শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ০০:৫২

ইলিশ উৎপাদনের রেকর্ড নিয়ে মৎস্য বিভাগের ভুয়া রিপোর্ট?

অনলাইন ডেস্ক
ইলিশ উৎপাদনের রেকর্ড নিয়ে মৎস্য বিভাগের ভুয়া রিপোর্ট?

‘নদীতে ইলিশ কমলেও খাতা-কলমে উৎপাদনের রেকর্ড! চঁাদপুরে ধনাগোদা ও অস্তিত্ববিহীন গোমতী নদীতেই বছরে ইলিশের উৎপাদন ৩৭৩.৫ মেট্রিক টন!'-এটি বুধবার চঁাদপুর কণ্ঠে ব্যানার হেডিংয়ে প্রকাশ পাওয়া শীর্ষ সংবাদ। হেডিংয়ে দুটি আশ্চর্যবোধক চিহ্ন (!) দিয়ে পরিবেশিত সংবাদটি পড়ে পাঠককেও আশ্চর্যান্বিত হতে হয়। সংবাদের সংক্ষিপ্ত বিবরণী হলো এই যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চঁাদপুরের পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের উৎপাদন কম দেখা গেলেও মৎস্য বিভাগের হিসেবে প্রতিবছরই গড়ছে উৎপাদনের রেকর্ড। কিন্তু তাদের দেয়া তথ্যে দেখতে পাওয়া যায় বিস্তর অসঙ্গতি। গত ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে জেলা মৎস্য বিভাগ চঁাদপুরে ইলিশের মোট উৎপাদন দেখিয়েছে ৩৫ হাজার ১০৪ মেট্রিক টন। যেখানে মেঘনা নদীর শাখা ধনাগোদা ও চঁাদপুরে অস্তিত্ববিহীন গোমতী নদীতে ইলিশের উৎপাদন দেখিয়েছে ৩৭৩ মেট্রিক টন। ইলিশ গবেষকরা বলছেন, ধনাগোদার মতো শাখা নদীতে অপ্রত্যাশিতভাবে দু-চারটে ইলিশ ঢুকে পড়লেও এসব নদীতে নিয়মিতভাবে ইলিশ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর জেলে ও আড়তদাররা বলছেন, তথ্য নিতে কখনো বাজার কিংবা মাছের আড়তে আসে না মৎস্য বিভাগের লোকজন। অফিসে বসে মনগড়া হিসেবে প্রতি বছর উৎপাদন বাড়াচ্ছে মৎস্য কর্মকর্তারা। এতে চাপা পড়ে যাচ্ছে চঁাদপুরের ইলিশ সংকটের চিত্র।

মেঘনার একটি শাখা নদী ধনাগোদা। এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলার উপর দিয়ে। শান্ত স্বভাবের নদীটিতে সারা বছর কম-বেশি দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। বর্ষায় পানি বাড়লে অন্যান্য মাছের সঙ্গে কদাচিত জেলেদের জালে উঠে আসে দু-চারটে ইলিশ। অথচ জেলা মৎস্য বিভাগ ধনাগোদা ও চঁাদপুরে অস্তিত্ববিহীন গোমতী নদী থেকে ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ইলিশের উৎপাদন দেখিয়েছে ৩৭৩.৫ মেট্রিক টন। চঁাদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. গোলাম মেহেদী স্বাক্ষরিত ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ইলিশ উৎপাদন সংক্রান্ত মাসিক প্রতিবেদনের কপিতে দেখা যায়, প্রতি মাসে ১৫ দিন অন্তর অন্তর ইলিশ উৎপাদনের হিসাব লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। যেখানে ‘মেঘনা, ধনাগোদা ও গোমতী নদী’ থেকে এক বছরে রেকর্ড ৩৫ হাজার ১০৪ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন দেখানো হয়। স্থানীয় জেলে গৌতম দাশ বলেন, আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগে ধনাগোদা নদীতে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ পাওয়া যেতো। কিন্তু গত ৮ থেকে ১০ বছর ধরে পাওয়া যায় না। বর্তমানে পানি বাড়লে অন্যান্য মাছের সঙ্গে দু-চারটা উঠে। চর পড়ে যাওয়ায় মাছ খুব একটা পাওয়া যায় না। মতলব দক্ষিণ বাজারের ব্যবসায়ী মো. হাসান ও সুমন সরকার বলেন, ধনাগোদা নদীতে রুই, কাতল, বোয়ালসহ দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। বছরে দু-এক মাস ধনাগোদায় ধরা পড়া ৫ থেকে ১০ কেজি ইলিশ বাজারে নিয়ে আসে জেলেরা। তাছাড়া সারা বছরই আমরা চঁাদপুর বড় স্টেশন ও হরিনা মাছ ঘাট থেকে ইলিশ এনে বিক্রি করে থাকি। তবে কখনো আমাদের এখানে মৎস্য বিভাগের লোকজন আসেনি ইলিশের খেঁাজ খবর নেয়ার জন্যে। অফিসে বসে থেকেই এমন হিসেব করে মনে হয়। ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান বলেন, ধনাগোদা কিংবা ডাকাতিয়ার মতো শাখা নদীতে ভুল করে ইলিশের দু-একটি ঝঁাক চলে আসতে পারে, তবে এসব শাখা নদীতে স্থায়ীভাবে ইলিশ বসবাসের সুযোগ নেই। তাই এসব নদীতে মাঝে মধ্যে জেলেদের জালে দু-একটি ইলিশ ধরা পড়লেও সারা বছর ইলিশ পাওয়ার সুযোগ নেই।

