সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২০

সাক্ষাৎকার : ডা. আবুল কালাম আজাদ

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের পাশে থেকে চিকিৎসাসেবা দিতে চাই

অনলাইন ডেস্ক
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের পাশে থেকে চিকিৎসাসেবা দিতে চাই

ডা. আবুল কালাম আজাদ। বাবার স্বপ্ন পূরণে চিকিৎসক হয়েছেন। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৫নং পূর্ব গুপ্টি ইউনিয়নের দত্রা গ্রামে। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন তিনি। চিকিৎসক হওয়ার পর সরকারি চাকরির চেষ্টা না করে মা-বাবার পাশে থাকা এবং নিজ এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবায় আত্মনিয়োগকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ২০০১ সাল থেকে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত এই চিকিৎসক বর্তমানে বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক এসোসিয়েশন হাজীগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি। পাশাপাশি তিনি ফরিদগঞ্জ উপজেলার গল্লাক আদর্শ কলেজেরও সভাপতি। হাজীগঞ্জের বেসরকারি চিকিৎসাসেবার মান, চিকিৎসাব্যয়, রোগীর আস্থা ও স্বাস্থ্য খাতের নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে সম্প্রতি চাঁদপুর কণ্ঠের ‘চিকিৎসাঙ্গন’ বিভাগের সাথে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : আলআমিন হোসাইন।

আপনার শৈশব ও কৈশোর কোথায় কেটেছে? পড়াশোনা করেছেন কোথায়?

ডা. আবুল কালাম আজাদ : আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৫নং পূর্ব গুপ্টি ইউনিয়নের দত্রা গ্রামে। গুপ্টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়েছি হুগলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর খাজুরিয়া বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৯ সালে এসএসসি পাস করি। আমাদের সময়ে বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করি এবং বৃত্তি পাই। পরে ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে ১৯৯১ সালে এইচএসসি পাস করে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই। সেখান থেকেই এমবিবিএস সম্পন্ন করি। আমার শিক্ষাজীবনে একটি কঠিন সময়ও এসেছে। ছাত্রজীবনে আমি ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী ছিলাম। ১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে একপর্যায়ে প্রায় তিন বছর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারিনি। এতে আমার শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়। পরে ফরিদগঞ্জের তৎকালীন সংসদ সদস্য আলমগীর হায়দার খানের হস্তক্ষেপে ক্যাম্পাসে ফিরে পড়াশোনা শুরু করি এবং শেষ পর্যন্ত এমবিবিএস সম্পন্ন করি।

চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন কীভাবে দেখেছিলেন?

ডা. আবুল কালাম আজাদ : চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নটি মূলত আমার বাবার। তিনি চাইতেন, আমি ডাক্তার হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াব। এসএসসি পাস করার পর বাবা আমাকে ঢাকায় বড় বোনের বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। আমার বড় ভগ্নিপতিকে বলেছিলেন, ছেলেকে ডাক্তার হতে হবে; পড়াশোনার জন্য যা প্রয়োজন, তিনি যেনো সহযোগিতা করেন। আমি মা-বাবার একমাত্র ছেলে। তাঁদের দোয়া, বাবার অদম্য ইচ্ছা এবং নিজের চেষ্টায় মেডিকেলে ভর্তি হতে পেরেছি। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিলেন মা-বাবা।

চিকিৎসক হিসেবে প্রথম দায়িত্ব পালনের অনুভূতি কেমন ছিল?

ডা. আবুল কালাম আজাদ : ২০০০ সালে এমবিবিএস সম্পন্ন করি। এরপর ২০০১ সালে রামগঞ্জ এলাকায় চিকিৎসাসেবা শুরু করি। চিকিৎসক হওয়ার পর মনে হয়েছিল, বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছি। ইন্টার্নশিপের সময় গাইনি বিভাগে আমার প্রথম পোস্টিং ছিল। প্রথম দিকেই একটি জটিল প্রসবের অভিজ্ঞতা হয়। সেই ঘটনা আমাকে বুঝিয়েছিল, চিকিৎসা পেশায় প্রতিটি মুহূর্তে দায়িত্বশীল ও সতর্ক থাকা কতটা জরুরি। সেই থেকে মানুষের সেবা করে যাচ্ছি।

দীর্ঘ কর্মজীবনে উল্লেখযোগ্য অর্জন ও অভিজ্ঞতা কী?

ডা. আবুল কালাম আজাদ : চিকিৎসাসেবায় প্রতিটি দিনই নতুন অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে অস্ত্রোপচারে নানা চ্যালেঞ্জ থাকে। ২০০৯ সালে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর অপারেশন শুরু করি। অনেক জটিল রোগীর চিকিৎসা করতে হয়েছে। কখনো রোগীর অবস্থা নিয়ে শঙ্কা থাকলেও চিকিৎসার মাধ্যমে তাঁরা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এসব অভিজ্ঞতা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। একটি কথা বলতে চাই— চিকিৎসক হওয়ার পর সরকারি চাকরিতে না গিয়ে নিজ এলাকায় চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম মা-বাবার পাশে থাকার জন্য। তাঁদের জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত পাশে থাকতে পেরেছি, তাঁদের চিকিৎসাও করেছি। একজন সন্তান হিসেবে এটিই আমার জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। আমার কাছে মানুষের ভালোবাসা ও দোয়াই সবচেয়ে বড় অর্জন।

বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক এসোসিয়েশন হাজীগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি হিসেবে আপনার পরিকল্পনা কী?

