শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:২৭

প্রবীণের বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং করণীয়

হাসান আলী
প্রবীণের বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং করণীয়

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীর যেমন দুর্বল হয়, তেমনি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ে সুস্পষ্ট প্রভাব। প্রবীণ বয়সে বাইপোলার ডিজঅর্ডার তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হলেও বাস্তবে এটি এক গভীর মানসিক সংকট। এই অসুস্থতায় প্রবীণ ব্যক্তি কখনও অস্বাভাবিক উৎফুল্ল, চঞ্চল ও অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠেন (ম্যানিক অবস্থা), আবার কখনও গভীর হতাশা, নিরাশা ও উদাসীনতায় ভুগে যান (ডিপ্রেসিভ অবস্থা)। দুই অবস্থার মধ্যকার এই দোলাচল তাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক ও দৈনন্দিন সামর্থ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

প্রবীণদের ক্ষেত্রে বাইপোলার ডিজঅর্ডারের লক্ষণগুলো অনেক সময় আলাদা রূপ নেয়। তারা হঠাৎ অস্বাভাবিক খরচ করতে শুরু করতে পারেন, পুরানো স্মৃতি নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠতে পারেন, ঘুম কমে যায় বা অতিরিক্ত হয়ে যায়, পরিবারের সদস্যদের প্রতি সন্দেহপ্রবণতা দেখা যায়, কিংবা ধর্মীয় বা দার্শনিক ভাবনায় নিমগ্ন হয়ে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেন। আবার হতাশার সময়ে তারা মনে করতে পারেনÑ“বাঁচার আর অর্থ নেই”, “সব শেষ”Ñএমনকি আত্মহত্যার চিন্তাও মাথায় আসতে পারে। অনেক পরিবার এগুলোকে স্রেফ বয়সজনিত বদমেজাজ বা একাকিত্বের ফল ভেবে গুরুত্ব দেয় না, ফলে সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে।

এই রোগের পেছনে জেনেটিক প্রভাব, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, প্রিয়জন হারানোর শোক, অবসর পরবর্তী পরিচয় সংকট, শারীরিক অসুস্থতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বড় ভূমিকা রাখে। প্রবীণ বয়সে সন্তানরা আলাদা হয়ে গেলে, সামাজিক যোগাযোগ কমে গেলে এবং একাকিত্ব গ্রাস করলে মানসিক ওঠানামা আরও প্রকট হয়। আবার ডিমেনশিয়া বা আলঝাইমার্সের প্রাথমিক অবস্থাতেও বাইপোলার লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যা আরও গভীর মনোযোগ ও চিকিৎসা প্রয়োজন করে।

করণীয় ধাপসমূহ :

প্রথমত, পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবীণ ব্যক্তির আচরণ হঠাৎ পরিবর্তিত হলে তা অবহেলা না করে মনোবিদ বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন। নিয়মিত মানসিক মূল্যায়ন, ওষুধ সেবন এবং কাউন্সেলিং উল্লেখযোগ্যভাবে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রবীণদের জীবনে রুটিন তৈরি করাÑযেমন নির্দিষ্ট সময় ঘুম, হালকা ব্যায়াম, সামাজিক আড্ডা, বইপড়া বা ধর্মীয় অনুশীলনÑমনোস্বাস্থ্য স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর। তৃতীয়ত, প্রযুক্তির যুগে প্রবীণদের মানসিক সক্রিয়তা বজায় রাখতে অনলাইন গ্রুপ, প্রবীণ ক্লাব বা থেরাপি সাপোর্ট গ্রুপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহানুভূতি। প্রবীণ বাইপোলার রোগীকে বোঝাতে হবে যে, তাঁর অনুভূতি সত্যি, তাঁর কষ্ট বাস্তব এবং পরিবার তাঁর পাশে আছে। মানসিক স্বাস্থ্যও শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই চিকিৎসাযোগ্যÑএই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করাই হতে পারে সুস্থতার প্রথম ধাপ।

বাইপোলার ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত প্রবীণদের জন্যে চিকিৎসার পাশাপাশি সবচেয়ে কার্যকর থেরাপি হলোÑপরিবারের সহানুভূতিশীল উপস্থিতি এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। প্রবীণরা এই বয়সে শুধু ওষুধ নয়, প্রয়োজন বোঝাপড়া, মর্যাদা এবং কথোপকথনের নিরাপদ পরিসর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়