প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২২, ০০:০০
রহমত, বরকত, মাগফেরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে মুমিনের দরবারে আবারও এসেছে আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের বসন্তকাল হিসেবে খ্যাত মহামান্বিত মাস মাহে রমজান। মহান রবের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে দিনে রোজা, রাতে নামাজ, নফল ইবাদত, দান-সদকা ও জাকাত-ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে একজন প্রকৃত মুমিন যথাযথ মর্যাদায় পালন করে থাকে মাহে রমজানের আনুষ্ঠানিকতা। মহামান্বিত এ মাসের রোজা মানুষকে ক্ষুধার যন্ত্রণা উপলব্ধি করিয়ে ক্ষুধার্তের ক্ষুধা, গরিব-দুঃখীর দুঃখ, অসহায় মানুষের অসহায়ত্বের বেধনা অনুধাবন করিয়ে শিক্ষা দেয় পারস্পারিক সম্প্রতি, দানশীলতা, উদারতা ও মিতব্যয়িতার। অর্থাৎ শুধু ভোগের মাধ্যমেই সুখ নয় বরং ত্যাগের মধ্যেও রয়েছে আত্মতৃপ্তির সীমাহীন সুখ যা বাস্তবিক অর্থেই রোজা মুমিনদেরকে উপলব্ধি করতে শিখায়। বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য দূরীকরণ, সমাজের ধনী-গরিবের আর্থসামাজিক বৈষম্য পরিহারের লক্ষ্যে ইবাদতের এ মাসে মহান রাব্বুল আলামিন দান-সদকা, জাকাত-ফিতরার মতো সুন্দরতম বিধান ও আমল দিয়েছেন মুমিনদের জন্যে। যার অনুসরণ ও অনুকরণের মাধ্যমে একজন মুমিনের পার্থিব ও পরকালীন জীবন স্বার্থক ও সুন্দর হয়ে উঠে। মানবতার সর্বত্তোম আদর্শ রাসুল (সাঃ) মাহে রমজানকে দানের মাস ও পারস্পারিক সম্প্রতির মাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মুসলিমদেরকে ভাতৃত্বের সম্প্রতি রক্ষায় একে অপরকে আর্থিক সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে উৎসাহিত করাই মাহে রমজানের অন্যতম দিক। হাদীসে বর্ণিত আছে, রাসুল নিজেই এ মাসের মহত্ত্ব বুঝানোর জন্যে অন্যান্য মাসের তুলনায় অত্যাধিক পরিমাণে দান-সদকাহ ও সহানুভূতিশীল আচরণ করতেন। কেননা কোনো মানুষের সাথে হাসিমুখে কথা বলা কিংবা সৎ উপদেশের মাধ্যমে সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়াও সদকার সওয়াবের অনুরূপ। মাহে রমজানের একটি নফল ইবাদতকে ফরজের মর্যাদায় সমুন্নত করা হয়েছে। আর একটি ফরজ আদায় করলে ৭০ থেকে ৭০০ কিংবা তারও বেশি পরিমাণ সওয়াবের কথা বলা হয়েছে হাদীসে। দানের এমন ঈর্ষান্বিত ফজিলত মাহে রমজানেই মুমিনদের জন্যে রাখা হয়েছে। তাই প্রতিটি দান-সদকা, জাকাত-ফিতরা আল্লাহর নিকট অগণিত ফরজ হিসেবে গণ্য হয়ে ইহকালীন কল্যান ও পরকালীন মুক্তি পথকে প্রশস্ত করে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, ‘মানুষের মধ্যে কল্যাণের পথে সবচাইতে বেশি দানশীল ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ)। রমজান আসলে তাঁর দানের মাত্রা এতই বেড়ে যেত যে, জিব্রাঈল আঃ রমজানের প্রতি রাতেই রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করতেন। রমজানে রাসুলের দানের উদাহরণ প্রবাহিত বায়ুর ন্যায়। বাতাস যেমন সকল কিছুকে ছুঁয়ে দেয়, তেমনি রাসুলের দানও সকলের উপর দিয়ে নির্বিশেষে বয়ে যেত।’ (সহীহ বুখারী :১৯২০)।
পবিত্র কুরআনে সালাতের পর সামর্থবানদের ওপর জাকাত আদায়কে ফরজ করা হয়েছে। ইসলামে নামাজ ও রোজাকে শারীরিক ইবাদত ও জাকাত-সদকাকে আর্থিক ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়। জাকাত হলো-সারা বছর নিজের ও পরিবারের যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে নিসাব পরিমাণ অর্থাৎ কমপক্ষে সাড়ে ৭ তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্য অথবা সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসা পণ্য থাকে, তবে তাঁর সম্পদের শতকরা আড়াই শতাংশ হিসাবে আল্লাহর নির্ধারিত খাতে অসহায়-গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বণ্টন করা। জাকাত গরিবের প্রতি ধনীর অনুগ্রহ নয়; বরং তাদের ন্যায্য অধিকার। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘তাদের (সম্পদশালীদের) ধনসম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের হক।’ (সুরা আল-জারিআত, আয়াত: ১৯) জাকাত দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়ের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রমজান মাসই জাকাত প্রদানের সর্বোত্তম সময়। বিত্তবানদেরকে দান-সদকা ও জাকাত-ফিতরা প্রদানে উৎসাহিত করা হয়েছে এ মাসে। কেননা রমজান মাসে দান-সদকা করলে অন্য সময়ের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি সওয়ার হয়। তাই রমজান মাসে রোজাদার মুমিন বান্দারা গরিবের হক দান-সদকাহ ও জাকাত-ফিতরার মত আর্থিক ইবাদত করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাকাত ও সদকাহ শ্রেষ্ঠতম উপায়। রোজাদার ধনী লোকেরা অসহায়দের জাকাত প্রদান করার ফলে সমাজের গরিব-নিঃস্ব ব্যক্তিরা দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে রেহাই পাবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতিও হবে। রমজান মাসে ধনী লোকেরা দরিদ্রদের জাকাত প্রদানের ফলে উভয় শ্রেণির মানুষের মধ্যে লেনদেন হয় এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে যার ফলে উভয়ই বেশ উপকৃত হয়। তবে দান-সদকা ও জাকাত-ফিতরা দিতে হবে মহান রবের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। তাতে থাকবে না কোনো লৌকিকতা ও সুনাম অর্জনের ইচ্ছা। দানগ্রহীতাকে দানের প্রেক্ষিতে খোঁটা দেওয়া বা দান উপলক্ষে যেকোনো ধরনের কাজ বা উদ্দেশ্য হাসিল করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে তোমাদের দানকে বাতিল করো না সে ব্যক্তির মত যে, তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও পরকালকে।’ (সূরা বাকার : ২৬৪) দান-সদকাহ এমন একটি আর্থিক আমল যা মৃত্যুর পরেও চলতে থাকে। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, ‘মানুষের মৃত্যুর পর সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। শুধু তিনটি আমল অবশিষ্ট চালু থাকে। ক. দান-সদকাহ, অর্থাৎ যা মহান রবের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য নিঃস্বার্থভাবে দেওয়া হয়। খ. ইলম, যার দ্বারা মানুষের উপকার হয়। গ. সুসন্তান, যে পিতামাতার জন্য দোয়া করে।’ (সহীহ মুসলিম)
হযরত কাআব ইবনে উজরা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসুল সাঃ বলেছেন, দান-সদকাহ পাপকে এমনভাবে নিভিয়ে দেয় যেভাবে পানি আগুন নিবিয়ে দেয়। (তিরমিজি) আর্থিক ইবাদত, অর্থপ্রদানকারী ব্যক্তির জন্যই লাভ এতে তাঁর গুনাহ মাফ হয় এবং অগনিত সওয়াব আমলনামায় জমা হয়। মহান রব আমাদেরকে আর্থিক ইবাদতে উৎসাহিত করে বলেন, যারা আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে তাদের উপমা একটি শস্য বীজের মত, যা উৎপন্ন করে সাতটি শীর্ষ, প্রতিটি শীর্ষেই (উৎপন্ন হয়)একশত করে শস্য এবং আল্লাহ যাকে চান তাঁর সম্পদ বহুগুণে বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ অতি দানশীল ও মহাজ্ঞানী।' (সূরা বাকারা:২৬১) জাকাত-সদকার মত আর্থিক ইবাদত মুমিনের বিপদণ্ডআপদ বালা-মুসিবত ও ব্যক্তির অন্তরে হাতাশা দূর করে শান্তিতে বসবাসে সহায়তা করে এবং জীবনের আয়ু বৃদ্ধি করে অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে যদি রোজাদারের অন্তরে তাকওয়া,খোদাভীরুতা,দানশীলতা ও পারস্পরিক কল্যাণকামিতার গুণাবলি সৃষ্টি না হয়, তাহলে বুঝতে হবে তার রোজা পালন নিছক উপবাস ছাড়া আর কিছুই নয়। যে ব্যক্তি শুধু রোজা পালন করে কিন্তু আল্লাহর রাস্তায় দান-সদকা, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সমাজের গরিব-দুঃখীদের অভাব দূরীকরণ তথা দারিদ্র্য বিমোচনে তার হাত সম্প্রসারিত হয় না সে রমজানের দাবি পূরণে ব্যর্থ হয় এবং রমজানের রহমত থেকেও বঞ্চিত হয়। রাসুল সাঃ বলেছেন,একজন কৃপণ ইবাদতকারীর চেয়ে একজন মূর্খ দানশীল ব্যক্তি আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। সাধারণভাবে ইসলাম আর্থিক ভারসাম্য বিধানকারী এমন একটি সফল ব্যবস্থার নাম। যেখানে আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিকে বলা হয়েছে ঘোড়ার পিঠে আরোহন করে আসা ব্যক্তি কিছু চাইলে তাকেও ফিরিয়ে না দিতে এবং ভিখারিকেও বলা হয়েছে অন্যের কাছে হাত পাতা থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকতে। অর্থাৎ দানকারী ও দানগ্রহণকারীর মাঝে ভারসাম্যতা বিধান দিয়েছে যার অনুসরণে সমাজে দারিদ্র্যতা হ্রাস পেয়ে ভাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পাবে। মাহে রমজান আমাদেরকে যতগুলো ইবাদত ও সৎ কাজ করার রাস্তা দেখায় তার মধ্যে জাকাত ও সদকাহ আদায় হলো অন্যতম। যারা প্রাচুর্য ও দুনিয়ার মোহে জীবনযাপনে ব্যস্ত তাদেরকে ক্ষুধা ও পিপাসার যন্ত্রণা বুঝিয়ে দিয়ে অসহায় মানুষদের অধিকার ও কল্যানে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করে পারস্পরিক সম্প্রতির মাস রমজান। তাই গরিব-দুঃখীদের প্রতি দানের হাত প্রসারিত করে তাদের অভাব মোচেন এগিয়ে আসা মুমিন হিসেবে আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব।
মোঃ মুরাদ হোসেন : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।