বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০২

আধুনিক জীবনে শান্তি ও নৈতিকতার শিক্ষায় কল্পতরু দিবসের সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

প্রফেসর ড. অরুন চন্দ্র পাল
আধুনিক জীবনে শান্তি ও নৈতিকতার শিক্ষায় কল্পতরু দিবসের সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব (১৮৩৬-১৮৮৬) আধুনিক ভারতের এক অনন্য আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ। এই প্রবন্ধে শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কল্পতরু দিবসের অর্থ, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, দার্শনিক তাৎপর্য, শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ভূমিকা, শ্রীমা সারদা দেবীর মাতৃস্বরূপ, স্বামী বিবেকানন্দের ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত এবং সমকালীন সমাজে কল্পতরু দিবসের প্রাসঙ্গিকতা ও সর্বধর্ম সমন্বয়--সবকিছুই বিশদভাবে আলোচিত হবে।

বাংলার ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে কল্পতরু দিবস এক অনন্য ও পবিত্র দিন। প্রতি বছর ১ জানুয়ারি এই দিবসটি শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের স্মৃতিতে ও কৃপাবর্ষণের মহিমায় উদযাপিত হয়। এই দিনটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণ নয়, বরং মানবজীবনে ঈশ্বরকৃপা, আত্মসমর্পণ, ভক্তি ও মানবিকতার এক গভীর দার্শনিক বার্তা বহন করে। কল্পতরু দিবস আমাদের শেখায়, ঈশ্বর দূরে নন, তিনি করুণার আধারে সদ্য বর্তমান; প্রয়োজন কেবল শুদ্ধ হৃদয় ও বিশ্বাস।

আজকের বিশ্ব দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। প্রযুক্তির বিস্ময়কর উন্নতি, তথ্যের অবিরাম প্রবাহ এবং প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক কাঠামো মানুষের জীবনকে আগের তুলনায় অনেক বেশি গতিময় করেছে। এই গতির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, একাকীত্ব এবং মূল্যবোধের সংকট। সাফল্যকে প্রায়ই কেবল বাহ্যিক অর্জন-পদ, অর্থ, খ্যাতি--এই সীমিত মানদণ্ডে বিচার করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে কল্পতরু দিবস আমাদের সামনে এক গভীর ও সময়োপযোগী বার্তা নিয়ে আসে। এটি আমাদের থামতে শেখায়, অন্তরের দিকে তাকাতে শেখায় এবং স্মরণ করিয়ে দেয়, সাফল্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্তরের শান্তি, নৈতিকতা ও মানবিকতা।

কল্পতরু : শব্দার্থ ও পৌরাণিক ধারণা

‘কল্পতরু’ শব্দটি সংস্কৃত থেকে আগত। ‘কল্প’ অর্থ ইচ্ছা বা কামনা এবং ‘তরু’ অর্থ বৃক্ষ। অর্থাৎ কল্পতরু হলো এমন এক অলৌকিক বৃক্ষ যা তার নিকটে আগত ব্যক্তির সমস্ত শুভ কামনা পূর্ণ করে। ভারতীয় পুরাণে কল্পতরুর উল্লেখ পাওয়া যায় দেবলোকের এক অলৌকিক বৃক্ষরূপে, যা দেবরাজ ইন্দ্রের স্বর্গে বিদ্যমান বলে কল্পিত। এই বৃক্ষ কেবল বস্তুগত কামনা নয়, আত্মিক আকাঙ্ক্ষাকেও পূর্ণ করতে সক্ষম--এই বিশ্বাস ভারতীয় চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত।

কল্পতরুর ধারণা মানুষের মনে আশা ও আস্থার প্রতীক। এটি বোঝায় যে, বিশ্বচরাচরে এমন এক শক্তি রয়েছে, যা নিঃস্বার্থভাবে দান করতে সক্ষম। পরবর্তীকালে এই প্রতীকী ধারণাই শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবনে বাস্তব রূপলাভ করে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : কাশীপুর উদ্যানবাটী ও ১ জানুয়ারি ১৮৮৬

