বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪৬

রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত

মুফতি মুহা.আবু বকর বিন ফারুক
রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত

রমজান মাস আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য এক মহামূল্যবান উপহার। এটি রহমত, মাগফিরাত, নাজাত এবং আত্মশুদ্ধির মাস। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলো সিয়াম বা রোজা, যা এই মাসেই ফরজ করা হয়েছে। রমজান কেবল একটি সময়কাল নয়; এটি একটি আধ্যাত্মিক বিপ্লবের নাম। একজন মুমিনের জীবনে ঈমানি শক্তি বৃদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার শ্রেষ্ঠ সুযোগ হলো রমজান।

রমজান এমন একটি মাস, যা দুনিয়ার জীবনের ব্যস্ততার মাঝে মানুষকে থামিয়ে দেয়, তাকে আত্মসমালোচনা শেখায় এবং আখিরাতের প্রস্তুতির দিকে ফিরিয়ে আনে।

কুরআনের আলোকে রমজানের মর্যাদা: ১. রমজান মাসে কুরআন নাযিল আল্লাহ তাআলা বলেন : “রমজান মাস, যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াত, সৎপথের স্পষ্ট প্রমাণ এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫।

এই আয়াত রমজানের সর্বোচ্চ মর্যাদার কারণ স্পষ্ট করে। এই মাসে নাযিল হয়েছে আল-কুরআন। কুরআন হলো মানবজাতির জন্য দিশারী, আলোর উৎস এবং নাজাতের পথপ্রদর্শক। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন : “আমি তা অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে।” সূরা আদ-দুখান ৪৪:৩। মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এই বরকতময় রাত হলো লাইলাতুল কদর, যা রমজান মাসে।

২. তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণ: আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩।

রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া। তাকওয়া মানে আল্লাহভীতি, আত্মসংযম এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকা। রোজা মানুষকে শেখায় কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন। ক্ষুধা ও পিপাসা সহ্য করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করাই হলো তাকওয়ার অনুশীলন।

হাদিসের আলোকে রমজানের ফজিলত

১. জান্নাতের দরজা খোলা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: “যখন রমজান আসে, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।” সহিহ বুখারি ও মুসলিম।

এটি রমজানের বিশেষ রহমতের প্রমাণ। এই মাসে নেক আমলের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

২. গুনাহ মাফের সুবর্ণ সুযোগ। রাসূল (সা:) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” -সহিহ বুখারি।

আরেক হাদিসে এসেছে: “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম (তারাবি) করে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করা হয়।”সহিহ বুখারি। এ দুটি হাদিস প্রমাণ করে। রমজান হলো গুনাহমুক্ত হওয়ার মাস।

লাইলাতুল কদরের মহিমা: আল্লাহ তায়ালা বলেন, “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।” সূরা আল-কদর ৯৭:৩। হাজার মাস মানে প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস। অর্থাৎ এই এক রাতের ইবাদত দীর্ঘ জীবনের ইবাদতের চেয়েও উত্তম।

রাসূল (সা:) বলেছেন, “তোমরা লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে।” (সহিহ বুখারি)

এই রাত হলো ক্ষমা, রহমত ও কবুলিয়াতের রাত।

রোজা: ঢাল ও বিশেষ প্রতিদান: রাসূল (সা:) বলেছেন, “রোজা হলো ঢাল।” (সহিহ বুখারি)। অন্য হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন: “রোজা আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব।” (সহিহ বুখারি)

এর অর্থ রোজার সওয়াব সীমাহীন। অন্য আমলের সওয়াব নির্ধারিত হলেও রোজার প্রতিদান আল্লাহ নিজ হাতে প্রদান করবেন।

রাইয়ান দরজা : রাসূল (সা:) বলেছেন, “জান্নাতে ‘রাইয়ান’ নামে একটি দরজা আছে। কিয়ামতের দিন রোজাদাররা সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে।” (সহিহ বুখারি) এটি রোজাদারের বিশেষ সম্মান।

রমজান : দান-সদকার মাস : রাসূল (সা.) ছিলেন সবচেয়ে দানশীল ব্যক্তি, আর রমজানে তাঁর দানশীলতা আরও বৃদ্ধি পেত।

(-সহিহ বুখারি)।

রমজানে দান-সদকা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। ফিতরা, যাকাত, ইফতার করানো এসব আমল সমাজে সাম্য ও সহমর্মিতা সৃষ্টি করে। রাসূল (সা:) বলেছেন : “যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।” তিরমিজি

ইতেকাফের গুরুত্ব : রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করা সুন্নত। রাসূল (সা:) প্রতি বছর ইতেকাফ করতেন। (-সহিহ বুখারি)

ইতেকাফ মানুষকে দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে দূরে রেখে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে।

রমজান: চরিত্র গঠনের মাস: রাসূল (সা:) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও খারাপ কাজ ত্যাগ করে না, তার শুধু পানাহার ত্যাগ করার আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।”(-সহিহ বুখারি)

এই হাদিস স্পষ্ট করে রোজা শুধু না খাওয়া নয়; এটি চরিত্র সংশোধনের প্রশিক্ষণ।

রমজান মানুষকে শেখায়: ধৈর্য, সংযম, সততা, সহনশীলতা, আল্লাহভীতি।

দোয়া কবুলের বিশেষ সময়: রাসূল (সা:) বলেছেন: “রোজাদারের ইফতারের সময়ের দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না।”-তিরমিজি

রমজান দোয়া কবুলের মাস। এ সময় বেশি বেশি তাওবা ও দোয়া করা উচিত।

সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব : রমজান সমাজকে পরিবর্তন করে, মসজিদে মুসল্লির ভিড় বাড়ে, কুরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি পায়, দান-সদকা বাড়ে, অপরাধ কমে যায়, রমজান মানুষকে আল্লাহমুখী করে এবং সমাজে নৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে।

আত্মশুদ্ধি ও আখিরাতের প্রস্তুতি রমজান আমাদের শেখায়: সময়ের মূল্য, নেক আমলের গুরুত্ব, পাপ থেকে বাঁচা, আল্লাহর ওপর ভরসা, এই মাস মানুষকে আখিরাতমুখী করে। মৃত্যুর কথা স্মরণ করায়।

পরিশেষে বলব, রমজান মাস আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অনন্য নেয়ামত। এটি আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, গুনাহমুক্তি ও জান্নাত লাভের সুবর্ণ সুযোগ। যে ব্যক্তি এই মাসকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে, তার জীবন বদলে যায়। রমজান আমাদের শেখায় আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, আত্মসংযম, মানবতার সেবা, দুনিয়া নয়, আখিরাতমুখী জীবন, আসুন আমরা রমজানকে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত অর্থে ইবাদত, তওবা ও আত্মসংস্কারের মাস হিসেবে গ্রহণ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রমজানের প্রকৃত ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করুন এবং এই মাসকে আমাদের জন্য নাজাতের মাধ্যম বানিয়ে দিন। আমিন।

লেখক: খতিব, বিষ্ণুপুর মদিনা বাজার বাইতুল আমিন জামে মসজিদ, প্রধান শিক্ষক ও পরিচালক : দারুসসুন্নাত বিসমিল্লাহ মডেল মাদরাসা, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়