প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫০
সাক্ষাৎকার : ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া
রোগীর দোয়ার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর নেই

ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া পিএইচএফ। দীর্ঘ ৩৪ বছর সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালন করেছেন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে। ছিলেন লক্ষ্মীপুর জেলার সিভিল সার্জন ও চাঁদপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক। তবে পদ-পদবির চেয়েও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সেবা। শনিবার দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের ‘চিকিৎসাঙ্গন’ বিভাগের মুখোমুখি হয়ে তিনি তাঁর চিকিৎসক হওয়ার পেছনে মা-বাবার অবদান, দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা, রোটারীর মাধ্যমে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা ও সুস্থ জীবনযাপন নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : আলআমিন হোসাইন।
কেমন আছেন?
ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া : আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।
আপনার শৈশব-কৈশোর কেটেছে কোথায়?
ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া : আমার জন্ম ১৯৫৮ সালের ১ জুন ফরিদগঞ্জ উপজেলার কাউনিয়া গ্রামের ভূঁইয়াবাড়িতে। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে আমার জন্ম। আমার বাবা হাজী তোজাম্মেল আলী ভূঁইয়া বাংলাদেশ রেলওয়েতে চাকরি করতেন। মা হাজী মোসাম্মৎ জয়তুন বেগম আমাদের লেখাপড়াসহ সংসারের যাবতীয় কাজ এককভাবে সামলাতেন। আমি এসএসসি পর্যন্ত কাউনিয়া গ্রামেই বড় হয়েছি। প্রথমে আমাদের কাউনিয়া স্কুলে, যেটি এখন শহীদ হাবীব উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। পরে গৃদকালিন্দিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯৭৩ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করি।
আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে জানতে চাই।
ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া : এসএসসি পাস করার পর আমি ঢাকায় চলে যাই। ঢাকা আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হই। ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত আমার শিক্ষাজীবনে কোনো সময় দ্বিতীয় হইনি। বিজ্ঞান বিভাগের মেডিকেল সেকশনে আমি ফার্স্ট বয় ছিলাম। চিকিৎসক হওয়ার ভাবনাটি সূচনা হলো কীভাবে?
ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া : আমার খুব ইচ্ছা ছিল মেরিন একাডেমিতে যাওয়ার। সেটি ছিল আমার প্রথম পছন্দ। দ্বিতীয় পছন্দ ছিল সেনাবাহিনী। তৃতীয় পছন্দ ছিল মেডিকেলে ভর্তি হওয়া। সব পরীক্ষার ফল একসঙ্গে বের হওয়ার পর আমি মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাই। আমার মা খুব আগ্রহী ছিলেন আমি যেন চিকিৎসক হই। মায়ের ইচ্ছা ও আগ্রহেই শেষ পর্যন্ত মেডিকেলে ভর্তি হই। তখন সারা বাংলাদেশে সরকারি মেডিকেল কলেজ ছিল মাত্র আটটি। প্রায় ৪৮ হাজার ছেলে-মেয়ে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। আসন ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০টি। আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজে সুযোগ পাওয়ার পর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ১০০ আসনের মধ্যে ভর্তি হই। ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমি এমবিবিএস পাস করি। এরপর ইন-সার্ভিস ট্রেনিং শেষ করি। আরও কিছুদিন সেখানে দায়িত্ব পালন করার পর বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দিই।
চিকিৎসক হিসেবে প্রথম দিনের অভিজ্ঞতার কথা বলুন।
ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া : আমার প্রথম পোস্টিং ছিল স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে, যেটি মিটফোর্ড হাসপাতাল নামে ব্যাপক পরিচিত। সেখানে প্রায় ছয় মাস কাজ করার পর মতলব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগ দিই। তখন মতলব উত্তর ও দক্ষিণ মিলে একটি উপজেলা ছিল। মতলব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দিয়ে প্রথমে মেডিকেল অফিসার এবং পরে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করি। চাঁদপুরে আসার আগে প্রায় তিন বছর মতলবে দায়িত্ব পালন করেছি। এরপর চাঁদপুর সদর হাসপাতালে যোগ দিই। তখন হাসপাতালটি ১০০ শয্যার ছিল। ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে এখানে যোগ দেওয়ার পর মেডিকেল অফিসার ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ইমার্জেন্সি মেডিকেল সার্ভিসেও কাজ করেছি। এ ছাড়া সিভিল সার্জন কার্যালয়েও দুইবার পোস্টিং ছিল। বক্ষব্যাধি ক্লিনিক, যেটি টিবি ক্লিনিক হিসেবে পরিচিত, সেখানেও কাজ করেছি। সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি। পরে লক্ষ্মীপুর জেলা সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। সেখানে প্রায় দুই বছর সাত মাস কর্মরত ছিলাম। এরপর আবার চাঁদপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দিই। এখান থেকেই ২০১৭ সালে অবসরে যাই।
চাঁদপুরে যোগদান করেছেন কবে?
ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া : চাঁদপুর সদর হাসপাতালে ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যোগদান করি। তখন এটি ১০০ শয্যার হাসপাতাল ছিল। এখানে মেডিকেল অফিসার, আবাসিক মেডিকেল অফিসার ও ইমার্জেন্সি মেডিকেল সার্ভিসে দায়িত্ব পালন করেছি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে আবার চাঁদপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দিই। ২০১৭ সালে এখান থেকেই অবসরে যাই।
আপনার কাছে কোন্ ধরনের রোগী বেশি আসে?
ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া : আমার কাছে সাধারণত মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও গরিব রোগী বেশি আসে। ডাক্তারি পাস করার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমি সাধারণত গরিব রোগীদের চিকিৎসা বেশি করেছি। এমন কোনো দিন যায় না যে দুই, তিন, চার বা পাঁচজন রোগীকে বিনা পয়সায় দেখতে হয়। ১৯৮২ সাল থেকে প্রতি ঈদের দুই দিন আগে গ্রামের বাড়িতে যেতাম এবং ঈদের পর আরও দুই দিন থাকতাম। এই পাঁচ দিনে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী বিনা পয়সায় দেখতাম। বাড়িটি তখন রোগীতে ভরে যেত। রিকশা, সিএনজি, সাইকেল, গাড়িতে বাড়ির চারপাশ ভরপুর থাকত। আমি বাড়িতে গিয়ে রোগী দেখা শুরু করতাম। খাওয়াদাওয়া, নামাজ, ঈদÑকখন কীভাবে হয়ে যাচ্ছে, এই পাঁচ দিনে তা টেরই পেতাম না। আমার বাবা-মা এতে অত্যন্ত খুশি হতেন। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর এখন ঈদের দিন গ্রামের বাড়িতে যাই এবং সারাদিন থাকি। সন্ধ্যার পর ফিরে আসি। এখনও সেখানে বিনা পয়সায় রোগী দেখি। আল্লাহ যদি আমার মাধ্যমে রোগীর রোগ ভালো করেন, তাহলে আমি দোয়া করিÑআল্লাহ যেন আমার বাবা-মায়ের কবরের আজাব মাফ করেন, তাঁদের গুনাহ মাফ করেন এবং বেহেশত নসিব করেন।
রোগীদের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া
আল্লাহর রহমতে আজ পর্যন্ত কোনো রোগীর সঙ্গে ভিজিট নিয়ে আমার কোনো বিরোধ হয়নি। যার যা ইচ্ছা দিয়েছেন, আমি তা গ্রহণ করেছি। আল্লাহ আমাকে যথেষ্ট দিয়েছেন। রোগীদের কাছে আমার প্রত্যাশা খুব সামান্য। তারা যেন সুস্থ হয়ে আমার জন্য দোয়া করেন, আমার বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করেন। কারণ আমার বাবা-মায়ের অক্লান্ত চেষ্টা না থাকলে আমি চিকিৎসক হতে পারতাম না। আমি চাই রোগীরা আমার জন্য একটু দোয়া করুন আমি যেন সুস্থ থাকি, আমার পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে সুস্থভাবে, সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারি।
চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের দাতব্য চিকিৎসালয়ে চিকিৎসা দিতে গিয়ে আপনার যে অভিজ্ঞতা, সেটা যদি বলতেন।
ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া : আমি চাঁদপুর রোটারী ক্লাবে যোগদান করি মরহুম ডা. নুরুর রহমান রহমান, ডা. এমএ গফুর এবং অ্যাডভোকেট মুনাওয়ার উল্লাহসহ অন্যদের কার্যক্রম দেখে। তখন আমি মতলব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। তাঁরা মতলব হাইস্কুল প্রাঙ্গণে একটি আই ক্যাম্প করেছিলেন। সেটি দেখে আমার খুব ভালো লেগেছিল। মনে হয়েছিল, এত বড় বড় চিকিৎসক সমাজের জন্য কাজ করছেন। পরবর্তীতে যখন চাঁদপুরে আসি, আমাদের হাসপাতালের সামনে রোটারী ভবন দেখতাম। সেখানে প্রতি শুক্রবার রোটারিয়ানরা মিলিত হন এবং দাতব্য চিকিৎসালয়ে গরিব রোগীদের সেবা দেন। তাঁদের এই কাজ আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। সেই আদর্শ থেকেই আমি রোটারীতে যোগ দিই। রোটারীতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আছেনÑসাংবাদিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, প্রকৌশলীসহ অনেকে। এখানে রাজনৈতিক কোনো মতাদর্শ নেই। বিভিন্ন দলের মানুষ এখানে একসঙ্গে কাজ করেন। উদ্দেশ্য একটাইÑসমাজের জন্য কিছু করা। একজন মানুষ একা অনেক কিছু করতে পারেন না। কিন্তু রোটারীতে কেউ রাস্তা চেনেন, কেউ ভালো লিখতে পারেন, কেউ ভালো বক্তব্য দিতে পারেন, কেউ ভালো সংগঠক, কেউ কোনো কাজ সুন্দরভাবে সামলাতে পারেন, সবাই মিলে কাজ করলে সমাজের জন্য ভালো কিছু করা সম্ভব। রোটারীর দাতব্য চিকিৎসালয়টি ১৯৭০ সাল থেকে চলে আসছে। এখানে খুব গরিব, অসহায় ও নিরীহ রোগীরা আসেন। আমি প্রায় প্রতি শুক্রবার আড়াইটা থেকে পাঁচটা বা চারটা পর্যন্ত সেখানে বিনা মূল্যে রোগী দেখি। সেখান থেকে আমার কোনো প্রত্যাশা নেই। আমার মাধ্যমে যদি কয়েকজন রোগী সুস্থ হন, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেনÑএটাই আমার আনন্দ। অন্য কোনো প্রত্যাশা নিয়ে আমি সেখানে যাই না।চিকিৎসাজীবনের একটি সুখের এবং একটি দুঃখের স্মৃতির কথা বলুন।
ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া : চিকিৎসাজীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সুখের দিক হলো, আমি আমার মা-বাবার চিকিৎসা নিজে করতে পেরেছি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমার মা-বাবা এতে খুব খুশি হতেন। আমি যখন ঈদের সময় গ্রামের বাড়িতে পাঁচ দিনের জন্য যেতাম, তখন দিন-রাত প্রায় প্রতিদিন অনেক রোগী দেখতাম। মা-বাবা এতে অত্যন্ত আনন্দিত হতেন। অনেক সময় তাঁদের দেখতে গেলে তাঁরা বলতেন, বাবা, আগে ওই রোগীগুলো বিদায় করো। এরা দুই দিন, তিন দিন, এমনকি এক বছর ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। তখন দেশে চিকিৎসক খুবই কম ছিল। ১৯৮২ সাল থেকে এই পরিস্থিতি আমি দেখেছি। তাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিÑআমি আমার মা-বাবার চিকিৎসা করতে পেরেছি এবং তাঁদের সামনে অসহায় মানুষের সেবা করতে পেরেছি। আর দুঃখের একটি ঘটনা আজও মনে আছে। যেদিন ডাক্তার হয়ে প্রথম ইমার্জেন্সিতে ডিউটি করতে যাই, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন তরুণ রোগীকে আনা হয়। বয়স আনুমানিক ৪৫ থেকে ৫০ বছর হবে। সকালে ঘুম থেকে উঠে শেভ করতে গিয়েছিলেন। হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করেন। হাসপাতালে আনার পর আমি মৃত তাঁকে রিসিভ করি। ঘটনাটি আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। এ কারণেই আমি সবাইকে অনুরোধ করি, বয়স যখন ৪০-এর আশপাশে হবে, তখন বছরে অন্তত একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। ৫০ বছর হলে বছরে দুবার এবং ৬০ বছরের বেশি হলে বছরে তিনবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা ভালো। চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে কী কী প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন?
ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া : চিকিৎসাসেবা দিতে গেলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমাদের সীমিত সম্পদ। আমরা একটি গরিব দেশের মানুষ। ইচ্ছা থাকলেও সব সময় রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। আমি প্রায় ৩৪ বছর সরকারি চাকরি করেছি। ইচ্ছা থাকলেও অনেক সময় রোগীকে প্রয়োজনীয় সব ওষুধ দিতে পারিনি। তিনটি ওষুধ প্রয়োজন হলে হয়তো একটি দিতে পেরেছি, বাকি দুটি রোগীকে কিনতে হয়েছে। আবার অনেক সময় রোগীর যে মানের ওষুধ প্রয়োজন ছিল, তার চেয়ে কম দেওয়া হয়েছে। এটি আমাদের জন্য বড় একটি প্রতিবন্ধকতা। সব প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বিনা মূল্যে করানোও সব সময় সম্ভব হয়নি। আমার মনে হয়, সরকারকে চিকিৎসার ক্ষেত্রে আরও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদেÑচিকিৎসক, নার্স, আয়া, সুপার, ওয়ার্ডবয়সহÑপ্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পদ সব সময় খালি থাকে। ফলে যারা কাজ করেন, তাঁদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। একজন বহির্বিভাগের ডাক্তারকে ১৫০ থেকে ২০০ রোগী দেখতে হয়। জরুরি বিভাগেও পর্যাপ্ত জনবল থাকে না। ৫০ শয্যার হাসপাতালে অনেক সময় ১০০ থেকে ১৫০ রোগী থাকে। ২০০ শয্যার হাসপাতালে ৩০০ থেকে ৩৫০ রোগী থাকে। বহির্বিভাগে প্রতিদিন কয়েক শ রোগী আসে। প্রয়োজন অনুযায়ী সব পদে জনবল দিতে হবে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম যথাযথভাবে সরবরাহ করতে হবে। তাহলে রোগীরা পর্যাপ্ত ও সঠিক চিকিৎসা পাবেন এবং রোগ নির্ণয়ও যথাযথভাবে করা সম্ভব হবে।
