প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ১৫:৩৮
রক্তমাখা শৈশব: রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের ব্যর্থতার জবানবন্দি!
মৃত্যুপুরীতে শিশুদের আর্তনাদ—সভ্যতার মুখোশ খুলে যাচ্ছে একে একে
মাদ্রাসার বাথরুমে ১০ বছরের শিশুর মরদেহ: নিরাপত্তাহীনতার নগ্ন বাস্তবতায় কাঁপছে দেশ

একটি সভ্য জাতির সবচেয়ে বড় পরিচয় তার অট্টালিকা নয়, অর্থনীতি নয়, রাজনৈতিক শক্তিও নয়—তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, সে তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে। আর সেই জায়গাতেই আজ বাংলাদেশ ভয়ংকরভাবে ব্যর্থ, রক্তাক্ত এবং নৈতিকভাবে দেউলিয়া।
রামিসার কবরের মাটি এখনও শুকায়নি। মায়ের বুকের আর্তনাদ এখনও বাতাসে ভারী হয়ে ঝুলে আছে। ঠিক তখনই রাজধানী ঢাকার একটি মাদ্রাসার বাথরুম থেকে উদ্ধার হলো আরেকটি ১০ বছরের নিষ্পাপ শিশুর নিথর দেহ।
যে বয়সে একটি শিশুর পৃথিবী হওয়ার কথা ছিল বইয়ের ব্যাগ, রঙিন স্বপ্ন, বিকেলের খেলা আর মায়ের আঁচল—সেই বয়সেই তাকে পৃথিবী ছাড়তে হলো আতঙ্ক, নির্যাতন আর পৈশাচিকতার মধ্য দিয়ে। মৃত্যুর আগে তাকে বিকৃত কামনার শিকার হতে হয়েছে—এই তথ্য শুধু একটি অপরাধের বিবরণ নয়; এটি পুরো জাতির মুখে ছুড়ে মারা এক চপেটাঘাত।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা আসলে কোথায় বাস করছি? এটি কি মানুষের সমাজ, নাকি এমন এক অন্ধকার সমাজব্যবস্থা, যেখানে সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা যাদের, তারাই সবচেয়ে বেশি শিকার?
সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য হলো—এখন আর শিশুদের জন্য কোনো জায়গাই নিরাপদ নয়। রাস্তা নয়, বাসা নয়, বিদ্যালয় নয়, এমনকি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও নয়। যে মাদ্রাসাকে অভিভাবকেরা বিশ্বাসের শেষ আশ্রয় মনে করেন, সেই জায়গাই যদি শিশুর জন্য মৃত্যুকূপ হয়ে ওঠে—তাহলে সমাজ হিসেবে আমাদের অস্তিত্বের নৈতিক ভিত্তিই ধসে পড়েছে।
আমরা এমন এক সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে মানুষরূপী শিকারিরা শিশুদের নিষ্পাপতাকে সবচেয়ে সহজ শিকার হিসেবে বেছে নিচ্ছে। আর রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই সেই অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বদলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজেদের মুখ রক্ষা করতে।
একটি শিশুর মরদেহ পড়ে থাকে। আর বড়রা বসে “সম্মান রক্ষার” হিসাব কষে। কী ভয়ংকর এই সমাজ!
এখানে শিশুর কান্নার চেয়ে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বড়। এখানে ধর্ষণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিচয়। এখানে বিচার অপেক্ষা ধামাচাপা দ্রুত হয়।
আমরা ধীরে ধীরে এমন এক জাতিতে পরিণত হচ্ছি, যারা লাশ দেখে কাঁদে, কিন্তু বদলায় না। প্রতিবার একই নাটক—শোক, প্রতিবাদ, মানববন্ধন, ফেসবুক পোস্ট, তদন্ত কমিটি… তারপর নীরবতা। অপরাধী আবার সমাজে মিশে যায়। আরেকটি শিশু আবার শিকার হয়।
এই নীরবতা কেবল কাপুরুষতা নয়; এটি অপরাধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ।
কারণ মনে রাখতে হবে—ধর্ষক জন্ম নেয় না, তাকে তৈরি করে বিচারহীনতা। খুনি সাহস পায় না, তাকে সাহস দেয় রাষ্ট্রের দুর্বলতা। আর পৈশাচিকতা টিকে থাকে তখনই, যখন সমাজ সত্যের চেয়ে “ইমেজ” রক্ষাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়িত্বশীল মানুষের সামনে আজ কঠিন প্রশ্ন— রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা
কেন এখনও প্রতিটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক সিসিটিভি নেই? কেন শিশু সুরক্ষা মনিটরিং টিম কার্যকর নয়? কেন অভিযোগ উঠলেই দ্রুত তদন্ত হয় না? কেন বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে? কেন প্রভাবশালীরা এখনও অপরাধ আড়াল করার সাহস পায়?
এই ব্যর্থতার দায় কেউ এড়াতে পারে না—না প্রশাসন, না প্রতিষ্ঠান, না সমাজ, না আমরা।
সবচেয়ে নির্মম বিষয় হলো—এই শিশুদের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না, কিন্তু আমাদের প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে।
আমরা আর কাঁপি না। আমরা আর জেগে উঠি না। আমরা শুধু কয়েকদিন আবেগ দেখাই, তারপর পরবর্তী লাশের অপেক্ষায় বসে থাকি।
একটি মৃত জাতির লক্ষণ এর চেয়ে ভয়ংকর আর কী হতে পারে?
আজ প্রয়োজন কেবল শোক নয়, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিদ্রোহ। প্রয়োজন শিশু নির্যাতনের প্রতিটি মামলার দ্রুত বিচার। প্রয়োজন প্রতিটি আবাসিক প্রতিষ্ঠানকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা। প্রয়োজন অপরাধ গোপনের সংস্কৃতির মূলোৎপাটন।
“চুপ থাকা বন্ধ করুন। কারণ আপনার প্রতিটি নীরবতা কোনো না কোনো অপরাধীর জন্য নতুন সাহস, নতুন ঢাল এবং নতুন সুযোগ তৈরি করে—আর সেই সুযোগের মূল্য দিতে হয় একটি নিষ্পাপ শিশুর রক্ত দিয়ে।”
শিশুদের বাঁচানো কোনো আন্দোলন নয়, এটি মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার শেষ পরীক্ষা।
আজ রামিসা নেই। ঢাকার সেই শিশুটিও নেই। কিন্তু তাদের ছোট্ট কবরের নিচে শুয়ে আছে আমাদের মানবতা, আমাদের নৈতিকতা, আমাদের সভ্যতার শেষ আলো।
ইতিহাস একদিন লিখবে— “এমন এক সময় ছিল, যখন শিশুদের চিৎকারের চেয়েও সমাজের নীরবতা ছিল বেশি ভয়ংকর।”




