার বলে রুকুতে যান। রুকুতে মাথা নিতম্বের বরাবর করুন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৭২৯)।
রুকুতে আঙুলগুলো ছড়িয়ে দিয়ে হঁাটু অঁাকড়ে ধরুন। (মুজামে সাগির ২/৪৯৭) রুকুতে কমপক্ষে তিনবার ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম’ পড়ুন। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪২)।
এবার রুকু থেকে ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলে মাথা উঠান। মুক্তাদি হলে অনুচ্চৈঃস্বরে শুধু ‘রাব্বানা লাকাল হামদ’ বলুন। এরপর তাকবির তথা আল্লাহু আকবার বলে সিজদায় যান। (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ৭৪৭)
সিজদায় যাওয়ার সময় প্রথমে হঁাটু, তারপর হাত, তারপর উভয় হাতের মধ্যে কপাল মাটিতে রাখুন। নিজের পেট রান থেকে এবং বাহুকে পার্শ্বদেশ থেকে পৃথক করে রাখুন। হাত ও পায়ের আঙুলকে কিবলামুখী করে রাখুন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৮৫)
সিজদায় কমপক্ষে তিনবার ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আলা’ পড়ুন। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪২) এরপর সিজদা থেকে উঠার সময় সর্বপ্রথম মাথা উঠিয়ে উভয় হাত রানের ওপর রেখে স্থিরতার সঙ্গে বসে পড়ুন। এরপর তাকবির বলে দ্বিতীয় সিজদা করুন। দ্বিতীয় সিজদায়ও কমপক্ষে তিনবার তাসবিহ পড়ুন। বিজোড় সংখ্যায় এর বেশিও পড়া যাবে। অতঃপর জমিনে হাত দ্বারা ঠেক না দিয়ে এবং না বসে সরাসরি তাকবির বলে দঁাড়িয়ে যান। এ পর্যন্ত প্রথম রাকাত সম্পন্ন হলো।
এখন দ্বিতীয় রাকাত আরম্ভ হলো। এতে হাত উঠাবেন না, ছানাও পড়বেন না, আউজুবিল্লাহও পড়বেন না। তবে আগের মতো সুরা ফাতিহা ও সঙ্গে অন্য একটি সুরা পড়ে রুকু-সিজদা করবেন। দ্বিতীয় সিজদা শেষ করে ডান পা খাড়া করে বঁা পা বিছিয়ে দিয়ে তার ওপর বসে যাবেন। তখন আপনার হাত থাকবে রানের ওপর এবং ডান পায়ের আঙুলগুলো থাকবে কিবলামুখী। (মুসলিম, হাদিস : ৯১২) অতঃপর নিম্নের তাশাহহুদ পড়বেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৮৮)
উচ্চারণ : ‘আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত তায়্যিবাত। আসসালামু আলাইকা, আইয়্যু হান্নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। আস সালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহিন। আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহ।’
তাশাহহুদ পড়ার সময় ‘আশহাদু আল-লা ইলাহা’ পড়ার সময় শাহাদাত আঙুল উঁচু করে ইশারা করবেন। আর ‘ইল্লাল্লাহু’ বলার সময় আঙুল নামিয়ে ফেলবেন।
তবে তাশাহহুদের বাক্য ও আঙুল দিয়ে ইশারা করার বিষয়ে অন্য নিয়মও ইমামদের বক্তব্যে দেখা যায়। তাই বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি কাম্য নয়।
যদি দুই রাকাতবিশিষ্ট নামাজ হয়, যেমন-ফজরের নামাজ ইত্যাদি, তাহলে তাশাহহুদের পর নিম্নের দরুদ শরিফ পাঠ করবেন। (মুসলিম, হাদিস : ৬১৩)
উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মদ, ওয়ালা আলি মুহাম্মদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আলি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মদ, ওয়ালা আলি মুহাম্মদ, কামা বারাকতা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আলি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।’ এরপর পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত যেকোনো দোয়া পাঠ করবেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, ১/২৯৮) যেমন-এই দোয়া পড়তে পারেন। এটাকে দোয়ায়ে মাসুরা বলা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৯)
উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি জালামতু নাফসি জুলমান কাসিরাও ওলা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা, ফাগফিরলি মাগফিরাতাম-মিন ইনদিকা, ওয়ার হামনি ইন্নাকা আনতাল গাফুরুর রাহিম।’
অথবা এই দোয়া পড়বেন-[উচ্চারণ : ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনইয়া হাসানাহ, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়া কিনা আজাবান-নার।’
এরপর ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বলতে বলতে ডানে এবং বঁায়ে মাথা ফেরাবেন। সালাম ফেরানোর সময় আপনার পাশের নামাজি ব্যক্তি এবং ফেরেশতাদের কথা স্মরণ করবেন।
যদি নামাজ তিন রাকাতবিশিষ্ট হয়, যেমন মাগরিবের নামাজ, তখন প্রথম বৈঠকে তাশাহহুদের পর আর কিছু পড়বেন না। বরং ‘আল্লাহু আকবার’ বলে সোজা দঁাড়িয়ে যাবেন। (তিরমিজি, হাদিস : ২২৪)।
তবে তৃতীয় রাকাতে শুধু সুরা ফাতিহা পড়বেন। আর নামাজ যদি চার রাকাতবিশিষ্ট হয়, যেমন-জোহর, আসর ও এশার নামাজ, তখন চতুর্থ রাকাতেও শুধু সুরা ফাতিহা পড়বেন। এরপর প্রথম দুই রাকাতের মতো রুকু-সিজদা করে দুই রাকাত সম্পন্ন করে শেষ বৈঠকে বসবেন। সেখানে উল্লিখিত পদ্ধতিতে তাশাহহুদের পর দরুদ এবং এরপর দোয়ায়ে মাসুরা পড়ে উভয় দিকে সালাম ফেরাবেন। সূত্র : কালের কণ্ঠ।
আল্লাহর ইবাদত ও মাতা-পিতার খেদমত
শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
রমজান প্রশিক্ষণের মাস, যার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর হক ও বান্দার হক পূরণ করতে সক্ষম হয়। রমজান মাস ইবাদতের মাস। পিতা–মাতার খেদমত অন্যতম ইবাদত। মেরাজ রজনীতে নামাজ ও রোজা ফরজ হয় এবং মেরাজের চৌদ্দটি সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রথম হলো আল্লাহর সঙ্গে শরিক না করা ও দ্বিতীয় হলো পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা।
পিতা মাতা সম্পর্কে কোরআনের আয়াত : আল্লাহর হক হলো মানুষ একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে এবং আল্লাহর সঙ্গে শরিক করবে না। বান্দার হকের মধ্যে পিতা–মাতার হক সর্বাগ্রে। সন্তানের প্রতি পিতা–মাতার হক বা অধিকার হলো সন্তান পিতা–মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে এবং তাদের কষ্ট দেবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তঁার সঙ্গে শরিক করো না এবং পিতা–মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ৩৬)। ‘আর আমি নির্দেশ দিয়েছি মানুষকে, তার পিতা–মাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার।’ (সুরা-৪৬ আহকাফ, আয়াত: ১৫)। ‘আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি যে তুমি আমার এবং তোমার পিতা–মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে।’ (সুরা-৩১ লুকমান, আয়াত: ১৪)।
পিতা মাতার হক সম্পর্কে হাদিস