১৮৮৫ সালের শেষদিকে শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব গলায় ক্যান্সার রোগে গুরুতরভাবে আক্রান্ত হন। দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির থেকে তাঁকে চিকিৎসা ও পরিচর্যার সুবিধার্থে কলকাতার কাশীপুর উদ্যানবাটীতে স্থানান্তর করা হয়। শারীরিক যন্ত্রণা চরমে পৌঁছালেও তাঁর অন্তর ছিলো করুণায় পরিপূর্ণ।

১৮৮৬ সালের ১ জানুয়ারি-ইংরেজি নববর্ষের দিন-অসংখ্য ভক্ত কাশীপুরে তাঁর দর্শনে সমবেত হন। সেই দিনটি ইতিহাসে অমর হয়ে আছে, কারণ এই দিনেই শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেব যেন এক জীবন্ত কল্পতরু হয়ে সকলের ওপর আশীর্বাদ বর্ষণ করেন। কেউ সাংসারিক শান্তি চেয়েছেন, কেউ ঈশ্বরভক্তি, কেউ জ্ঞান, কেউ বা বৈরাগ্য--প্রত্যেকের প্রার্থনাই তিনি তাঁর করুণাময় দৃষ্টিতে গ্রহণ করেছিলেন।

কল্পতরু দিবসের মূল ঘটনা : সেদিন শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেব শয্যাশায়ী অবস্থায় ভক্তদের দিকে তাকিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করেছিলেন, “তোমার কী চাই?” এই প্রশ্ন ছিলো কেবল বাহ্যিক নয়, বরং অন্তরের গভীরে প্রবেশকারী। তাঁর দৃষ্টিতে ছিলো এমন এক শক্তি, যা ভক্তের অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষাকেও স্পর্শ করতো।

ভক্তরা অনুভব করেছিলেন, এই আশীর্বাদ কোনো সাময়িক সুখের জন্যে নয়, বরং আত্মিক উত্তরণের জন্যে। অনেকেই পরবর্তী জীবনে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, সেই দিনের আশীর্বাদ তাঁদের জীবনকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছিল।

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব : করুণার জীবন্ত প্রতিমা

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবনের কেন্দ্রীয় ভাব ছিলো করুণা। তিনি বলতেন,ভগবানই সব করছেন। তাঁর কাছে গুরু ও ঈশ্বর অভিন্ন। কল্পতরু দিবসে এই করুণার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে। তিনি কখনও ভক্তদের যোগাত। বিচার করেননি। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, গৃহস্থ-সন্ন্যাসী সবাই তাঁর কাছে সমান ছিলেন। এই সমতা ও সার্বজনীনতাই কল্পতরু দিবসের অন্যতম বড়ো শিক্ষা।

শ্রীমা সারদা দেবী : মাতৃকরুণার বিস্তার

কল্পতরু দিবসে শ্রীমা সারদা দেবীর ভূমিকা অবিচ্ছেদ্য। ভক্তদের ভিড় ও আবেগ দেখে তিনি মাতৃস্নেহে সকলকে আশ্বস্ত করেছিলেন, যাও, সবাই যাও, কারও কিছু হবে না। এই বাক্যেই প্রকাশ পায় তাঁর অবারিত করুণা। শ্রীমা ছিলেন নিঃশব্দ ত্যাগ ও ক্ষমার প্রতিমূর্তি। কল্পতরু দিবসে শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেবের আশীর্বাদের সঙ্গে তাঁর মমতা মিলিত হয়ে ভক্তদের মনে গভীর নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করেছিল।

