শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:২৯

অন্ধকারে যারা স্বস্তি খোঁজে

সুধীর বরণ মাঝি
অন্ধকারে যারা স্বস্তি খোঁজে

একদল মানুষ আছেন, যারা অন্ধকারকে ভালোবাসেন। জীবনের আনন্দ তাঁরা খুঁজে বেড়ান সেই ঘন ছায়ার ভেতর, যেখানে আলো ঢোকে না, প্রশ্ন জ্বলে না। তারা বিশ্বাস করেন অন্ধকারই নিরাপদ, আলো মানেই ঝুঁকি। তাই তারা চোখ বুঁজে হাঁটে অন্ধবিশ্বাসে মোড়ানো পথে। তাদের কাছে আলো এক অনাহূত অতিথি, মেলা এক অচেনা বিশৃঙ্খলা, আর উৎসব এক ভয়াবহ উন্মাদনা। তারা চায় না মানুষ জেগে উঠুক, চায় না মুখে আলো পড়ুক। আলো মানেই উন্মোচন, মেলা মানেই মিলন, উৎসব মানেই জীবনের পুনরাবিষ্কার এই সত্য তারা অস্বীকার করে, কারণ সত্য তাদের চোখে আগুন জ্বেলে দেয়।

এই অন্ধকারপ্রেমীরা আসলে নিজেদের ভেতরের ভয় থেকে পালাতে পালাতে গড়ে তুলেছে অন্ধকারের রাজ্য। তারা ভাবে, আলো মানে বিচার, প্রশ্ন, প্রতিফলন। আলোয় নিজের মুখ দেখা মানে নিজের ভিতরকার দাগ, ব্যর্থতা, অপরাধ দেখতে পাওয়া। তাই তারা আলো থেকে দূরে থাকে যেন সত্যের আয়নায় তাদের মুখ না ধরা পড়ে। তারা মেলা এড়িয়ে চলে, কারণ মেলা মানে মিলন, আর মিলন মানে ভিন্ন মতের সহাবস্থান। সহাবস্থান মানে দেয়াল ভাঙ্গা যে দেয়ালই তাদের নিরাপত্তা, যে অন্ধকারই তাদের আশ্রয়। তারা ভাবে, অন্ধকারই শান্তি দেয়, অথচ সেই অন্ধকারই নিঃশব্দে গ্রাস করে তাদের ভেতরের জীবনবোধ। তারা ধীরে ধীরে ভুলে যায় রঙ, গন্ধ, সঙ্গীত, স্পর্শ সবকিছু যা মানুষকে মানুষ করে তোলে। তাদের ভয় হয়, আলোয় ধরা পড়বে নিজের ছায়া; মেলায় ভেঙে যাবে নিঃসঙ্গতার কুয়াশা; উৎসবে মিশে যাবে নিজের একাকিত্বের মিথ।

অন্ধকারে তারা পায় মিথ্যার উষ্ণতা, আত্মপ্রবঞ্চনার স্বস্তি। সেই অন্ধকার যেন এক বিশাল গুহা নিরাপদ, নিশ্চুপ, অথচ ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলে তাদের অস্তিত্ববোধ। তারা ভুলে যায় রঙ, গন্ধ, সঙ্গীত, স্পর্শ সবকিছু যা মানুষকে মানুষ করে তোলে। তাদের ভয় হয়, আলোয় ধরা পড়বে নিজেদের ছায়া; মেলায় ভেঙে যাবে নিঃসঙ্গতার কুয়াশা; উৎসবে মিশে যাবে একাকিত্বের মিথ। তাদের চোখ বন্ধ, কিন্তু তারা বোঝে না চোখ বন্ধ করলে পৃথিবী অন্ধ হয় না, কেবল নিজের ভেতরেই অন্ধকার ঘন হয়।

