প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৮
ডায়াবেটিস ও এর জটিলতা প্রতিরোধে করণীয়

বিশ্ব ডায়বেটিস দিবস
বিশ্বজুড়ে ডায়বেটিস একটি দ্রুত বিস্তারলাভকারী ব্যাধি, যা মোকাবেলা ও প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে উনিশশো একানব্বই সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইন্টারন্যাশনাল ডায়বেটিস ফেডারেশন একমত হয়ে চৌদ্দ নভেম্বরকে বিশ্ব ডায়বেটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয় ও উদ্যাপন করে। সেই থেকে প্রতিবছর একটা সুনির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য তৈরি করে বিশ্বজুড়ে এ দিবসটি পালন করা হয়। এদিন বিজ্ঞানী ফ্রেডেরিক ব্যানটিংয়ের জন্মদিন। তিনি এবং বিজ্ঞানী চার্লস বেস্ট একত্রে ডায়বেটিসের বিরুদ্ধে ইনসুলিন আবিষ্কার করেছিলেন।
বিশ্ব ডায়বেটিস দিবসের লোগো হচ্ছে নীল বৃত্ত। নীল বৃত্তের পিন পরিধেয়তে লাগিয়ে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়।
সারাবিশ্বে বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠী আজ ডায়বেটিসের শিকার। দুহাজার একুশ সালের হিসেব অনুযায়ী চীন, ভারত ও পাকিস্তান ডায়বেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যায় যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়। চীনে একশো চুয়াত্তর মিলিয়নের অধিক, ভারতে একশো চব্বিশ মিলিয়নের অধিক এবং পাকিস্তানে বাষট্টি মিলিয়নের অধিক মানুষ ডায়বেটিসে আক্রান্ত। ইন্টারন্যাশনাল ডায়বেটিস ফেডারেশনের তথ্যমতে দুহাজার সতের সালেই সারাবিশ্বে চারশো পঁচিশ মিলিয়ন মানুষ ডায়বেটিসে আক্রান্ত ছিলো। এর মধ্যে শতকরা নব্বই ভাগ ছিলো প্রাপ্ত বয়ষ্ক।
ডায়বেটিসের ইতিহাস
ডায়বেটিসের ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে দেখা যায়, গ্রক শব্দ ‘সাইফন’ এবং ল্যাটিন ‘মেলাইটাস’-এর সমন্বয়। সাইফন মানে কোনো কিছুর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়া আর মেলাইটাস হলো মধু বা মিষ্টিযুক্ত। খ্রিষ্টিয় সতের শতকে একে ‘শয়তানের মূত্রত্যাগ’ নামে অভিহিত করা হতো। খ্রিষ্টপূর্ব দুশো পঞ্চাশ সালে মেমফিসের অ্যাপোলোনিয়াস প্রথম ডায়বেটিস শব্দের প্রচলন করেন। খ্রিষ্টিয় চৌদ্দশ পঁচিশ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বইতে ডায়বেটিসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
শুশ্রুত, অরাতিউস, থমাস উইলিয়াম প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ডায়বেটিসের চিকিৎসায় অগ্রপথিক ছিলেন। শুশ্রুত একে মধুমেহ বলো আখ্যা দেন। জোসেফ ফন মেরিং এবং মিনকোয়াস্কি আঠারোশ উননব্বই সালে ডায়বেটিসের সাথে প্যানক্রিয়াসের সম্পর্ক আবিষ্কার করেন। উনিশশো বাইশ সালে জানুয়ারি মাসে লিওনার্ড থমপসন প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ইনসুলিনের ইঞ্জেকশন গ্রহণ করেন। তখন তার বয়স ছিলো মাত্র চৌদ্দ বছর। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার আগে তার বয়স হয়েছিলো মাত্র সতের বছর।
ডায়বেটিসের ধরন
টাইপ-১ ডায়বেটিসকে তারুণ্যের ডায়বেটিসও বলা হয়। এতে দেহে ইনসুলিন ঘাটতি দেখা দেয় এবং অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। এ ধরনের ডায়বেটিসেরও কোনো নির্মূল নেই কিন্তু নিয়ন্ত্রণ আছে।
টাইপ-২ ডায়বেটিসে অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না এবং কোষগুলো সেই ইনসুলিন ব্যবহার করে রক্ত হতে গ্লুকোজ টেনে নেওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
টাইপ-২ ডায়বেটিসের কোনো নির্মূল না থাকলেও অতিরিক্ত দৈহিক ওজন কমিয়ে, খাদ্যগ্রহণে শৃঙ্খলা এনে এবং অতিরিক্ত ক্যালরি পোড়ানো শারীরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
উপসর্গসমূহ
* অতিরিক্ত পিপাসা
* অতিরিক্ত মূত্র বিয়োজনের প্রবণতা
* অতিরিক্ত ক্ষুধা
* ওজন হ্রাস
* ক্লান্তি
* ঝাপসা দৃষ্টি
* ক্ষত নিরাময়ে শ্লথ গতি
* ঘন ঘন জীবাণুর সংক্রমণ
* হাতে-পায়ে বিবশতা ও ঝিন্ ঝিন্ বোধ
* স্নায়ুকেন্দ্রিক জ্বালাপোড়া বৃদ্ধি
