শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫, ১০:৫৮

মাদরাসা শিক্ষার গুরুত্ব

মুফতী আবু বকর বিন ফারুক
মাদরাসা শিক্ষার গুরুত্ব

শিক্ষা মানবজীবনের মৌলিক চাহিদাগুলোর একটি। জ্ঞানই মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ করেছে, আর অজ্ঞতাই তাকে পশুতুল্য করে ফেলে। শিক্ষা মানুষের বিবেক জাগ্রত করে, শিষ্টাচার শেখায়, জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞান অর্জন শুধু প্রয়োজনই নয়; বরং ইমানের দাবি, আমলের পূর্বশর্ত এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। সেই জ্ঞানের উৎস হলো— কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক শিক্ষা, যা যুগ যুগ ধরে মাদরাসাগুলো সংরক্ষণ ও প্রচার করে আসছে।

★ শিক্ষা কী ও কেন?

১. শিক্ষা মানবতার আলো: ‘শিক্ষা’ শব্দটি এসেছে ‘শিক্ষিত হওয়া’ বা ‘জ্ঞানার্জন’ থেকে। শিক্ষা কেবল অক্ষরজ্ঞান নয়; বরং মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম পার্থক্য করার ক্ষমতা প্রদান করে। ইসলামে শিক্ষা শুধু দুনিয়ার জন্য নয়—আখিরাতের মুক্তির জন্যও অপরিহার্য।

২. শিক্ষার গুরুত্ব কুরআনে: কুরআন মানুষকে প্রথম যে নির্দেশ দিয়েছে তা হলো পড়।

আল্লাহ বলেন: “পড় তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আলাক: ১) এ আয়াত প্রমাণ করে জ্ঞান অর্জন ইবাদত, শিক্ষা মানুষের হিদায়াতের উৎস, জ্ঞানের সূচনা হয় আল্লাহর নাম নিয়ে।

৩.শিক্ষা কেন প্রয়োজন

১. মানবিক মূল্যবোধ গঠনে

২. শিরক-বিদআত ও গোমরাহি থেকে বাঁচাতে

৩. নিজেদের দায়িত্ব বুঝতে

৪. আল্লাহর বিধান জানতে

৫. সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে

৬. দুনিয়া-আখিরাতের সফলতার জন্য

ইসলাম জ্ঞানবিহীন ইবাদতকে অন্ধ ইবাদত বলে অভিহিত করেছে। তাই শিক্ষাহীন মানুষ পথ হারিয়ে ফেলে।

★ ইসলামে শিক্ষার উদ্দেশ্য কী?

১. প্রকৃত উদ্দেশ্য— আল্লাহর সন্তুষ্টি:

ইসলামে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো

আল্লাহকে জানা, তাঁর বিধান বোঝা, ন্যায়-অন্যায় চেনা, নৈতিক চরিত্র গঠন করা, হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য একটি পথ ধরে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।” (মুসলিম) অতএব, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু চাকরি পাওয়া নয়; বরং জান্নাতের পথে চলা সহজ করা।

২. জ্ঞান মানুষকে সম্মানিত করে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তোমাদের মধ্যে ঈমানদার ও জ্ঞানীদের মর্যাদা বহু গুণ বৃদ্ধি করেন।” (সূরা মুজাদিলা: ১১) এই আয়াতের ভাষ্য হলো যার জ্ঞান আছে, তার মর্যাদা আল্লাহ নিজেই বৃদ্ধি করেন।

৩.ইলম দ্বীনের লক্ষ্য: দ্বীনি শিক্ষার তিনটা প্রধান লক্ষ্য

১. আকীদা সংশোধন

২. ইবাদত সঠিক করা

৩. আচরণ ও চরিত্র গঠন

★ মাদরাসা শিক্ষায় এসব উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন হয়:

মাদরাসা হলো ইসলামী জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু—যেখানে মানুষ ছোটবেলা থেকেই ঈমান, চরিত্র, নৈতিকতা ও আল্লাহভীতি শিখে। মাদরাসা কেবল প্রতিষ্ঠান নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর হৃদয়।

১. মাদরাসা শিক্ষা কেন অপরিহার্য?