স্বামী বিবেকানন্দ ও কল্পতরু দিবসের ইঙ্গিত

নরেন্দ্রনাথ দত্ত, যিনি পরবর্তী কালে স্বামী বিবেকানন্দ নামে বিশ্ববিখ্যাত হন, কল্পতরু দিবসে গুরুর সান্নিধ্যে ছিলেন। তিনি নিজে কিছু চাইতে না চাইলেও গুরু তাঁর ভবিষাৎ কর্মযজ্ঞের ইঙ্গিত দেন। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, কল্পতরু দিবস কেবল ব্যক্তিগত মুক্তির নয়, সামাজিক ও বিশ্বমানবতার কল্যাণেরও সূচনা।

দার্শনিক তাৎপর্য : কৃপা, কর্ম ও আত্মসমর্পণ

কল্পতরু দিবসের দার্শনিক তাৎপর্য গভীর। এখানে কৃপা ও কর্ম পরস্পরের বিরোধী নয়, বরং পরিপূরক। কৃপা মানুষের অন্তরে কর্মপ্রেরণা জাগায়। আত্মসমর্পণ মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়, বরং ঈশ্বরের ইচ্ছায় নিজেকে সমর্পণ করে কর্তব্যপথে চলা।

সামাজিক ও মানবিক শিক্ষা

কল্পতরু দিবস আমাদের শেখায় মানবিকতা, সহানুভূতি ও সেবার মূল্য। স্বামী বিবেকানন্দ এই শিক্ষা থেকেই মানবসেবাকে ঈশ্বরসেবার সমার্থক বলে ঘোষণা করেন। আজকের সমাজে এই শিক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক।

সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আজকের ব্যস্ত ও প্রতিযোগিতামূলক জীবনে কল্পতরু দিবস আমাদের থামতে শেখায়। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, সাফল্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ শান্তি ও নৈতিকতা।

আধুনিক জীবনের গতি ও মানসিক সংকট

আজকের ব্যস্ত জীবনে মানুষের দিন শুরু হয় তাড়াহুড়ো দিয়ে এবং শেষ হয় ক্লান্তিতে। কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা, শিক্ষাজগতে ফলাফলের চাপ, সামাজিক মাধ্যমে তুলনার প্রবণতা--সব মিলিয়ে মানুষ নিজের অজান্তেই এক অবিরাম দৌড়ে অংশ নিচ্ছে। এই দৌড়ে অনেক সময় মানুষ ভুলে যায় কেন সে দৌড়াচ্ছে। ফলস্বরূপ দেখা দেয় মানসিক অবসাদ, অনিদ্রা, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আত্মিক শূন্যতা।

কল্পতরু দিবস এই বাস্তবতায় আমাদের সামনে এক বিকল্প জীবনবোধ হাজির করে। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের করুণাময় দর্শন বলে, মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন কেবল বাহ্যিক সাফল্য নয়, বরং অন্তরের তৃপ্তি। আধুনিক জীবনের এই সংকটে কল্পতরু দিবস যেন এক বিশ্রামের আশ্রয়, যেখানে মানুষ নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলার সুযোগ পায়।

খামার শিক্ষা : কল্পতরু দিবসের মৌলিক বার্তা

কল্পতরু দিবস আমাদের প্রথম যে শিক্ষা দেয়, তা হলো থামতে শেখা। থামা মানে কর্মবিমুখ হওয়া নয়; থামা মানে সচেতন হওয়া। জীবনের গতির মাঝে এক মুহূর্ত থেমে নিজের উদ্দেশ্য, মূল্যবোধ ও মানসিক অবস্থার দিকে তাকানো। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেবের জীবন থেকেই আমরা দেখি, তিনি বাহ্যিক সাফল্যের পেছনে ছোটেননি, কিন্তু তাঁর জীবনের প্রভাব আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত। এই উপলব্ধি আধুনিক মানুষকে শেখায় যে, জীবনের সার্থকতা কেবল দ্রুত এগিয়ে যাওয়ায় নয়, বরং সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ায়।