হাইমচর উপজেলার চরভৈবরী আড়তের মাছ ব্যবসায়ী খোকন বলেন, বিগত ৪ থেকে ৫ বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন কমায় আড়তেও মাছ আসছে কম। তবে, মাছের হিসাব নিতে কখনই ঘাটে আসেনি মৎস্য কর্মকর্তারা। আমাদের সঙ্গে কথা না বলে তারা কীভাবে তথ্য পায়? চঁাদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল বারী জমাদার বলেন, মৎস্য বিভাগ বার্ষিক ইলিশ উৎপাদনের যেই হিসাব দিয়েছে তা আমরা গ্রহণ করতে পারছি না। তারা আমাদের থেকে তথ্য না নিয়েই নিজেদের মতো তথ্য দিয়ে দিচ্ছেন। যা আসলে ঠিক নয়। মূলত গত কয়েক বছর ধরে চঁাদপুরে ইলিশের উৎপাদন প্রতি বছরই কমেছে। গত ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে চঁাদপুর জেলায় ইলিশের যে রেকর্ড পরিমাণে উৎপাদন দেখানো হয়েছে, আমরা তাতে দ্বিমত পোষণ করছি। তাদের এমন ভ্রান্ত হিসেবে সবার ক্ষতি হচ্ছে। এতে করে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর জন্যে সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। নদীতে ইলিশ সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে এমন অযৌক্তিক হিসেব প্রত্যাখ্যান করে উৎপাদনের সঠিক হিসেব তুলে ধরার দাবি জানাই।

চঁাদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা গোলাম মেহেদী হাসানকে ইলিশ উৎপাদনের হিসেব কীভাবে নেয়া হয় প্রশ্ন করা হলে তিনি এর সঠিক কোনো উত্তর দিতে পারেননি। তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন চঁাদপুরে গোমতী নদী নেই। তবে, কীভাবে সেই নদীর ইলিশের হিসাব তার প্রতিবেদনে লিপিবদ্ধ হয়েছে বিষয়টির খেঁাজ নেয়া হবে বলে জানান তিনি। তঁার দাবি, চঁাদপুরে ইলিশের উৎপাদন প্রতি বছরই বাড়ছে। বিভিন্ন উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে ইলিশ উৎপাদনের হিসাব দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে মৎস্য ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে তথ্য না নেয়ার অভিযোগের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

চঁাদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা, ইলিশ গবেষক, জেলে, আড়তদার, খুচরা বিক্রেতা ও পাইকারী মৎস্য ব্যবসায়ীদের নেতার বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, ইলিশ উৎপাদনের রেকর্ড বিষয়ে সরকারের মৎস্য বিভাগের প্রদত্ত প্রতিবেদন বাস্তবতা বিবর্জিত। এটাকে যদি ভুয়া বলা হয়, সেটাও অত্যুক্তি হবে বলে মনে করছি না। কেননা গত ক'বছর ধরে চঁাদপুর কণ্ঠ সহ স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে ভরা ইলিশ মৌসুমেও পর্যাপ্ত ইলিশ না পাওয়া ও দুর্মূল্য তথা ইলিশের সঙ্কট সংক্রান্ত অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেমতে আমরা মৎস্য বিভাগের এ প্রতিবেদনকে বিতর্কিত বলে আখ্যায়িত করছি এবং এমন সকল বিতর্কিত প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রথমত চঁাদপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত প্রত্যাশা করছি। একই সাথে মৎস্য অধিদপ্তর কিংবা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও তদন্ত প্রত্যাশা করছি। ইলিশ উৎপাদনের রেকর্ড সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরিতে গ্রহণযোগ্য মানসম্পন্ন কী প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়, সেটি জেলা মৎস্য বিভাগ স্পষ্টভাবে গণমাধ্যমে বা জনসমক্ষে তুলে না ধরলে তাদের প্রতিবেদন নিয়ে এখন যেমন ধেঁায়াশা আছে, ভবিষ্যতে তা-ই থাকবে। ইলিশ সঙ্কটের প্রকৃত চিত্র এবং সে মোতাবেক করণীয় কী সে ব্যাপারে সরকারকে পরামর্শ না দিয়ে ইলিশ উৎপাদনের রেকর্ড সংক্রান্ত ভুয়া প্রতিবেদন প্রতি বছর গোপনে প্রেরণ করে মৎস্য বিভাগ যে জঘন্য কাজ করছে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ কিংবা দোষীদের বিচার চাওয়াটা অযৌক্তিক বলে মনে করি না।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়