(ক) কুরআন-সুন্নাহ শেখানোর একমাত্র শৃঙ্খলিত পদ্ধতি

মাদরাসা না থাকলে কুরআন শিক্ষার ধারা বিপন্ন হতো, হিফজ কমে যেতো, ইসলামী শরিয়তের গভীর জ্ঞান লোপ পেয়ে যেত।

(খ) আকীদা সংরক্ষণ : আজ যখন নানা গোমরাহি, নাস্তিকতা, খ্রিস্টান মিশনারি প্রবণতা, শিরক ও বিদআত চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে তখন সঠিক আকীদা শেখানোর দায়িত্ব পালন করছে মাদরাসা।

(গ) আমল, ইবাদত এবং আদব শেখানোএ মাদরাসায় শুধু জ্ঞানই নয় নামাজের অভ্যাস, কুরআন তিলাওয়াত, আখলাক, বিনয়, এসব বিষয় চরিত্র গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

(ঘ) সমাজ নেতৃত্ব গঠন : ইমাম, খতিব, আলেম, মুফতি, শিক্ষক, দাঈ— এরা সবই মাদরাসা শিক্ষার ফল।

যদি মাদরাসা না থাকে সমাজে কোনো দ্বীনি নেতা থাকবে না।

★ কুরআন ও ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব

১.কুরআন শিক্ষা সর্বোত্তম শিক্ষা হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, “তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি সেই, যে কুরআন শেখে ও শেখায়।” (বুখারি)। অতএব মাদরাসার শিক্ষকতা দুনিয়ার সবচেয়ে সম্মানজনক পেশা।

২. কুরআন শিক্ষা হৃদয়ের রোগ দূর করে আল্লাহ বলেন, “আমি কুরআনে এমন বিষয় নাজিল করেছি, যা শিফা ও রহমত।” (সূরা ইসরাঃ ৮২)

মাদরাসা ছাড়া কোথায় নিয়মিত তিলাওয়াত, ব্যাখ্যা, অধ্যয়ন শেখানো হয়?

৩. হাদিস শিক্ষা না থাকলে ইসলাম বোঝা সম্ভব নয় কারণ হাদিস ছাড়া নামাজ কিভাবে পড়তে হবে? রোজা, হজ, যাকাতের নিয়ম কী? ব্যবসা-বাণিজ্যের বিধান কী? কিছুই জানা যাবে না। রাসুল (সা.) বলেন “আমার কথা জেনে যে তা অপরকে পৌঁছায়, আল্লাহ তাকে রাহমত দিন।” (তিরমিজি) এই দায়িত্ব পালন করছে মাদরাসা।

★প্রাথমিক শিক্ষায় ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব

১. শৈশব চরিত্র গঠনের মূল সময়। শিশুর মনে যা শৈশবে বসে যায়, তা সারাজীবন থাকে। তাই ইসলাম শৈশবের শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। হাদিসে আছে “তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও।” (আবু দাউদ) এ শিক্ষার বাস্তবায়ন সবচেয়ে সুন্দরভাবে হয় মাদরাসায়।

২. শিশুকে সঠিক আকীদা শেখানো জরুরি আল্লাহ বলেন, “জেনে রেখো, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।”

(সূরা মুহাম্মদ: ১৯) শিশু যদি ছোটবেলা থেকে তাওহিদ না শেখে। তার জীবনে ভুল ধারণা ও কুসংস্কার ঢুকে যায়।

৩.নৈতিকতা ও আচরণ শেখানো মাদরাসায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান, সততা, পরিশ্রম, নম্রতা।এসব চরিত্র শিশুর ভিত শক্ত করে।

৪.মাদরাসা শিশুদের সৎ মানুষ হওয়া শেখায়: যেখানে অনেক প্রতিষ্ঠান কেবল চাকরির জন্য তৈরি করে; মাদরাসা মানুষকে আদর্শ মানুষ হিসেবে তৈরি করে।

★মাদরাসা শিক্ষা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কেন অপরিহার্য:

১.ইমাম ও খতিব ছাড়া সমাজ চালানো সম্ভব নয়: একটি মুসলিম দেশের প্রতিটি মসজিদে প্রয়োজন- ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব এরা সবাই মাদরাসা শিক্ষার ফল।

