প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬, ০০:৪১
বিশ্ব খাল’ পুনঃখনন : প্রধানমন্ত্রীর উপহারে প্রাণ ফিরে পেলো মৃতপ্রায় জলধারা
স্বচ্ছ পানির ছোঁয়ায় স্বস্তির বর্ষা, তিন ইউনিয়নে কৃষি ও পরিবেশের নতুন দিগন্ত

দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত পলি আর অবহেলার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে প্রাণ ফিরে পেয়েছে চাঁদপুর সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘বিশ্ব খাল’। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখ লাঘব করতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, এমপি গত ১৬ মে ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে এই খালের পুনঃখনন কাজ শুভ উদ্বোধন করেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়য়ের অধীনে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের প্রত্যক্ষ বাস্তবায়নে এই মেগা প্রকল্পটি সম্পন্ন হচ্ছে। উদ্বোধনের পর চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই খালজুড়ে এখন থৈ থৈ করছে স্বচ্ছ ও টলমলে নতুন পানি। প্রধানমন্ত্রীর সময়োপযোগী উদ্যোগে খালের রূপ পরিবর্তনে স্থানীয় জনপদে বইছে আনন্দের জোয়ার।
|আরো খবর
দীর্ঘ খরা আর পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া মৃতপ্রায় খালটি এখন যেন এক জীবন্ত জলধারা। তপ্ত দুপুরে স্থানীয় শিশুদের জলকেলিতে মেতে ওঠা এবং খালের পানিতে সাঁতার কাটার দৃশ্য গ্রামীণ সৌন্দর্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে ভিড় জমাচ্ছেন।
প্রকল্পের ভৌগোলিক ও কারিগরি রূপরেখা
তথ্যবোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এই পুনঃখনন প্রকল্পটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে, যা চাঁদপুর সদর উপজেলার আশিকাটি ও শাহমাহমুদপুর ইউনিয়ন এবং মতলব (দক্ষিণ) উপজেলার উপাদী দক্ষিণ ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
উৎসমুখ ও মোহনা
খালটির উৎপত্তিস্থল বা উৎসমুখ হচ্ছে মতলব (দক্ষিণ) উপজেলার ‘জমজম খাল’ এবং এর আউটফল বা মোহনা গিয়ে মিশেছে ঐতিহ্যবাহী ‘ডাকাতিয়া নদী’র সাথে।
দৈর্ঘ্য ও খনন সীমা
ডাকাতিয়া নদী হতে ঘোষেরহাট বাজার হয়ে মতলব দক্ষিণ সীমানা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার (মতান্তরে পুরো অববাহিকাসহ ১১ কি.মি.) এলাকা জুড়ে এই পুনঃখনন কাজ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রুট ম্যাপের অন্তর্ভুক্ত এলাকা
সরেজমিনে দেখা যায়, খালের রুট ম্যাপ অনুযায়ী, দারুসসালাম জামে মসজিদ, সেনগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গাজী বাড়ি জামে মসজিদ এবং ঘোষেরহাট বাজার সংলগ্ন এলাকাগুলোর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এই খালের নতুন পানি বহমান হতে শুরু করেছে।
এই খালটি পুনঃখননের ফলে আশেপাশের প্রায় ১ হাজার ১০০ একর ফসলি জমি প্রত্যক্ষভাবে আধুনিক সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। দীর্ঘকাল ধরে পলি জমে ভরাট থাকার কারণে বর্ষায় এখানে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দেখা দিতো। খালটি সচল হওয়ায় এখন এই অঞ্চলের ৪ হাজার ৫০ জন কৃষক সরাসরি উপকৃত হচ্ছে এবং আরো হবে। খালের দুপাড় সুবিন্যস্ত করার ফলে এলাকার নান্দনিক সৌন্দর্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই খালটি পুনঃখনন বিষয়ে চাঁদপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদ হাসান খান মুঠোফোনে জানান, "মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই খালটি পুনঃখননের উদ্বোধনের পর থেকে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি এবং এই কাজটি বর্তমানে পুরোদমে চলমান আছে। আমরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সম্পূর্ণ ১০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন সম্পন্ন করবো। গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষির স্বার্থে এই বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদারকি করছি।"
এ প্রসঙ্গে শাহমাহমুদপুর ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান স্বপন মাহমুদ জানান, "খালের কাজ ডাকাতিয়ার উৎপত্তিস্থল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত অত্যন্ত সফলভাবে ২ কিলোমিটার শেষ হয়েছে। নতুন পানি আসাতে খালটিকে দেখতে অসাধারণ লাগছে। নতুন পানির ছোঁয়ায় খালে যেন দীর্ঘ বছর পর প্রাণ ফিরে পেয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এটি দেখতে আসছে।"
তিনি আরও জানান, "প্রতিদিন সকালে এলাকার মুরুব্বিসহ যারা সকালে হাঁটাহাঁটি (প্রাতঃভ্রমণ) করেন, তারা খালটির দুপাশের রাস্তা ব্যবহার করে হাঁটছেন এবং প্রকৃতির নির্মল বাতাস নিচ্ছেন। খালের দু পাশে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণের কাজ আমরা হাতে নিয়েছি এবং দ্রুতই এই কাজটি সম্পন্ন করবো। যখন পুরো কাজটি পূর্ণাঙ্গ শেষ হবে এবং বৃক্ষরোপণ সম্পন্ন হবে, তখন এর সুফল এই এলাকার সাধারণ মানুষসহ সবাই যুগ যুগ ধরে পাবে। আমরা এই ঐতিহাসিক পুনর্গঠনের জন্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।"
ঘোষেরহাট বাজারের ব্যবসায়ীরা ও স্থানীয় বাসিন্দারা অত্যন্ত আনন্দ প্রকাশ করে জানান, "খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে একসময় এটি মশার প্রজননক্ষেত্রে এবং ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী উদ্যোগের ফলে আমাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট ও রোগবালাইয়ের আতঙ্ক দূর হলো। এখন শুধু কৃষিকাজই নয়, এলাকার সামগ্রিক পরিবেশও উন্নত হয়েছে।"
বিশ্ব খালের এই নবজীবন চাঁদপুরের কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এক যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।
ডিসিকে/ এমজেডএইচ








