বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৯

বিগত ৩টি নির্বাচনের তদন্ত রিপোর্ট ও আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ

মইনুদ্দিন লিটন
বিগত ৩টি নির্বাচনের তদন্ত রিপোর্ট ও আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ

বিগত সরকারের আমলে তিন তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফ্যাসিস্ট হাসিনা নিজের এবং আওয়ামী সরকারের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে কঠিন ও ন্যাক্কারজনক ষড়যন্ত্র করেছিলো। কীভাবে এবং কী ধরনের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়রিং করা হয়েছিলো তা জানতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫-এর জুলাই মাসের ২৯ তারিখে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনকে প্রধান করে ও সাবেক সরকারি সচিব শামীম আল মামুন, ঢাকা ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক, ব্যারিস্টার তাজরিয়া আকরাম হোসেন এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আবদুল আলীমকে নিয়ে গঠিত এই তদন্ত কমিশন ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪-এর নির্বাচনে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, কারচুপি ও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে প্রায় তিন শতাধিক পৃষ্ঠার রিপোর্ট তৈরি করেছে।

‘কমিশন অব পাবলিক ইনক্যুয়ারি অ্যাক্ট ১৯৫৬’-এর বিধানে এই তদন্ত কমিশন তদন্ত কাজ সম্পন্ন করেছে। এই কাজে কমিশন ঐ তিনটি নির্বাচনের সাথে সরকারিভাবে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ ও ইনটারভিউ করেছে। এদের মধ্যে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য নির্বাচন কমিশনারগণ, প্রাক্তন চীফ জাস্টিস, রিটার্নিং অফিসার, সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, জেলা পর্যায়ে কর্তব্যরত তৎকালীন পুলিশের এসপি, সামরিক বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা, সে সময়ের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা, এনএস আই, ডিজিএফআই-এর কর্মকর্তা ও সদস্য রয়েছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে এদের অনেকেই বিভিন্ন কারাগারে রয়েছে। ফলে এদের অনেককে ঢাকা সেন্ট্রাল জেল এবং কাশিমপুর কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য জানা গেছে। পাশাপাশি এ বিষযে আরো জানতে ‘পাবলিক ওপিনিয়ন পুল’-এর মাধ্যমে সাধারণের কাছ থেকেও তথ্যাদি সংগ্রহ করা হয়েছে।

এই তদন্ত কমিশনের রিপোর্টের মতে, এটা ছিলো এমন এক মাস্টার প্ল্যান যা কার্যকর করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হত্যা করা হয়। এই রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরেই হাসিনা ও তার সরকারের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে ঐ মাস্টার প্ল্যান হাতে নেয়। কিন্তু এর প্রধান বাধা ছিলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। আর সেজন্যে এই ষড়যন্ত্রের প্রথম ধাপ ছিলো যে কোনোভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করা। এই পর্যায়ে ২০১১ সালে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করা হয়। রিপোর্টে এসেছে, নির্বাচনকে মেনুপুলেট করতে তখন যোগ্য নিরপেক্ষ ও দক্ষ অফিসারদের বাইপাস করে নিজেদের বিশ্বস্ত ও অনুগত সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী দিয়ে পুরো নির্বাচনী সিস্টেমকে সাজানো হয়। এ কাজে এ সকল কর্মকর্তার আর্থিক ও প্রমোশনের অনৈতিক আনুকূল্য দিয়ে মোটিভেট করা হযেছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে। এভাবে সিভিল প্রশাসনের দ্বারা সম্পূর্ণ ইলেক্টোরাল মেকানিজমটা কন্ট্রোলে নেয় তৎকালীন সরকার। জেলার ডিসি ও তার নিচের সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন রিওয়ার্ড দিয়ে পুরো নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কাগজে কলমে ইলেকশন কমিশন খুবই পাওয়ারফুল একটা সাংবিধানিক অর্গানাইজেশন। তবে এই প্ল্যানে আমলাদের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে চালানো হয়। নির্বাচন কমিশনকে বানানো হয় কাঠের পুতুল। যার সুতোর প্রান্তগুলো ধরা ছিলো খোদ শেখ হাসিনার আঙ্গুলের ডগায়। পুরো ইলেকশন কমিশনই সরাসরি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পরিচালিত হতো।

রিপোর্টে আরো বলা হয়, এই তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অর্থাৎ ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪-এর নির্বাচন যদিও ২০০৮-এর একটি মাস্টার প্ল্যানে করা হয়, তবে এই তিনটি নির্বাচন করা হয় তিন রকম ভাবে। ২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং ১৪৭টি আসনে ‘তথাকথিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ করা নির্বাচনটি ছিলো সম্পূর্ণ সাজানো এবং পরিকল্পিত নির্বাচন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এই বন্দোবস্ত করা হয়েছিলো। এই নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হয়। ফলে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সেবার বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল হাসিনা তথা আওয়ামীলীগের পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে ২০১৮-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। তদন্তে জানা গেছে, ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগের রাতে শতকরা ৮০ ভাগ কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালটে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে আওয়ামীলীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তখন আওয়ামীলীগকে বিজয়ী করতে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অসৎ প্রতিযোগিতা ছিলো। ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ পার্সেন্টেরও বেশি হয়ে যায়। ২০২৪ সালে বিএনপিসহ অন্য দলগুলো নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করায় আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে ‘ডামি’ প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে এনে নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলক করার একটা কৌশল গ্রহণ করে হাসিনা সরকার। এটা সর্ব মহলে ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এই তিনটি নির্বাচনের এমন অভিনব পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তে হয়েছে বলে রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সিভিল প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশ রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এই কাজে কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিভিন্ন অফিসে ‘বিশেষ সেল’ গঠন করা হয়, যা ‘নির্বাচনী সেল’ নামে পরিচিত। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সময় কালে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে উঠে নির্বাচনের মূল শক্তি।