২. আলেম ছাড়া শরিয়া আইন ও ইফতা সম্ভব নয়: মাদরাসা আলেম ছাড়া, হালাল-হারামের ফতোয়া, বিবাহ-তালাকের নিয়ম, ইসলামী অর্থনীতি কিছুই প্রতিষ্ঠিত হবে না।

৩. জাতির নৈতিকতা সংরক্ষণ: দ্বীনি শিক্ষা মানেই নৈতিকতা। মাদরাসা মানুষকে দুর্নীতি থেকে দূরে রাখে, নিষ্ঠাবান করে, পরিবার ও সমাজকে সুরক্ষিত রাখে।

৪.ইসলামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ : প্রাচীনকাল থেকে ইসলামী সভ্যতা মাদরাসা কেন্দ্রিক ছিল।

★ কুরআন-হাদিসে শিক্ষকদের মর্যাদা :

১. আল্লাহর কাছে আলেমের সম্মান

রাসুল (সা.) বলেন, “আলেমের শ্রেষ্ঠত্ব ইবাদতকারীর উপর চাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব তারার ওপরের মতো।” (আবু দাউদ)

২. আলেমরা নবীদের উত্তরসূরি হাদিসে এসেছে “আলেমগণ নবীদের উত্তরসূরি।” (তিরমিজি)

নবীরা জ্ঞান রেখে গিয়েছেন; আর আলেমরা সে জ্ঞানের ধারক-বাহক। এ উত্তরাধিকার টিকিয়ে রেখেছে মাদরাসা।

★ যুগে যুগে মাদরাসা ইসলামের দুর্গ

মুসলিম বিশ্বে ইসলামী জ্ঞান, সংস্কৃতি, গবেষণা, বিজ্ঞান, সাহিত্য— সবই মাদরাসা থেকে বিকশিত হয়েছে। দারুল আরকাম, দারুল হাদিস, আল কোরআন ইনস্টিটিউট, আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসা, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ বিশ্ব নেতৃত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশেও ছারছীনা মাদরাসা, দারুন্নাজাত মাদরাসা, সোনাকান্দা মাদরাসা , সিলেট ও ঢাকা আলিয়া, এসব মাদরাসা যুগযুগ ধরে ইসলাম রক্ষা করে আসছে।

★ আধুনিক বিশ্বে মাদরাসার প্রয়োজন আরও বেশি

১.নাস্তিকতা ও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, ইন্টারনেটের যুগে শিশু-কিশোররা দ্রুত ভিন্ন ধারার চিন্তায় প্রভাবিত হচ্ছে। তাদের ঈমান রক্ষার বর্ম হলো মাদরাসা।

২. ইসলামী অর্থনীতি, ফিকহ, গবেষণার প্রসার : হালাল ব্যাংকিং, শরিয়া স্কলার, ইফতা আলোচনা এগুলো সবই মাদরাসা শিক্ষায় দক্ষ ব্যক্তিদের কাজ।

৩. পরিবার ও সমাজে শান্তি : মাদরাসা শিক্ষায় বেড়ে ওঠা মানুষ বাবা-মাকে সম্মান করে, সমাজে শান্তি স্থাপন করে। চুরি-দুষ্কর্ম থেকে দূরে থাকে, নৈতিকতা শেখায়

পরিশেষে বলতে হয়, মাদরাসা শিক্ষা ইসলামের মূল ভিত্তি। কুরআন-হাদিসের আলোকে দেখা যায় জ্ঞানার্জন ফরজ, কুরআন শিক্ষা সর্বোত্তম আমল, আলেমরা নবীদের উত্তরসূরি, মাদরাসা দ্বীন রক্ষার দুর্গ। আজকের বিশ্বে যখন নৈতিকতা সংকট, ঈমানের দুর্বলতা, বিভ্রান্তি ও অপসংস্কৃতির বিস্তার হচ্ছে তখন মাদরাসা শিক্ষাই আমাদের সন্তানদের রক্ষা করার নিরাপদ আশ্রয়।

মাদরাসা শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, ইসলামের আলো বহন করে মানবতার পথ দেখানো একটি আলোকিত কেন্দ্র। ইসলামের টিকে থাকা, জাতির নৈতিকতা, সমাজের শান্তি সবকিছুর মূল ভিত হলো মাদরাসা শিক্ষা। লেখক, ইমাম ও খতিব, বিষ্ণুপুর মদিনা বাজার বাইতুল আমিন জামে মসজিদ, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়