তবু আলো থেমে থাকে না। সে আসে ধীরে ধীরে, অন্ধকারের চাদরের ফাঁক দিয়ে। এক ফোঁটা শিশিরের মতো, একটুকরো সুরের মতো, কখনও কারও মনে, কখনও কারও চোখে। কারণ আলো আসলে নিঃশব্দ এক বিপ্লব সে ঘোষণা করে জাগরণের, ডাকে জীবনের। অন্ধকার যতোই তাকে আটকে রাখতে চায়, আলো ততোই তার সীমা ভেঙে বেরিয়ে আসে। সে জানে, অন্ধকারের শিকল দীর্ঘস্থায়ী নয়; কারণ মানুষের আত্মা নিজেই আলোয় জন্ম নেয়, সত্যের দিকে টান অনুভব করে। মানুষের এক শ্রেণি আছে যারা অন্ধকারকে আশ্রয় করে বাঁচে। তারা মনে করে, আলো মানেই বিপদ, সত্য মানেই অস্থিরতা। তাই তারা আলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, মেলা থেকে সরে দাঁড়ায়, উৎসবের কোলাহল থেকে পালিয়ে যায়। অন্ধকারের নিশ্চুপ গুহায় তারা খুঁজে পায় মিথ্যার নিরাপত্তা, অজ্ঞানতার উষ্ণতা। কিন্তু তারা জানে না আলো জ্বলে উঠে ভয় ভাঙার মুহূর্তে; মেলায় মিশে থাকে সহাবস্থানের সত্য; আর উৎসব আসলে জীবনের পুনর্জন্মের ঘোষণা।

আলো মানে কেবল আলোকিত হওয়া নয়, বরং জেগে ওঠা। মেলা মানে কেবল বিনোদন নয়, বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ, একতার বোধ। আর উৎসব মানে কেবল সাজসজ্জা নয়, বরং আত্মার পুনর্জাগরণ। যে মানুষ এগুলোকে ভয় পায়, সে আসলে নিজের ভেতরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেÑযেখানে আলো প্রবেশ করতে চায়, কিন্তু ভয় তালা হয়ে তাকে আটকে রাখে। অন্ধকারের পূজারীরা এই ভয়কে প্রার্থনায় রূপ দেয়। তারা নিজেদের যুক্তি দেয়Ñঅন্ধকারই শান্তি, আলো কেবল জ্বালায় আগুন। কিন্তু তারা ভুলে যায়Ñসেই আগুনই মানুষকে নতুন করে সৃষ্টি করে, পুরোনোকে ভস্ম করে নতুনের বীজ বপন করে। যে আলোকে তারা ধ্বংসের প্রতীক মনে করে, সেই আলোই আসলে সৃষ্টির সূচনা। তাদের চোখ বন্ধ, কিন্তু তারা বোঝে না চোখ বন্ধ করলে পৃথিবী অন্ধ হয় না, কেবল নিজের ভেতরেই অন্ধকার ঘন হয়। তবু একদিন হয়তো তারা বুঝবে অন্ধকার কোনো আশ্রয় নয়, বরং এক দীর্ঘ ভ্রম। সত্য যতই অস্বীকার করা হোক, সে ফিরে আসে বারবার আলো হয়ে, উৎসব হয়ে, মানুষের সহাবস্থানের আনন্দ হয়ে। যখন কোনো শিশু হাসে, কোনো শিল্পী রঙ ছড়ায়, কোনো মানুষ অন্য মানুষের হাত ধরে, তখনই আলো জন্ম নেয়। তখন অন্ধকার পিছু হটে, যতই সে শক্তিশালী মনে হোক না কেন। অন্ধকারকে ভালোবাসা মানে প্রকৃতিকে অস্বীকার করা। কারণ প্রকৃতির প্রথম সত্যই হলো আলো ভোরের সূর্য, নদীর ঝলক, মানুষের চোখের দীপ্তি। যে মানুষ এই আলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে নিজের মানবত্বকেই অস্বীকার করে। কিন্তু মানুষ চিরকাল অন্ধকারে থাকতে পারে না। ভয়, মিথ্যা ও সহিংসতার ওপর ভিত্তি করে কোনো কিছু বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না। ইতিহাস বলে অন্ধকার যতই গভীর হোক, তার গর্ভেই আলো জন্ম নেয়। তাই একদিন, অন্ধকারের সেই প্রেমিকরাও হয়তো ক্লান্ত হবে। তারা বুঝবে, অন্ধকারে শান্তি নেই আছে কেবল নিস্তব্ধ মৃত্যু। আর আলো মানেই জীবন, গতি, সৃষ্টি। তখন তারা মুখ তুলবে আকাশের দিকে, দেখবে আলোর দিকে তাকানো মানে হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং নিজের ভেতরের পুনর্জন্ম।জীবনের আসল আনন্দ লুকিয়ে আছে আলো, মেলা ও উৎসবের মধ্যেই যেখানে মানুষ নিজের সীমা ছাড়িয়ে মিশে যায় অনন্তের সঙ্গে। সেখানে নেই ভয়, নেই বিচ্ছিন্নতা; আছে কেবল সৃষ্টির দীপ্তি, সত্যের উষ্ণতা, আর ভালোবাসার অনন্ত প্রতিধ্বনি। সুধীর বরণ মাঝি : শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়