শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৪

পবিত্র ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দঃ)

মুফতি মোহাম্মদ মাছুম বিল্লাহ বাগদাদী
পবিত্র ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দঃ)

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা’য়ালার জন্য যিনি প্রিয় হাবীবের ‘মিলাদ’ তথা শুভাগমনের মাধ্যমে নবুয়তের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। অসংখ্য দুরূদ ও সালাম সেই প্রিয় নবী (দঃ) এর উপর যার পবিত্র মিলাদের বার্তাবাহক ছিলেন হযরত বাবা আদম আলাইহিস সালাম থেকে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম পর্যন্ত সকল নবী-রাসূল। মানবতার কাণ্ডারী, মুক্তির দিশারী রাহমাতুল্লিল আলামীন হযরত আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১২ই রবিউল আউওয়াল ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে সোমবার সুবহে সাদিকের সময় দুনিয়ায় শুভ আগমন করেন।

সত্যের মাপকাঠি সাহাবায়ে কেরাম থেকে বিশুদ্ধরূপে বর্ণিত হয়েছে যে, ১২ই রবিউল আউওয়াল শরীফ প্রিয় নবী হুযূর আকরাম (দঃ) এর পবিত্র শুভ আগমনের দিন। যেমন, হাফেজ আবূ বকর ইবনে আবী শায়বাহ্ (ওফাত ২৩৫ হিজরী) সহীহ সনদ সহকারে বর্ণনা করেছেন, হযরত জাবের ও হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম বলেন, রাসূলুল্লাহ (দঃ) এর বেলাদত শরীফ ঐতিহাসিক ‘হস্তি বাহিনী বর্ষের’ (যে বছর আবরাহা তার হস্তিবাহিনী নিয়ে কা’বা শরীফ ধ্বংস করতে এসে নিজে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিল)। [লুগুল আমান ফী শরহি ফাতহির রব্বানী, খ- ২, পৃষ্ঠা-১৮৯, বৈরুত;]।

জশনে জুলূস অর্থ: আরবীতে ‘জশন’ শব্দের অর্থ খুশি বা আনন্দ (লুগাতে কিশওয়ারী) ‘জুলূস’ শব্দটি ‘জলসা’ শব্দের বহুবচন, এর অর্থ হলো বসা বা উপবেশন। আর ফার্সিতে ‘জশন’ শব্দের অর্থ উৎসব, রাজকীয় অনুষ্ঠান এবং ‘জুলূস’ শব্দের অর্থ হল আড়ম্বর, মিছিল করা। (ফরহাঙ্গ-ই-রব্বানী)।

ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দঃ) অর্থ: প্রচলিত অর্থে ঈদ মানে খুশি। মিলাদ অর্থ জন্মকাল বা জন্মের সময়। মাওলিদ শব্দটিও অভিন্ন অর্থ বুঝায়। সেই হিসেবে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী অর্থ নবীর জন্মকালের খুশি, পৃথিবীতে তাঁর শুভাগমনকে উপলক্ষ করে বৈধ আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে আনন্দ উদ্যাপন করা।

জশনে জুলুস ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দঃ) উদযাপন করা একটি বৈধ ও পুণ্যময় আমল: হাদিস শরীফে আছে, হযরত নবী করীম (দঃ) বলেন- যেব্যক্তি ইসলামের মধ্যে ভাল তরিকা প্রচলন করল সে নিজের নেকী, তৎপরে যারা তদনুযায়ী আমল করল তাদের নেকী সে প্রাপ্ত হবে। তাদের নেকী হতে কিছু পরিমাণ কম করা হবে না। (মুসলিম শরীফ, মিশকাতুল মাসাবিহ পৃষ্ঠা নং ৩৩, বায়হাকী ১/৩৮৪)।