একজন সাহাবি নবীজি (সা.)–কে জিজ্ঞেস করলেন, আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার অধিকার সবচেয়ে বেশি কার? নবীজি (সা.) বললেন, তোমার মায়ের। সাহাবি পুনরায় প্রশ্ন করলেন, নবীজি (সা.) বললেন, তোমার মায়ের। সাহাবি আবারও জানতে চাইলেন, নবীজি (সা.) বললেন, তোমার মায়ের। এরপর সাহাবি জানতে চাইলে নবীজি (সা.) বললেন, তোমার বাবার। (বুখারি ও মুসলিম)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পিতা–মাতা হলো তোমার জান্নাত এবং জাহান্নাম অর্থাৎ তুমি ইচ্ছা করলে তাদের খেদমত করে উত্তম আচরণের মাধ্যমে জান্নাত অর্জন করতে পারো; আবার ইচ্ছা করলে তাদের অবাধ্য হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করতে পারো।’ (ইবনে মাজাহ)। পিতা–মাতার অবাধ্যতার জন্য যেমন রয়েছে অভিসম্পাত, তেমনি তঁাদের আনুগত্যের জন্য রয়েছে পুরস্কারের ঘোষণা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘যখন কোনো অনুগত সন্তান স্বীয় পিতা-মাতার প্রতি অনুগ্রহের নজরে দৃষ্টিপাত করে, আল্লাহ তায়ালা তার প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি করে কবুল হজের সওয়াব দান করেন।’ (বায়হাকি)।
এক সাহাবি (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)–কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)! আমার পিতা–মাতা ইন্তেকালের পরেও কি তাদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহারের কোনো কিছু দায়িত্ব অবশিষ্ট আছে?’ তখন নবী করিম (সা.) বললেন, ‘হ্যঁা, আছে। তা হলো তঁাদের জন্য দোয়া করা, তঁাদের গুনাহের জন্য তওবা–ইস্তিগফার করা, তঁাদের শরিয়তসম্মত অসিয়তগুলো আদায় করা, তঁাদের আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তঁাদের বন্ধুবান্ধবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। এগুলো পিতা–মাতার মৃত্যুর পরও তঁাদের সঙ্গে উত্তম আচরণের শামিল।’ (আবু দাউদ)। অন্য হাদিসে আছে, ‘পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি, পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।’ (তিরমিজি)। পিতা–মাতার জন্য দোয়া করতে কোরআনের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা শিখিয়েছেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আপনি তঁাদের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে শৈশবে তঁারা আমাকে প্রতিপালন করেছেন।’ (সুরা-১৭ বনী ইসরাইল, আয়াত: ২৪)।
পিতা মাতার হক ১৪ টি
সন্তানের ওপর পিতা-মাতার প্রতি ১৪টি হক বা দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি তঁাদের জীবদ্দশায় আর সাতটি তঁাদের ইন্তেকালের পর। জীবিত অবস্থায় ৭টি করণীয় কর্তব্য হলো
১. সম্মান ও শ্রদ্ধা করা,
২. ভালোবাসা,
৩. মান্য করা,
৪. সেবাযত্ন করা,
৫. সুখশান্তির চিন্তা ও ব্যবস্থা করা,
৬. প্রয়োজন পূরণ করা ও
৭. দূরে থাকলে দেখা–সাক্ষাৎ করা।
ইন্তেকালের পর ৭টি করণীয় হলো
১. তঁাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনামূলক দোয়া করা,
২. ইবাদতের মাধ্যমে সওয়াব রেসানি করা,
৩. তঁাদের বন্ধুবান্ধব ও নিকট স্বজনদের সম্মান করা,
৪. তঁাদের বন্ধুবান্ধব ও নিকট স্বজনদের সাহায্য–সহযোগিতা করা,
৫. তঁাদের ঋণ থাকলে পরিশোধ করা ও তঁাদের কাছে কারও গচ্ছিত আমানত থাকলে তা প্রত্যর্পণ করা,
৬. বৈধ অসিয়ত পূর্ণ করা ও
৭. কবর জিয়ারত করা।
পিতা-মাতার জন্য করণীয় বিশেষ কিছু আমল: পিতা–মাতার মৃত্যুর পর বা বার্ষিকীগুলোতে প্রচলিত নিয়মে খাওয়া মেজবানির আয়োজন না করে নগদ টাকা গরিব মিসকিনকে দান করা অধিক উপকারী। পিতা-মাতার জন্য ফরজ ও নফল বদলি হজ ও ওমরাহ করা যায় এবং তঁাদের পক্ষে কোরবানিও করা যায়।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী : বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির যুগ্ম মহাসচিব ও আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজমের সহকারী অধ্যাপক