সাফল্যের নতুন সংজ্ঞা

সমকালীন সমাজে সাফল্যের সংজ্ঞা প্রায়শই একমাত্রিক। ভালো চাকরি, উচ্চ বেতন, সামাজিক স্বীকৃতি--এইসবই সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। কিন্তু কল্পতরু দিবস আমাদের সামনে সাফল্যের এক গভীরতর সংজ্ঞা তুলে ধরে। এখানে সাফল্য মানে মানসিক শান্তি, নৈতিক দৃঢ়তা এবং অন্যের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা।

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেব কল্পতরু দিবসে ভক্তদের যা দান করেছিলেন, তা কেবল বস্তুগত ছিলো না; ছিলো আত্মিক শক্তি। আধুনিক জীবনে এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায় যে, বাহ্যিক অর্জন যতোই হোক, যদি অন্তরে শান্তি না থাকে, তবে সেই সাফল্য অসম্পূর্ণ।

নৈতিকতার প্রাসঙ্গিকতা ও সামাজিক জীবন

আজকের সমাজে নৈতিকতার প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিযোগিতার চাপে অনেক সময় মানুষ নৈতিক আপস করতে বাধ্য হয়। কিন্তু কল্পতরু দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, নৈতিকতা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি মানবজীবনের শক্ত ভিত্তি। শ্রীমা সারদা দেবীর জীবন এই নৈতিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর নীরব অ্যাগ, ক্ষমাশীলতা ও সমবেদনা আজকের সমাজে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আধুনিক জীবনে যদি আমরা তাঁর আদর্শ থেকে সামান্য অংশও গ্রহণ করতে পারি, তবে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক অনেক বেশি সুস্থ ও মানবিক হয়ে উঠতে পারে।

আত্মসমর্পণ ও মানসিক শান্তি

আধুনিক মানুষের একটি বড়ো সমস্যা হলো নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা। সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো

ঘটাতে চাওয়ার প্রবণতা থেকেই জন্ম নেয় হতাশা। কল্পতরু দিবস আমাদের শেখায় আত্মসমর্পণের শক্তি। আত্মসমর্পণ মানে দুর্বলতা নয়, বরং বাস্তবতার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। এই শিক্ষা মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যখন মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে ঈশ্বর বা বৃহত্তর সত্যের ওপর আস্থা রাখতে শেখে, তখন মানসিক চাপ অনেকাংশে লাঘব হয়।

শিক্ষাক্ষেত্রে কল্পতরু দিবসের শিক্ষা

আজকের শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়ই নম্বর ও প্রতিযোগিতার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়। কল্পতরু দিবসের শিক্ষা শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারে, শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো চরিত্রগঠন ও মানবিকতা। যদি শিক্ষাক্ষেত্রে এই মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।

কর্মজীবনে প্রাসঙ্গিকতা

কর্মক্ষেত্রে কল্পতরু দিবসের শিক্ষা প্রয়োগ করলে কাজের পরিবেশ আরও মানবিক হতে পারে। সহমর্মিতা, সততা ও সহযোগিতার মনোভাব কর্মদক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি মানসিক শান্তিও প্রদান করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক কর্পোরেট সংস্কৃতির জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়।

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’

শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব (১৮৩৬-১৮৮৬) আধুনিক ভারতের এক অনন্য আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ। তাঁর জীবন ও উপদেশের মূল দর্শন হলো সর্বধর্ম সমন্বয় অর্থাৎ সকল ধর্মই সত্য এবং সকল ধর্মের লক্ষ্য একই ঈশ্বর। কল্পতরু গ্রন্থে তাঁর নানা উপদেশ, কথোপকথন ও উপলব্ধির মাধ্যমে এই দর্শন সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

সর্বধর্ম সমন্বয়ের মূল ধারণা : শ্রী রামকৃষ্ণের মতে

“যেমন নানা পথে গঙ্গায় যাওয়া যায়, তেমনি নানা ধর্মের পথেও ঈশ্বরলাভ হয়।”