পবিত্র কুরআনের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী (দঃ): হে হাবিব! আপনি বলুন, আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তাঁরই দয়া, এবং সেটারই উপর তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিৎ। যা তাদের সমস্ত ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়। (সূরাঃ ইউনুস, আয়াতঃ ৫৮)। অত্র আয়াতের তাফসীরে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন- আল্লাহর অনুগ্রহ (ফাদ্বলুল্লাহ) দ্বারা “ইলম বা কোরআন” আর তাঁর দয়া (রাহমাতিহী) দ্বারা “হযরত মুহাম্মদ (দঃ) কে বুঝানো হয়েছে। সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর আমি আপনাকে (হুজুর আকরাম (দঃ) জগতসমূহের প্রতি কেবল রহমত রূপেই প্রেরণ করেছি। আল্লাহ বলেন, হে মানবকুল! নিশ্চয় তোমাদের নিকট আল্লাহর নিকট থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ (রাসূল) এসেছে এবং আমি তোমাদের প্রতি উজ্জল আলো অবতীর্ণ করেছি। (সূরাঃ নিসা, আয়াত-১৭৫, ৪নং সুরা ৫নং পারা)। আল্লাহ বলেন, (নিশ্চয় তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা ‘নূর’ [রাসূল (দঃ)] এবং স্পষ্ট কিতাব (কুরআন) এসেছে, নূর দ্বারা হযরত মুহাম্মদ (দঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ বলেন, তিনিই হন, যিনি আপন রাসূলকে পথ-নির্দেশ ও সত্য দ্বীন সহকারে প্রেরণ করেন। (সূরাঃ তাওবা, আয়াত-৩৩, ৯নং সুরা, ১০ পারা)।

তিনি আরো বলেন, নিশ্চয় তোমাদের নিকট তাশরীফ আনয়ন করেছেন তোমাদের মধ্য থেকে ঐ রাসূল, যাঁর নিকট তোমাদের কষ্টে পড়া কষ্টদায়ক, তোমাদের কল্যাণ অতিমাত্রায় কামনাকারী, মুসলমানদের উপর পূর্ণ দয়ার্দ্র, দয়াময়। (সূরা-তাওবা, আয়াত-১২৮, ৯নং সুরা, ১১ পারা)। এবং স্মরণ করুন! যখন মারিয়াম-তনয় ঈসা বললো, ‘হে বনী ইস্রাঈল! আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহরই রাসূল; আমার পূর্বেকার কিতাব সত্যায়নকারী এবং সম্মানীত রাসূলের সুসংবাদদাতা হয়ে, যিনি আমার পরে তাশরীফ আনবেন, তাঁর নাম হবে ‘আহমদ’। (সূরাঃ সাফ্ফ, আয়াত-৬, ৬১নং সুরা ২৮ পারা)। নিশ্চয় আল্লাহর মহান অনুগ্রহ হয়েছে মুসলমানদের উপর যে, তাদেরই মধ্যে থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং তাদেরকে পবিত্র করেন। এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দান করেন এবং তারা নিশ্চয় এর পূর্বে স্পষ্ট গোমরাহীতে ছিল। (সূরাঃ আল্ ইমরান, আয়াত-১৬৪, ৩নং সুরা ৪ পারা) । সুতরাং উপরোক্ত আয়াতে কারীমাতে কোনটিতে প্রত্যক্ষভাবে আবার কোনটিতে পরোক্ষভাবে নবীজির মিলাদের কথা বলা হয়েছে।

পবিত্র হাদিসের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী (দঃ): হযরত আবু কাতাদা আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ (দঃ) -কে সোমবারে রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি ইরশাদ করেন- সোমবারে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং সোমবারই আমার প্রতি ওহী নাজিল করা হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের আওলাদ হতে ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে নির্বাচন করেছেন এবং ইসমাঈল আলাইহিস সালাম হতে কেনানাহকে নির্বাচন করেছেন এবং কেনানার বংশ হতে কুরাইশ, কুরাইশের বংশ হতে হাশেমকে নির্বাচন করেছেন আর আমাকে হাশেমের আওলাদ হতে নির্বাচন করেছেন। পবিত্র রবিউল আউওয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার সুবহে সাদিকের সময় সৃষ্টির মূল তথা হুজুর পাক (দঃ) এই দুনিয়াতে শুভাগমন করেছেন। প্রিয় নবীজির শুভাগমনের আলোচনা তিনি নিজেই সাহাবায়ে কিরামের সাথে বর্ণনা করতেন।

সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেঈগণের দৃষ্টিতে ঈদে মিলাদুন্নবী (দঃ): হুজুর পাক (দঃ) তাবুকের যুদ্ধ হতে ফিরে আসলে, তাঁর চাচা হযরত আব্বাস (রাঃ) আরজ করলেন, হুজুর আপনার প্রশংসাসূচক মিলাদ বয়ান করে আমি একটি কসীদা পড়ব। তখন হুজুর (দঃ) ইরশাদ করলেন, আপনি বলুন! আল্লাহ পাক যেন আপনার মুখ ভেঙ্গে না দেন। তখন হযরত আব্বাস (রাঃ) বলেন- ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার যখন শুভাগমন, তখন আপনার নূরের আলোতে সমগ্র আসমান-জমিন আলোকিত হয়ে গেল।

হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, একদা তিনি হুজুর পাক (দঃ) এর সাথে হযরত আমের আনসারী (রাঃ) এর ঘরে গিয়েছিলেন। তখন হযরত আমের আনসারী (রাঃ) তাঁর সন্তানদের ও তাঁর স্বগোত্রীয় লোকদের সাথে নিয়ে হুজুর পাক (দঃ) এর জন্মবৃত্তান্ত আলোচনা করছিলেন এবং বলছিলেন, এই দিনটি, এই দিনটি তখন হুজুর পাক (দঃ) ইরশাদ করলেন- হে আমের আনসারী! নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা তোমার জন্য রহমতের দরজাসমূহ খুলে দিয়েছেন। আর ফিরিশতাগণ তোমার জন্য শাফা’আত কামনা করেছে। তাছাড়া যারা তোমার মতো আমার জন্মবৃত্তান্ত বর্ণনা করবে, (অর্থাৎ মিলাদ পাঠ করবে তারা) তারা তোমার মতো নাজাত লাভ করবে। (আত্ব তানবীর ফি বাশির ওয়ান নাজির, ফতোয়ায়ে আযীজিয়া)। আরব তথা বিশ্বনন্দিত গীতি কবিতা গাইলেন কা’ব বিন জুহাইর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু: নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল (দঃ) যার আলোক প্রভা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আল্লাহর তরবারীসমূহের মাঝে তিনি তীক্ষè কোষমুক্ত তরবারী। (মাওয়াহিব, বেদায়া ও নেহায়া)।

তাবেঈগণের দৃষ্টিতে ঈদে মিলাদুন্নবী (দঃ) : হযরত হাসান বসরী (র) বলেন, যদি আমার কাছে উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকতো, তাহলে আমি সম্পূর্ণভাবে মিলাদুন্নবী (দঃ) মাহফিলে খরচ করতাম। (আন্ নিয়ামাতুল কুবরা আলাল আলম পৃ-০৮)। হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন (রাঃ) বলেন, হুজুর পাক (দঃ) অন্ধকার যুগের অবৈধ জন্মের সামান্যতম বংশ স্পর্শ করেনি। পূতঃপবিত্র হিসেবে উত্তম ব্যক্তিদের মাধ্যমে দুনিয়াতে আগমন করেন।

ইমাম বাকের (রাহঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, হুজুর পাক (দঃ) গর্ভাবস্থায় হযরত মা আমেনা (রাঃ)-কে স্বপ্নের মধ্যে নির্দেশ দেওয়া হল, গর্ভের মধ্যে যে নবীর শুভাগমন হয়েছে, ঐ নবীর নাম রাখবেন ‘আহমদ’ তথা অধিক প্রশংসিত। (সিরাতে হালাভীয়া খন্ড-১ম পৃ-৭২)।

