শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   ১৬-২৫ মার্চ নদীতে বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ থাকবে : নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়

প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৪৭

১৬টি মসজিদে হাদিয়া ছাড়া খতম তারাবীহ !

সোহাঈদ খান জিয়া
১৬টি মসজিদে হাদিয়া ছাড়া খতম তারাবীহ !
ছবি :মমিনপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসা ভবন ও নিচে মসজিদ।

কোন মসজিদে কতো বেশি হাদিয়া দেয়ার চুক্তিতে হাফেজ নিয়োগ করে খতম তারাবীহ পড়ানো হচ্ছে--এটা প্রতিবছর রমজানের প্রাক্কালে কিংবা রমজান চলাকালে প্রতিটি এলাকার বিভিন্ন মসজিদের মুসল্লিদের মধ্যে সাধারণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকে। অথচ এমন বাস্তবতায় জানা গেলো ব্যতিক্রম বিষয়। আর সেটি হচ্ছে, চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগাদী ইউনিয়নের মমিনপুর (রামচন্দ্রপুর), চাঁদপুর ও পশ্চিম সকদী গ্রামের ১৬টি মসজিদে হাফেজগণ কোনোরূপ হাদিয়া না নিয়ে খতম তারাবীহ পড়াচ্ছেন।

ঐতিহ্যবাহী মমিনপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসার হাফেজ হওয়া শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে এ ব্যতিক্রম কাজটি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ করিয়ে থাকেন। এতে হাফেজ হিসেবে একজন শিক্ষার্থীর বাস্তবসম্মত অনুশীলন বা ট্রায়াল হয়ে থাকে। পরবর্তী বছরে এ হাফেজগণ মাদ্রাসা ত্যাগ সাপেক্ষে অন্যান্য মসজিদে হাদিয়া কিংবা হাদিয়া ছাড়া খতম তারাবীহ পড়ানোর সুযোগ নিয়ে থাকেন।

১৯৬৪ সালে মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠার পর হাদিয়া ছাড়াই এ মাদ্রাসা থেকে হিফজ সম্পন্ন করা হাফেজগণ খতম তারাবীহের নামাজ পড়িয়ে আসছেন। ডাকাতিয়া নদীর তীরে প্রত্যন্ত এলাকায় মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হলেও সারাদেশ ও বিশ্ব জুড়ে খ্যাতি রয়েছে এই মাদ্রাসাটির ।

চাঁদপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরত্বে মাদ্রাসাটির অবস্থান। সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারী চালিত অটোবাইক অথবা রিকশা দিয়ে সহজে যাওয়া যায় মমিনপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসায়। অনেক সময় লাগে বলে চাঁদপুর শহর থেকে ডাকাতিয়া নদীতে নৌকা বা নৌযানে চড়ে এ মাদ্রাসায় কেউ যেতে চায় না। তবে শাহতলী বাজার থেকে নদী পথে ইঞ্জিন চালিত টেম্পু করে মমিনপুর খেয়াঘাটে নেমেও এ মাদ্রাসায় যাওয়া যায় । সিআইপি বেড়িবাঁধ সড়কের চাঁদপুর-চান্দ্রা-মুন্সীরহাট রুটে সাহেব বাজার রাস্তার মাথা থেকে উত্তর দিকে মাদ্রাসাটির অবস্থান । ডাকাতিয়া নদীর তীরে চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে উঠা এই মাদ্রাসাটি দেখতে খুবই মনোমুগ্ধকর।

মমিনপুর গ্রামে প্রবেশের রাস্তার পূর্ব পাশে দক্ষিণ দিকে নাজরানা বিভাগ। মসজিদের উত্তর পাশে কিতাব বিভাগের অবস্থান। রাস্তার পশ্চিম পাশে হেফজ বিভাগ ও অফিস কক্ষের অবস্থান। মাদ্রাসা সংলগ্ন পূর্বের মসজিদ ভেঙ্গে খুবই সুন্দর নকশার অত্যাধুনিক দ্বিতল ভবনের মসিজদ নির্মাণ করা হয়েছে । এ মসজিদটিতে ৫০০ থেকে ৬০০ মুসল্লি এক সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। এ মসজিদে দুটি ঈদের নামাজ আদায় করা হয়।

মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা কেফায়েত উল্লাহ বলেন, জেলা সদরসহ বিভিন্ন মসজিদে তারাবীহ নামাজ পড়ানো হাফেজদের হাদিয়া দেয়া হলেও মুমিনপুর মাদ্রাসার পক্ষ থেকে করা হচ্ছে ব্যতিক্রম। এই মাদ্রাসা সংলগ্ন মসজিদে কখনোই হাদিয়া দেয়া ও নেয়ার প্রচলন ছিলো না এবং এখনও নেই। মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম হাফেজ মাওলানা মুহসিন (র.) এই ধারা অব্যাহত রেখে গেছেন।

এ বছর মাদ্রাসা মসজিদে খতমে তারাবীহ পড়ান হাফেজ মো. মাহমুদ ও হাফেজ ওবায়দা। হাফেজ মাহমুদ বলেন, আমি বিগত দু বছর এই মসজিদে খতম তারাবীহ পড়াচ্ছি। আমি কখনো বিনিময়ে হাদিয়া নেইনি। এভাবে নামাজ পড়িয়ে আমি খুবই আনন্দিত। হাফেজ ওবায়দা বলেন, কোনো বিনিময় ছাড়া আমি এর আগে অন্য মসজিদে তারাবীহ পড়িয়েছি। বিগত ৩ বছর ধরে মাদ্রাসা মসজিদে তারাবীহ পড়াচ্ছি। আমার কাছে খুবই ভালো লাগে।

মুসল্লিরা জানান, দ্বিতল মসজিদের নকশা খুবই সুন্দর। গ্রামের বহু মানুষ এই মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত এবং জুমআর নামাজ আদায় করেন। জুমার নামাজ পড়ার জন্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে মুসল্লিরা চলে আসেন।এমনকি দুই ঈদের নামাজ আদায় করার জন্যেও বিভিন্ন স্থান থেকে মুসল্লিরা চলে আসেন মাদ্রাসা মসজিদে। নিচতলা ও দ্বিতীয় তলায় সমান সংখ্যক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। খোলামেলা পরিবেশ হওয়ার কারণে মসজিদের ভেতরে হিমশীতল অবস্থা বিরাজ করে।

১৯৮৮সালে এই মাদ্রাসা থেকে হিফজ সম্পন্ন করা হাফেজ আব্দুল বারেক বলেন, মমিনপুর মাদ্রাসার ঐতিহ্য দেশজুড়ে। এখানকার হাফেজদের তারাবীহ পড়ানোর জন্যে কোনো ইন্টারভিউ দিতে হয় না। এখান থেকে একজন শিক্ষার্থী শুধুমাত্র হিফজ সম্পন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার অনন্য উদাহরণ এই কুরআন শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। দেশ-বিদেশে নানা পেশায় জড়িত রয়েছে এবং দক্ষতার সাথে নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছে মাদ্রাসার হাজার হাজার শিক্ষার্থী।

মমিনপুর মাদ্রাসার মুহতামিম হাফেজ রাশেদ বলেন, প্রতি বছর এই মাদ্রাসা থেকে যেসব শিক্ষার্থী হিফজ সম্পন্ন করেন তারাই মুমিনপুর গ্রামসহ আশপাশের সব মসজিদে খতমে তারাবীহ পড়ান। একেক মসজিদে দু থেকে ৪জন হাফেজ নিয়োগ করা হয়। এ বছরও নিয়োগ করা হয়েছে। মূলত এখানে যারা হিফজ সম্পন্ন করেন তারাই এসব মসজিদে তারাবীহ পড়িয়ে তাদের যাত্রা শুরু হয়। এই কাজটি সম্পন্ন করতে পেরে তারাবীহ শেষে মুসল্লিদের মিষ্টি খাওয়ানোর মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব শেষ করে। মাদ্রাসা মসজিদে প্রায় ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে বিনা হাদিয়ায় খতমে তারাবীহ পড়িয়েছেন আমার চাচা হাফেজ ফজলুর রহমান। উনার ইন্তেকালের পর শিক্ষার্থীরাই সেই ধারা অব্যাহত রেখেছে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়