শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:২৮

প্রবীণ বয়সে এসে সন্তানকে খোঁটা দিলে অশান্তি বাড়ে

হাসান আলী
প্রবীণ বয়সে এসে সন্তানকে খোঁটা দিলে অশান্তি বাড়ে

একজন মা-বাবার জীবনে সন্তানের জন্যে ত্যাগের শেষ নেই। জন্মের মুহূর্ত থেকে বড়ো হওয়া পর্যন্ত সন্তানের প্রতিটি হাসি, প্রতিটি অগ্রগতি যেন তাদের জীবনসার্থকতার প্রমাণ। খাওয়ানো, পড়াশোনা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা সবকিছুতে তারা নিজের আরাম, স্বপ্ন, এমনকি অনেক সময় জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলোও ত্যাগ করেন। কিন্তু প্রবীণ বয়সে এসে সেই ত্যাগের গল্প যখন খোঁটার আকারে উঠে আসে, তখন সম্পর্কের উষ্ণতা কমতে থাকে। যে স্মৃতিগুলো ভালোবাসার আলোয় ভরা ছিলো, সেগুলোই কখনও হয়ে উঠে অশান্তির উৎস।

প্রবীণদের একাংশ মনে করেন জীবনের সংগ্রাম, ত্যাগ, কষ্ট তো সন্তানদের জানানো উচিত। তাদের ধারণা, সন্তান নিজের দায়িত্ব বুঝতে পারবে, কৃতজ্ঞ হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, খোঁটার ভাষা যতোই সত্য হোক, তা সন্তানের কাছে তিক্ত হয়ে আসে। কারণ খোঁটা শুনে কেউই নিজের প্রতি ভালোবাসা বা দায়িত্ববোধ বাড়ায় না, বরং মনে মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বিশেষ করে যখন সন্তান নিজেও সংসারের চাপে, কর্মব্যস্ততায় কিংবা মানসিক ক্লান্তিতে থাকে, তখন এই খোঁটা তার জন্যে বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

প্রবীণ বয়সে অনেক সময় মানুষ আবেগে সংবেদনশীল হয়ে পড়েন। একাকিত্ব, শারীরিক সীমাবদ্ধতা, আর্থিক নির্ভরতা সব মিলিয়ে মনে আঘাতের জায়গা তৈরি হয়। তখন অতীতের ত্যাগ স্মরণ করে সন্তানদের কাছ থেকে বেশি যত্ন ও ভালোবাসা আশা করেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা প্রকাশের উপায় যদি অভিযোগ বা খোঁটার মাধ্যমে হয়, তবে সন্তানরা দূরে সরে যেতে পারে। তারা মনে করে, যতোই চেষ্টা করি, কখনও বাবা-মায়ের মন ভরানো যাবে না। এই হতাশা থেকে উদ্ভূত হয় মানসিক দূরত্ব।

অন্যদিকে, সন্তানরাও মানুষ। তাদেরও সম্পর্ক, দায়িত্ব, কাজের চাপ, পারিবারিক হিসাব-নিকাশ আছে। তারা চাইলে কী না করতে পারেÑএমন ভাবনা অনেক প্রবীণের মনে থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। সন্তানরা অনেক সময় চায় বাবা-মায়ের পাশে থাকতে, কিন্তু সক্ষমতা ও সময়ের সীমাবদ্ধতা তাদের বাধা দেয়। তখন তারা প্রত্যাশা নয়, বোঝাপড়া চায়। কিন্তু খোঁটা সে বোঝাপড়ার পথ বন্ধ করে দেয়। একটি সম্পর্ককে যতোটা শক্ত করা সম্ভব কথা দিয়ে, ঠিক ততোটাই দুর্বল করে দেওয়া সম্ভব ভুল কথায়।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে প্রবীণদের প্রয়োজন কিছু আবেগগত সচেতনতা। প্রথমত, সন্তানকে বোঝানোর চেষ্টা নয়, বরং নিজের অনুভূতি শান্তভাবে প্রকাশ করা জরুরিÑ“তুমি সময় না পেলে আমি একটু একাকিত্ব বোধ করি।”এ ধরনের বাক্য খোঁটার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। এতে সন্তানরা অপরাধবোধে নয়, বুঝে-শুনে প্রতিক্রিয়া দেয়। দ্বিতীয়ত, অতীতের ত্যাগকে ভালোবাসার স্মৃতি হিসেবে রাখা উচিত, অভিযোগের অস্ত্র হিসেবে নয়। সন্তানরা জানে যে, বাবা-মা তাদের জন্যে কতো কিছু করেছেন; আবার বারবার তা শুনতে হলে কৃতজ্ঞতা নয়, অস্বস্তিই বাড়ে।

সন্তানের জন্যেও এখানে ভূমিকা আছে। তারা যদি বাবা-মায়ের আবেগ বোঝার চেষ্টা করে, তাহলে অনেক খোঁটাই আসলে এক ধরনের আক্ষেপ, ভালোবাসার দাবি বা মনোযোগের প্রত্যাশা এটা বুঝতে পারবে। সঠিক সময়ে দুমিনিট পাশে বসা, হালকা গল্প শোনা, ছোটখাটো সিদ্ধান্তে বাবা-মাকে গুরুত্ব দেওয়া এসব আচরণ সন্তান-প্রবীণ সম্পর্ককে অনেক মজবুত করে।

শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের মূলশক্তি হলো সম্মান ও সংবেদনশীলতা। প্রবীণ বয়স মানেই কষ্টের বোঝা নয়, এটি জীবনের আরেকটি অধ্যায়, যেখানে বাবা-মায়ের প্রয়োজন একটু কোমলতা, একটু মনোযোগ। আর সন্তানদের প্রয়োজন একটু ধৈর্য, একটু সহমর্মিতা। খোঁটা না দিয়ে ভালোবাসার ভাষায় বললে ভুল বোঝাবুঝি কমে, ঘরে শান্তি বাড়ে। তাই বলা যায়, প্রবীণ বয়সে খোঁটার ভাষা নয়, প্রয়োজন বোঝাপড়া ও সৌহার্দ্য। তবেই প্রজন্মের সম্পর্ক হবে আরও সুন্দর ও স্থায়ী।

a

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়