ডা. আবুল কালাম আজাদ : বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক এসোসিয়েশন হাজীগঞ্জ উপজেলা শাখার সম্প্রতি দায়িত্ব পেয়েছি। এটি সম্মানের পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জও। আমাদের লক্ষ্য, হাজীগঞ্জের বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে মানসম্মত, স্বচ্ছ ও মানবিক সেবা নিশ্চিত করা। আমি প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের বলেছি, রোগী যেন কোনো অবস্থাতেই ব্যবসার মাধ্যম না হন; তাকে সেবার কেন্দ্রে রাখতে হবে। বিশেষ করে, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি ও অন্যান্য খরচের তালিকা দৃশ্যমান স্থানে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রোগীরা যেন খরচ সম্পর্কে আগে থেকেই জানতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করতে চাই। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমিয়ে রোগীদের সরাসরি সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে চাই। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক, প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন।

হাজীগঞ্জের চিকিৎসা খাতের প্রধান সংকট কী?

ডা. আবুল কালাম আজাদ : প্রাথমিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাজীগঞ্জের অবস্থা তুলনামূলক ভালো। এখানে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও অ্যানেসথেসিয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিকিৎসক রয়েছেন। তবে সব ধরনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সার্বক্ষণিক পাওয়া যায় না। হাজীগঞ্জে মেডিকেল কলেজও নেই। ফলে জটিল রোগের চিকিৎসায় কখনো অন্যত্র যেতে হয়। এছাড়া চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো চিকিৎসা নিয়ে অভিযোগ উঠলে যথাযথ তদন্ত ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় তার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগিতা পেলে বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারবে।

বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো চিকিৎসার চেয়ে ব্যবসায় বেশি গুরুত্ব দেয়—এমন অভিযোগকে কীভাবে দেখেন?

ডা. আবুল কালাম আজাদ : মানুষের এই অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রোগী যদি অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, অস্পষ্ট বিল বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের শিকার হন, তাহলে তার মনে এমন ধারণা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যয় রয়েছে, কিন্তু তা রোগীর স্বার্থের ওপরে স্থান পেতে পারে না। আমরা চাই, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি স্বচ্ছ থাকুক, রোগীকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হোক এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়ানো হোক। ফি-তালিকা প্রকাশ্যে রাখার উদ্যোগ নিয়েছি। মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে কথার চেয়ে কাজে প্রমাণ দিতে হবে যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সেবার জন্যই কাজ করছে।

দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য সুলভে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

ডা. আবুল কালাম আজাদ : চিকিৎসার খরচ যুক্তিসংগত রাখা জরুরি। একজন দরিদ্র মানুষের কাছে চিকিৎসার ব্যয় অনেক বড় বোঝা। আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফি-তালিকা প্রকাশ এবং বিলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কাজ করছি। রোগী যেন অপ্রয়োজনীয় খরচের শিকার না হন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় ও চিকিৎসাসেবার মান বজায় রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হয়। মালিকদের সদিচ্ছা, সংগঠনের তদারকি এবং সরকারের সহযোগিতার মাধ্যমে সেবার খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার চেষ্টা করতে হবে।

উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে হাজীগঞ্জ কতটা এগিয়েছে?

ডা. আবুল কালাম আজাদ : হাজীগঞ্জে প্রায় ৩৮টি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানে ভালো অবকাঠামো ও সেবার ব্যবস্থা আছে। তবে শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে মান বিচার করা যায় না। দক্ষ চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জরুরি চিকিৎসা এবং রোগীর সঙ্গে ভালো আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি বাড়ানো গেলে রোগীদের চাঁদপুর শহর বা ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। এ জন্য চিকিৎসকদের উপযুক্ত কর্মপরিবেশ ও নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি।

হাজীগঞ্জের চিকিৎসাসেবা আরও আস্থাশীল করতে ভবিষ্যতে কী ধরনের পরিকল্পনা নিতে চান?

ডা. আবুল কালাম আজাদ : প্রথমত, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সেবার ন্যূনতম মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ফি-তালিকা প্রকাশ্যে রাখতে হবে এবং রোগীর সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে হবে। তৃতীয়ত, যেসব রোগীর উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন, তাদের যথাসময়ে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। এছাড়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সংগঠন শুধু মালিকদের স্বার্থ দেখবে না; রোগীর স্বার্থ ও জনস্বাস্থ্যকেও গুরুত্ব দেবে। সবার সহযোগিতা পেলে হাজীগঞ্জের চিকিৎসাসেবার প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়ানো সম্ভব।

অবসর সময়ে কী করেন?

ডা. আবুল কালাম আজাদ : চিকিৎসাসেবার ব্যস্ততার মধ্যেই বেশির ভাগ সময় কাটে। অবসরে পরিবার ও আপনজনদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে। মা-বাবার কথা প্রায়ই মনে পড়ে। তাঁদের দোয়া ও ত্যাগের কারণেই আজকের অবস্থানে আসতে পেরেছি। আমার চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে কোনো মানুষ উপকৃত হলে আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার কাজের কল্যাণ যেন মা-বাবার আত্মার কাছেও পৌঁছে যায়, সেই দোয়া করি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের পাশে থেকে চিকিৎসাসেবা দিতে চাই। আমার কাছে চিকিৎসা শুধু পেশা নয়, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়