পিতা-মাতার জন্য করণীয় বিশেষ কিছু আমল: পিতা-মাতার মৃত্যুর পর বা বার্ষিকীগুলোতে প্রচলিত নিয়মে খাওয়া মেজবানির আয়োজন না করে নগদ টাকা গরিব-মিসকিনকে দান করা অধিক উপকারী। পিতা–মাতার জন্য ফরজ ও নফল বদলি হজ ও ওমরাহ করা যায় এবং তঁাদের পক্ষে কোরবানিও করা যায়। সূত্র : প্রথম আলো।
মানবজাতির প্রতি কোরআনের উপদেশ
১। সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ করা যাবে না : ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত কোরো না। এবং জেনেশুনে সত্য গোপন কোরো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৪২)
২। সৎ কাজ নিজে করে অন্যকে করতে বলো : ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও, আর নিজেদের বিস্মৃত হওৃ?’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৪৪)
৩। বিবাদে লিপ্ত হয়ো না : ইরশাদ হয়েছে, দুষ্কৃতকারীরূপে পৃথিবীতে নৈরাজ্য সৃষ্টি কোরো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৬০)
৪। কারো মসজিদে যাওয়ার পথে বাধা দিয়ো না : ইরশাদ হয়েছে, ‘তার চেয়ে বড় জালিম আর কে, যে আল্লাহর (ঘর) মসজিদে তঁার নাম স্মরণ করতে বাধা দেয় এবং এর বিনাশসাধনে প্রয়াসী হয়ৃ?’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১১৪)
৫। কারো অন্ধ অনুসরণ করা যাবে না : ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তা তোমরা অনুসরণ করো; তারা বলে, না, বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের যাতে পেয়েছি, তার অনুসরণ করবৃ।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৭০)। সূত্র : ডিএমপি নিউজ (চলবে)
মাজার জিয়ারত— বস্তুত রূহের সাথে রূহের মোলাকাত
---------কাজী শামছুদ্দিন--------
মৃত্যুর কথা স্মরণ করা এবং কবর জিয়ারত মানুষকে আখিরাতের কথা ও জীবনের অনিবার্য পরিণতির কথা মনে করিয়ে দেয়। এতে হৃদয় নরম হয়, চোখ অশ্রুসিক্ত হয় এবং মানুষ নেক আমলের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমদিকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলেন। কারণ, তখন মানুষ সদ্য জাহিলিয়াত থেকে বেরিয়ে এসেছিল। পরে যখন ঈমান মজবুত হলো এবং সঠিক আকীদা ও বুঝ তৈরি হলো, তখন তিনি অনুমতি দিয়ে বলেন, “আমি তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা কবর জিয়ারত করো”।
কারণ, কবর জিয়ারত অন্তরকে নরম করে, আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং দুনিয়ার মোহ-মায়া কমিয়ে দেয়।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা ধীরে ধীরে অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ছি। দেখা যায়, পরিবারের কোনো আপনজন মারা গেলে আমরা তঁার কবরের পাশে যাই, কান্না করি, দোয়া করি, সালাম দেই, কবরের দিকে তাকিয়ে থাকি, কুরআন তিলাওয়াত করি কিংবা দরুদ শরীফ পাঠ করি। কারণ তারা আমাদের আপনজন। আর এটাকে আমরা একজন মুমিনের স্বাভাবিক দায়িত্ব বলেই মনে করি।
কিন্তু কোথাও যেন আমরা আমাদের সবচেয়ে আপন মানুষগুলোকেই দৃষ্টির আড়ালে রেখে দিচ্ছি—হয় অবহেলায়, নয়তো সমাজের কিছু সংকীর্ণ ফতোয়াবাজির কারণে। অথচ তারাই তো আমাদের দ্বীন ও দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নেয়ামতের মাধ্যম।
বলুন তো—
হাবীবে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর চেয়েও কি কেউ আপন হতে পারে?
