প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:০০
অপরাজেয় কথাশিল্পীর ৮৮তম প্রয়াণ দিবস: একুশ শতকের সংকটে শরৎ-দর্শন
ব্যথার বাঁশিওয়ালা!
যাঁর কলমে নারী খুঁজে পায় তার আত্মমর্যাদার আকাশ!

আজ ১৬ জানুয়ারি। শীতের এই বিষণ্ণ গোধূলিতে বাংলা সাহিত্য তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারিগরকে হারানোর ৮৮ বছর পূর্ণ করল। ১৯৩৮ সালের এই দিনে ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন অপরাজেয় কথাশিল্পী। তবে তিনি কি সত্যিই চলে গেছেন? না; বরং বর্তমানের এই যান্ত্রিক ও ডিজিটাল যুগে যখন মানবিক মূল্যবোধের অভাব প্রকট, তখন শরৎচন্দ্র আমাদের হৃদয়ে আরও বেশি জীবন্ত হয়ে ফিরে আসছেন তাঁর কালজয়ী নারী চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে।
|আরো খবর
শরৎচন্দ্র যখন লিখতে শুরু করেন, তৎকালীন বঙ্গীয় সমাজ ছিল রক্ষণশীলতা ও কঠোর পুরুষতন্ত্রের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। সেখানে নারীর বিচ্যুতি মানেই ছিল চিরস্থায়ী লাঞ্ছনা। কিন্তু শরৎচন্দ্রই প্রথম সেই তথাকথিত অবহেলিত নারীদের টেনে এনে সাহিত্যের মূল মঞ্চে বসালেন। তিনি দেখালেন, শরীরের ওপর সমাজের দেওয়া কলঙ্ক কোনো নারীর অন্তরের শুভ্রতাকে মলিন করতে পারে না। তিনি পাঠককে শিখিয়েছেন, মানুষকে ঘৃণা করা সহজ, কিন্তু তার হৃদয়ের গভীরতা চেনা ও সম্মান করাই প্রকৃত মনুষ্যত্ব।
শরৎচন্দ্রের উপন্যাস পড়া মানে কেবল একটি গল্প পাঠ নয়, বরং নিজের ভেতরকার সংকীর্ণতাকে মুছে ফেলার এক মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা। একজন পাঠক যখন তাঁর সৃষ্টির সেই জীবনবোধের গভীরে প্রবেশ করেন, তখন নারীর প্রতি তাঁর সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে যেতে বাধ্য। আমাদের সমাজের গভীরে নারীর প্রতি যে একধরণের সূক্ষ্ম অবজ্ঞা বা অভাববোধ লুকিয়ে থাকে, শরৎচন্দ্রের সাহিত্য তা নিপুণভাবে উপড়ে ফেলে। সেখানে তিনি রোপণ করেন অশেষ শ্রদ্ধার বীজ।
বক্স আইটেম: শরৎচন্দ্রের সাহিত্য পাঠ করলে নারীর প্রতি পুরুষের চিরন্তন যে সংকীর্ণতা থাকে, তা এক নিমিষেই কেটে যায়। তাঁর লেখা আমাদের শেখায় নারীকে কেবল লৈঙ্গিক পরিচয়ে নয়, বরং আত্মিক গভীরতায় দেখতে। একজন পুরুষ যখন শরৎচন্দ্রের সৃষ্টির সেই ‘উল্লাস’কে স্পর্শ করেন, তখন নারীর প্রতি তাঁর মনে আর কোনো অন্ধকার থাকে না—সেখানে জায়গা করে নেয় এক অশেষ শ্রদ্ধাবোধ ও নিঃশর্ত মমত্ব। বর্তমান সমাজে নারীর প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এই দর্শন আজও অদ্বিতীয়।
আজকের দিনেও যখন আমরা নারীর অধিকার নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হই, তখন শরৎচন্দ্রকে নতুন করে পাঠ করা জরুরি। তিনি নারীর ত্যাগের মহিমাকে কেবল পূজা করেননি, বরং নারীর বিদ্রোহী সত্তাকেও সম্মান দিয়েছেন। আধুনিক পুরুষের কাছে তিনি আজও এক বড় শিক্ষক—যিনি শিখিয়েছেন কীভাবে কামনার বদলে সম্মান দিয়ে এবং অবহেলার বদলে মমতা দিয়ে একজন নারীর হৃদয়ে প্রবেশ করতে হয়।
প্রতিবেদনের এই লগ্নে শরৎচন্দ্রের সেই অমোঘ বাণীটি স্মরণ করা যাক: "সংসারে যারা শুধু দিলে, কিছুই পেলে না, যারা বঞ্চিত, যারা দুর্বল, যারা নিপীড়িত, মানুষ যাদের চোখের জলের খবর নিলে না, তাদের বেদনাই দিলে তোমার মুখ ফুটিয়ে।" যতক্ষণ পৃথিবীতে প্রেম থাকবে, বিরহ থাকবে এবং নারীর প্রতি অবিচারের বিরুদ্ধে কেউ কলম ধরবে, ততক্ষণ শরৎচন্দ্র প্রাসঙ্গিক থাকবেন।
লেখক : অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ
ডিসিকে/ এমজেডএইচ