এই বক্তব্যে তাঁর সর্বধর্ম সমন্বয় দর্শনের মূল কথা নিহিত। কল্পতরু গ্রন্থে তিনি বারবার বলেছেন যে, নাম ও রূপ আলাদা হলেও সত্য এক। বিভিন্ন ধর্ম সাধনার অভিজ্ঞতা, শ্রী রামকৃষ্ণ কেবল তাত্ত্বিকভাবে নয়, প্রায়োগিকভাবে বিভিন্ন ধর্ম সাধনা করে দেখিয়েছেন--

হিন্দুধর্ম : শাক্ত, বৈষ্ণব ও অদ্বৈত সাধনা

ইসলাম : দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে আল্লাহমুখী জীবন, সরলতা ও তাকওয়ার পথে মুসলমানের চলা, রিজিক ও ভাগ্যে সন্তুষ্ট থেকে আল্লাহ সাধনা

খ্রিস্টধর্ম : যিশুখ্রিস্টের প্রতি ভক্তি ও ধ্যান

কল্পতরু গ্রন্থে এই অভিজ্ঞতাগুলির বর্ণনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রতিটি ধর্মের সাধনার শেষ পরিণতি একই ঈশ্বর উপলব্ধি। আচার নয়, ভাবের গুরুত্ব। শ্রী রামকৃষ্ণ আচারসর্বস্ব ধর্মচর্চার বিরোধী ছিলেন। তিনি বলেছেন--“ভাব থাকলে পথের ত্রুটি হয় না।” অর্থাৎ আন্তরিক ভক্তি ও নিষ্ঠাই ধর্মের আসল কথা। কল্পতক গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন যে ধর্মীয় বিভেদ মানুষের সৃষ্টি, ঈশ্বরের নয়।

সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে মানবধর্ম : কল্পতরু গ্রন্থে শ্রী রামকৃষ্ণ মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহানুভূতি ও

মানবকল্যাণকে প্রকৃত ধর্ম বলে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, ঈশ্বর সবার মধ্যেই বিরাজমান। মানুষকে ভালোবাসাই ঈশ্বরকে ভালোবাসা। এই মানবধর্মের ধারণা সর্বধর্ম সমন্বয়ের পরিপূর্ণ রূপ।

উপসংহার কল্পতরু দিবস কেবল একটি দিন নয়, এটি একটি চিরন্তন আদর্শ। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের করুণা, শ্রীমা সারদা দেবীর মাতৃত্ব এবং স্বামী বিবেকানন্দের বিশ্বদৃষ্টি--এই তিনের সম্মিলনে কল্পতরু দিবস মানবজীবনের এক আলোকবর্তিকা। এই দিবস আমাদের শেখায়, বিশ্বাস, প্রেম ও সমর্পণের মধ্য দিয়েই মানবজীবন সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা লাভ করে। সমকালীন জীবনের প্রেক্ষাপটে কল্পতরু দিবস একটি গভীর ও সময়োপযোগী বার্তা বহন করে। এটি আমাদের শেখায়, অতিরিক্ত গতি নয়, সচেতন গতি; বাহ্যিক সাফল্য নয়, অন্তরের শান্তি এবং স্বার্থপর প্রতিযোগিতা নয়, নৈতিক ও মানবিক জীবনই প্রকৃত সার্থকতা। আজকের ব্যস্ত ও প্রতিযোগিতামূলক জীবনে যদি আমরা কল্পতরু দিবসের এই শিক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তবে ব্যক্তিগত জীবন যেমন শান্তিময় হবে, তেমনই সমাজও আরও মানবিক ও সুন্দর হয়ে উঠবে। কল্পতরু গ্রন্থের আলোকে বলা যায়, শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সর্বধর্ম সমন্বয় দর্শন আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বিভাজনের যুগে তাঁর বাণী আমাদের শেখায়, সব ধর্ম সত্য, সব পথেই ঈশ্বরলাভ সম্ভব। এই দর্শন শুধু আধ্যাত্মিক নয়, সামাজিক সম্প্রীতি ও বিশ্বভ্রাতৃত্বেরও এক মহান আদর্শ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়