আহলে বাইত আলাইহিমুস সালামের চেয়েও?
সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বি: এর চেয়েও?
আওলিয়ায়ে কেরামের চেয়েও?
না, তঁাদের মতো আপন আর কেউ নেই।
তাই আসুন, আমরা নতুন করে জিয়ারতের এক সুন্দর সংস্কৃতি গড়ে তুলি। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর শেখানো পদ্ধতিতে জীবিত রূহগুলোর সাথে মৃত রূহগুলোর সম্পর্ককে সজীব ও পবিত্র করি।
ইমাম জাহিদ আল-কাওসারী হানাফী রহ. অত্যন্ত চমৎকার বলেছেন—
“কবর জিয়ারত মানে শুধু ইট-পাথর বা দেয়ালের সামনে দঁাড়িয়ে থাকা নয় বরং এটি রূহের সাথে রূহের মোলাকাত”।
কবর, মাক্ববারা কিংবা মাজার শব্দগত কিছু পার্থক্য থাকলেও মূলত এগুলো একই বিষয়ের দিকেই ইঙ্গিত করে। তাই শুধু নাম বা ট্যাগ নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে নেয়ামত থেকে মাহরুম হবেন না। হ্যঁা, কোথাও যদি শরীয়তবিরোধী কাজ হয়ে থাকে, ভন্ডামি হয়ে থাকে, তার বিরুদ্ধে অবশ্যই সোচ্চার হতে হবে। একইসাথে যারা সহীহ হাদীস ও সুন্নাহসম্মত জিয়ারতকে বিদআত বা শিরক বলে মানুষকে মাহরুম রাখে, তাদের বিভ্রান্তির বিরুদ্ধেও সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
কবর/মাজার জিয়ারত পারিবারিক শিক্ষার একটি অংশ হয়ে উঠুক—যেখানে থাকবে আখিরাতের স্মরণ, দোয়া, ইবরত ও আত্মশুদ্ধি।
মনে রাখা উচিত, কেউ যদি কবর জিয়ারতকে অস্বীকার করে বা মানুষকে তা থেকে নিরুৎসাহিত করে, তবে সে মূলত রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর সহীহ হাদীস ও সুন্নাহকেই অস্বীকার করলো।
সম্প্রতি ঢাকায় মিরপুরে হযরত শাহ আলী বাগদাদী রাদ্বি: এর মাজারে হামলা একটি ন্যাক্কারজনক কাজ এবং চরম উগ্রতার বহিঃপ্রকাশ। ইসলামে উগ্রতা একটি গর্হিত ও অপরাধ মূলক কাজ। যার মাধ্যমে মানুষ ব্যক্তি,পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অপরাধ প্রবণ হয়ে ওঠে। দিনশেষে রাষ্ট্রকে এর চরম পরিণতি ভোগ করতে হয়। তাই আমাদের চিন্তা-চেতনা, আচরণ ও কর্মে উগ্রতা পরিহার করা অপরিহার্য।যা একমাত্র তাসাউফ তথা সূফিবাদ চর্চায় সম্ভব বলে মনে করি। তাই আশা রাখি, আমাদের মাজারগুলো হয়ে উঠুক জ্ঞান চর্চার কেন্দ্রবিন্দু এবং উগ্রতার বিরুদ্ধে শক্ত হাতিয়ার।
কবর জিয়ারত — মৃতদের জন্য দোয়া, আর জীবিতদের জন্য শিক্ষা ও উপদেশ।
শিক্ষার্থী : আল-আযহার ইউনিভার্সিটি, মিশর।