* বগল, গলা প্রভৃতি স্থানের ত্বকে কালো বর্ণের ছাপ তৈরি হওয়া।
জটিলতাসমূহ
* চোখে ছানি পড়া
* রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা ডায়বেটিক রেটিনোপ্যাথি ও অন্ধত্ব
* চোখের গ্লুকোমা রোগ দেখা দেওয়া
* ত্বকে ছত্রাক ও ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ
* ধীরগতির ক্ষত নিরাময়
* ডায়বেটিক ফুট ও অঙ্গচ্ছেদ
* শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়া
* ঘুমে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা
* অতিরিক্ত দৈহিক স্থূলতা
* স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া বা ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার্স রোগে ভোগা
ডায়বেটিসের কারণে বিভিন্ন ঝুঁকি
* হৃদরোগের প্রবণতা বৃদ্ধি
* চর্বি জমে রক্তনালীর পরিসর সরু হয়ে আসা
* উচ্চ রক্তচাপ
* স্নায়ুবিকলন বা নিউরোপ্যাথি। এর ফলে উপাঙ্গগুলোর জ্বালাপোড়া ও বিবশতা বৃদ্ধি
* পুরুষের যৌন সক্ষমতা হ্রাস পাওয়া
* কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা নেফ্রোপ্যাথি। এতে কিডনি ফেইলিওর হতে পারে।
* ডায়বেটিক রেটিনোপ্যাথিতে চোখ আক্রান্ত হয় এবং পরিণামে অন্ধত্ব দেখা দেয়।
* চোখে ছানি পড়ে, গ্লুকোমা রোগ দেখা দেয়।
* ডায়বেটিক ফুটে অঙ্গছেদন হতে পারে।
কিছু কিছু মায়ের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পায়। একে গর্ভকালীন ডায়বেটিস বা জেস্টেশনাল ডায়বেটিস বলে। এদের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন খিঁচুনী হতে পারে, সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্চা ডেলিভারি করানোর বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়।
হিসেব করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে গর্ভবতী মায়েদের শতকরা ছয়ভাগ মা-ই গর্ভকালীন ডায়বেটিসে আক্রান্ত হয়। সারাবিশ্বে এ সংখ্যা গর্ভবতী মায়েদের শতকরা চৌদ্দ হতে সতের ভাগ। সাধারণত গর্ভবতী অবস্থায় চব্বিশ থেকে আটাশ সপ্তাহের মধ্যে এ ডায়বেটিস দেখা দিতে পারে। গর্ভকালীন ডায়বেটিসে গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা হতে নিঃসৃত হরমোন ইনসুলিনের কার্যকারিতায় বিঘ্ন ঘটায়।
গর্ভকালীন মায়ের শিশুরা জন্মকালীন শ্বাসকষ্ট, রক্তে শর্করার স্বাভাবিক মান কমে যাওয়া, স্থূলতা বা বিগ বেবি সিন্ড্রোম ইত্যাদি জটিলতায় আক্রান্ত হতে পারে।
আগে যে রোগকে বলা হতো ডায়বেটিস ইনসিপিডাস নামে, এখন তাকে বলা হচ্ছে ‘আর্জিনিন ভেসোপ্রেসিন ডিজঅর্ডার’ শিরোনামে। আর্জিনিন ভেসোপ্রেসিন একটা হরমোনের নাম। এতে অতিরিক্ত মূত্র তৈরি ও নির্গম হয়। এ রোগকে আগে কিডনিজনিত ডায়বেটিস ইনসিপিডাস বা নেফ্রোজোনিক ডায়বেটিস ইনসিপিডাস নামেও ডাকা হতো। কারণ পিটুইটারি গ্রন্থি পর্যাপ্ত পরিমাণে আর্জিনিন ভেসোপ্রেসিন হরমোন তৈরি করলেও কিডনি তাতে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়।
উপসর্গ
* ঘন ঘন মূত্রত্যাগের চাপ তৈরি হয়। রাতেও এ চাপ বজায় থাকে।
* মূত্রের পরিমাণ অধিক হয়, মূত্র হাল্কা বর্ণের হয়।
* অতিরিক্ত পিপাসা তৈরি হয়।
* সুস্থ মানুষ দৈনিক দেড় থেকে আড়াই লিটার মূত্র ত্যাগ করলেও এরা দৈনিক পনের লিটারের অধিক মূত্র ত্যাগ করে।
* অতিরিক্ত মূত্র ত্যাগের কারণে পানিশূন্যতা দেখা দেয়।
* ওজন কমে যায়, ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়।
* আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতার পাশাপাশি কোষ্ঠকাঠিন্য, বমি, জ্বর, অসহিষ্ণুতা, দৈহিক বৃদ্ধি ও বিকাশ রহিত হয়।
* ডায়বেটিস ইনসিপিডাসের কোনো নির্মূল নেই। তবে চিকিৎসায় উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
যাদের ডায়বেটিস ইনসিপিডাসে আক্রান্ত হওয়ার পারিবারিক ইতিহাস আছে, যারা মূতৃর বর্ধক ঔষধ সেবন করে, কিডনি দুর্বল, রক্তি উচ্চমাত্রার ক্যালসিয়াম বা নিম্ন মাত্রার পটাশিয়াম আছে, যাদের মস্তিষ্কে মারাত্মক আঘাত আছে তারা এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ।