এছাড়া হাসিনার আওয়ামী আমলে নির্বাচনে ‘ইভিএম’ পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ নিয়েও হয়েছে এক গভীর ষঢ়যন্ত্র। সেখানে বিপুল অর্থ লোপাটের তথ্য পাওয়া গেছে। সেই সময়ে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার ও তাদের দোসর দলগুলো ছাড়া আর সব দল এই মেশিন পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণের বিষয়ে আপত্তি করেছিলো। এমনকি ‘ইভিএম’ পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরাও সমর্থন দেয়নি। তবুও হাসিনা সরকার এই ‘ইভিএম’ পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ প্রকল্পটা চালু রাখে। কারণ এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে তিন হাজার কোটি টাকা। অথচ মাত্র ৬টি সংসদীয় আসনে ‘ইভিএম’ মেশিন ব্যবহার করা হয়েছে। জানা গেছে, এই ‘ইভিএম’ মেশিনগুলো বেশির ভাগই ছিলো অকার্যকর। এটা পরীক্ষা করতে এই তদন্ত কমিশন নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে ‘ইভিএম’ মেশিন এনে পরীক্ষা করে দেখেছে। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই চালু করা যায় নি। তদন্তে আরো জানা গেছে, এই ‘ইভিএম’ প্রজেক্টটি নির্বাচন কমিশনের কোনো প্রজেক্ট ছিলো না। এটা হাসিনার নিরাপত্তা কর্মকর্তা তারেক সিদ্দিকী সহ আরো কিছু সামরিক কর্মকর্তার সাথে যোগসাজশে নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো। নির্বাচন কমিশন এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও ক্রয়ের টেন্ডার আদেশটি অস্বাভাবিক দ্রুততার সাথে অনুমোদন দেয়। এই কাজের টেন্ডার পাওয়া সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের নাম ‘টাইগার আইটি’। জানা গেছে হাসিনা পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয় এই প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলো। যদিও এখন এই ‘টাইগার আইটি’ প্রতিষ্ঠানটির কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ‘ইভিএম’ মেশিনে ভোট গ্রহণে একটি ভয়াবহ দিক হলো, এই মেশিনে বাতিল ভোটের সংখ্যা কমিয়ে আনা যায়। দেখা গেছে, যেই ছয়টি সংসদীয় আসনে ‘ইভিএম’ পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে, সেই আসনগুলোতে বাতিল ভোটের সংখ্যা ‘শূন্য’। ২০১৮ সালে নির্বাচনের রাতের ভোটে ‘ইভিএম’ দিতে পারে নি। কারণ, এই মেশিনে ফিঙ্গার প্রিন্ট লাগে। ফলে সেবার নির্বাচনে ভোট গ্রহণের শতকরা হার ছিলো ৮০.৮০। কিন্তু ‘ইভিএম’ পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণে শতকরা হার ছিলো ৫০.৫২। তাছাড়া ‘ইভিএম’ মেশিনের দাম বাজারে মাত্র ২০ হাজার টাকা হলেও এই প্রকল্পে প্রতিটি মেশিনের দাম ধরা হয়েছে ২ লক্ষ ৩৪ হাজার টাকা।

এছাড়া এই তিনটি নির্বাচনেই অনেক সহিংসতা হয়েছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নামে হাজার হাজার মামলা দেয়া হয়েছে। গুম-খুন করা হয়েছে। নেতা-কর্মীকে জেলে আটকে রাখা হয়েছে। কোর্টে জামিন দেয়া হতো না। নির্বাচনী প্রচারণায় চরমভাবে বাধা দেয়া হয়েছে। ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। সীমানা পুনঃ নির্ধারণের নামে কোনো বিশেষ প্রার্থীকে বিজয়ী হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়েছে। প্রচুর জাল ভোট দেয়া হয়েছে। ভোট গণনায় কারচুপি করা হয়েছে। ফলে দেশে বিদেশে এই নির্বাচনগুলো নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। বিগত নির্বাচনগুলোর সাথে সরাসরি যুক্ত ও সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াও ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটস্- এর রির্পোট, কমন ওয়েল্থ স্টেটমেন্ট, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশানালের রিপোর্ট, ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশানালের রিপোর্ট, ইউকে পার্লামেন্টের সরকারি ব্রিফিং, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইলেকশন এক্সর্পাট মিশনের রিপোর্টের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্থাগুলোর প্রাপ্ত রিপোর্টে এবং ‘পাবলিক ওপেনিয়ন পুল’-এর ভিত্তিতে হাসিনার আওয়ামী আমলের ঐ তিনটি নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র ও কারচুপির সংবাদ অভিজ্ঞতাগুলোর তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪-এর নির্বাচনী তদন্ত কমিশন তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।

এমন বাস্তবতার বিপরীতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবার দলগুলো নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড’ পাবার প্রত্যাশা নিয়ে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পরে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিগত তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি তরুণ প্রজন্মের বিশাল সংখ্যার ভোটার। সাথে যুক্ত হয়েছে প্রবাসীদের ‘পোস্টাল ব্যালট’ প্রদানের সুযোগ। যদিও এখনো সহিংসতা কাটেনি। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর উদ্বেগের বিষয়টিও উড়িয়ে দিচ্ছে না অনেকেই।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়