রোগমুক্ত জীবনযাপন করতে সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া : আমি সবাইকে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার অনুরোধ করব। ইসলাম মানুষের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। আমরা যদি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলি, তাহলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক জীবনের অনেক বিষয়ই সুন্দরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। পর্যাপ্ত ঘুমাবেন। রাতে কমপক্ষে ছয় থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। প্রচুর পানি পান করবেন। সবুজ ও টাটকা শাকসবজি খাবেন। ফল খাবেন। ফল বলতে শুধু আপেল বা দামি ফল বোঝায় না। আমাদের দেশে পেয়ারা, জলপাই, লেবু, কলাসহ অনেক পুষ্টিকর ফল সারা বছর পাওয়া যায়। শাকসবজি খাবেন, পর্যাপ্ত পানি পান করবেন এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলবেন। নামাজ পড়বেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লে পাঁচবার হাত-মুখ ধোয়া হয়, শরীরও নড়াচড়া করে। এটাকে এক ধরনের শারীরিক ব্যায়ামও বলা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, নামাজে আত্মার শান্তি পাওয়া যায়। যেমন এশার নামাজ পড়ার পর মনে হয়, আমি আমার দিনের কাজগুলো শেষ করে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে পেরেছি। যেকোনো কাজ করার আগে আমাদের মনে রাখা উচিতÑআমি মুসলমান, আমাকে একদিন মরতে হবে, কবরে যেতে হবে, আল্লাহর দরবারে হাজির হতে হবে এবং কেয়ামতের দিন হিসাব দিতে হবে। আমি যেন আমার দ্বারা কারও ক্ষতি না করি, বরং আমার সাধ্য অনুযায়ী মানুষের উপকার করার চেষ্টা করি। আল্লাহ যেন আমার দ্বারা কারও ক্ষতি না করেন, কারও বিন্দু পরিমাণ সম্পদও যেন নষ্ট না হয়। আমরা যদি আল্লাহকে হাজির-নাজির মনে করি এবং একদিন তাঁর দরবারে হাজির হতে হবে এই অনুভূতি আমাদের মধ্যে থাকে, তাহলে আমরা অনেক খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে পারব। আমাদের দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্র আরও ভালো হবে। মানুষ তার প্রাপ্য অধিকার সঠিকভাবে পাবে। আর শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা হাঁটবেন। প্রচুর পানি খাবেন, টাটকা শাকসবজি খাবেন এবং রাতে ছয় থেকে আট ঘণ্টা ঘুমাবেন।
অবসরে কী করেন?
ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া : আমি মূলত জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও স্থানীয় দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ পড়ি। প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় দিয়ে পত্রিকা দুটো পড়ি। আমার বাবা পত্রিকা পড়তেন, আমিও পড়ি, আমার ছেলেরাও পড়ে। এ ছাড়া রোটারীর সঙ্গে সময় দিই। রোগী দেখি। রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার চেষ্টা করি। যতক্ষণ পর্যন্ত রোগী তাঁর কথা শেষ না করেন, ততক্ষণ তাঁকে সময় দিই। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নিই। বিভিন্ন নিমন্ত্রণে যাই। সময় পেলে কিছুটা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করি। আর নিয়মিত হাঁটার চেষ্টা করি। ডা. এমজি ফারুক ভূঁইয়া পিএইচএফ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক, পেশাজীবী ও জনকল্যাণমূলক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তিনি চাঁদপুর রোটারী ক্লাবে ২০০৬-২০০৭ সালে সভাপতি ও ২০০৭-২০০৮ সালে অ্যাসিসট্যান্ট গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ফরিদগঞ্জের শহীদ হাবিব উল্যাহ উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি এবং কাউনিয়া (পশ্চিম) জামে মসজিদ ও ঈদগাহ ময়দানের সভাপতি। তিনি চাঁদপুর রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল রোগী কল্যাণ সমিতি, চাঁদপুর ডায়াবেটিক সমিতি, মাজহারুল হক বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের আজীবন সদস্য। এছাড়া বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ, চাঁদপুরের সাবেক সভাপতি ও আজীবন সদস্য এবং চাঁদপুর ক্লাবের সদস্য।