ইমাম আবু হানিফা (রাহঃ) আনহু কর্তৃক মিলাদুন্নবী (দঃ) পালন, তিনি বলেন: হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম আপনার আগমনের সুসংবাদ নিয়ে এসেছিলেন। তিনি আপনার সৌন্দর্য আর উচ্চমর্যাদার প্রশংসা করেছিলেন। (কসীদায়ে নুমানে পৃ-০৭)।

ওলামায়ে কেরামের মিলাদুন্নবী (দঃ) উদযাপন: যুগে যুগে ওলামায়ে কেরামগণ পবিত্র ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দঃ) সম্পর্কে এত দীর্ঘ আলোচনা করে গেছেন । সুফি আবু ইসহাক ইবরাহীম বিন আব্দুর রহীম বিন জামায়াহ্ আলাইহির রাহমাহ যখন মদিনা শরীফে ছিলেন, তখন তিনি মিলাদুন্নবী উদযাপন উপলক্ষে খাবার তৈরী করে মানুষদেরকে খাওয়াতেন আর বলতেন- আমার পক্ষে যদি সম্ভব হত, তাহলে পুরো মাস জুড়ে মিলাদুন্নবী (দঃ) উদযাপন করতাম।

আমি মোল্লা আলী ক্বারী বলেন, আমি যেহেতু (ইবনে জামায়াহর মত সম্পদ ব্যয় করে) যিয়াফত করতে অক্ষম, সেহেতু (ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনে) এ ক’টি পৃষ্ঠা লিখলাম, যাতে এগুলো এমন অপ্রকাশ্য যিয়াফত হয়ে যায়, যা শুধু মাস বা বছর নয়; বরং যুগ যুগ ধরে চলমান থাকবে। আর এ (পৃষ্ঠাগুলোর) নাম রাখলাম , আল-মাওরিদুর রবী ফি মাওলিদিন্ নবী।

ইমাম সুয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মৌলিকভাবে মিলাদুন্নবী (দঃ) এর আনন্দ উদ্যাপনার্থে সম্মেলন তথা জুলূস করা মুস্তাহাব এবং ইবাদত। শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হুজুর (দঃ) এর পবিত্র বেলাদতের মাসে মিলাদ-মাহফিলের আয়োজন সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সর্বদাই পালিত হয়ে আসছে। ঐ মাসের রাত্রিতে দান-সদকা করে আনন্দ প্রকাশ করা এবং ঐ স্থানে বিশেষভাবে রাসূলে কারীম (দঃ) এর আগমনের উপর প্রকাশিত বিভিন্ন ঘটনাবলীর বর্ণনা করা মুসলমানদের বিশেষ আমল সমূহের অন্তর্ভুক্ত।

ইবনে হাজর আসকালানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, বুখারী ও মুসলিম শরীফের মজবুত দলীলের উপর ভিত্তি করে পবিত্র ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দঃ) এর বৈধতার মাসআলা প্রমাণ করা আমার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। ইমাম নববী রহমাতুল্লাহি আলাইহির ওস্তাদ আল্লামা আবু শামাহ্ রহমাতুল্লাহি আলাইহি কিতাবে লিখেছেন, মিলাদুন্নবী (দঃ) মাহফিলে ভাল কাজ করা মুস্তাহাব। মোল্লা আলী ক্বারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সব দেশের ওলামা-মাশায়েখ মাহফিলে মিলাদে মোস্তফা (দঃ) ও উহার সমাবেশকে এতই তা’জিম করেন যে, কেহই অংশগ্রহণ করতে অস্বীকার করেন না। এতে শরীক হওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এই মোবারক মাহফিলের বরকত হাসিল করা।

শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি স্বীয় পিতা হযরত শাহ আব্দুর রহীম দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর সূত্র উল্লেখ করে বলেন, আমি প্রতি বছর হুজুর (দঃ) এর মিলাদ-মাহফিলে খানার ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু এক বছর আমি খাবার জোগাড় করতে পারিনি। তবে কিছু ভূনা করা চনাবুট পেয়েছিলাম। অতঃপর আমি তা মিলাদে আগত মানুষের মধ্যে বণ্টন করে দিলাম। পরে আমি স্বপ্নে হুজুর (দঃ) কে বড়ই খোশহালে তাশরিফ আনতে দেখলাম এবং তার সামনে মওজুদ রয়েছে উক্ত চনাবুট (যা আমি মাহফিলে বণ্টন করেছিলাম)।

‘রুহুল বয়ান’ গ্রন্থাকার আল্লামা ইসমাঈল হক্কী আলাইহির রাহমাহ বলেন, শরীয়তে নিষিদ্ধ নয় এমন কাজ দ্বারা মিলাদুন্নবী উদযাপন করা রাসূলুল্লাহকে সম্মান করার নামান্তর। ইমাম সুয়ূতী কুদ্দিসা সিররুহু বলেন- মিলাদুন্নবী (দঃ) এর জন্য শোকরিয়া জ্ঞাপনের বহিঃপ্রকাশ করা আমাদের জন্য মুস্তাহাব।’ কিতাব: রূহুল বায়ান ফী তাফসীরিল কুরআন।

আহলে হাদিসের ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, আমি ইতোপূর্বে আলোচনা করছি যে মিলাদকে মানুষেরা মৌসুমীভাবে পালন করে তা’জিম করে থাকে, এতে তাদের অনেক সাওয়াব হবে। আর এটাও সুস্পষ্ট যে, কিছু লোক এটাকে হাসান মনে করে, কারণ সঠিক মু’মিন ব্যক্তি মন্দ কাজ করে না। (ইবনে তাইমিয়া, একতেদ্বাউল সিরাতাল মুস্তাকিম ২/১২৬ পৃ. দারুল আ’লামুল কিতাব, বয়রুত, লেবানন)।

হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজের মক্কী দেওবন্দী বলেন, আমাদের আলেমগণ মওলুদ শরীফ নিয়ে অনেক ঝগড়া করে থাকে। এরপরেও আলেমগণ কিন্তু জায়েযের পক্ষে মত ব্যক্ত করেছেন। যখন জায়েযের ছুরত রয়ে গেছে, তো এত বাড়াবাড়ির কি প্রয়োজন। আমাদের জন্য হারামাঈনের অনুসরণ করাই যথেষ্ট। (হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কী, কুল্লিয়াতে এমদাদিয়া, ২০৭পৃ. ফয়সালায়ে হাফতে মাসায়েল, ৭-৮ পৃ.)।

নবীজী (দঃ) এর আগমনের প্রাক্কালে আজিমুশ্শান মিলাদুন্নবী আয়োজন: উক্ত প্রমাণাদিই ঈদে মীলাদুন্নবী (দঃ) পালনের স্বপক্ষে জোরালো দলীল। উল্লেখ্য, মু’মিনের ঈদ মাত্র দু’টি নয়, ঈদ মোট ৯টি। যথা: (১) ঈদে রামাদ্বান, (২) ঈদে কোরবান, (৩) ঈদে আরাফা, (৪) ঈদে জুমআ, (৫) ঈদে শবে বারাআত, (৬) ঈদে শবে ক্বাদর, (৭) ঈদে আশুরা, (৮) ঈদে নুযুলে মায়েদা এবং (৯) ঈদে মীলাদুন্নবী। সবগুলোই কোরআনে, হাদীসে ও বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ আছে।

সর্বোপরি, নবী করীম (দঃ) এর প্রেমে উজ্জীবিত হয়ে সত্যিকার মু’মিন মুসলমানে পরিণত হওয়ার দৃপ্ত শপথ নিয়ে প্রিয় নবী (দঃ) এর কাছে নিজের জীবনকে বিলীন করার মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি লাভ করার একমাত্র দিন ১২ রবিউল আউওয়াল। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন প্রিয় নবীর গোলামীর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমিন! বিহুরমাতি সাইয়িদিল মুরসালিন (দঃ)।

লেখক : মুহাদ্দিস দাসাদী ডি.এস.আই.এস স্নাতকোত্তর কামিল (এম.এ) মাদ্রাসা, চাঁদপুর। এমফিল গবেষক কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়