শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪১

শ্যাওড়া গাছের ভূত

সাঈদুর রহমান লিটন
শ্যাওড়া গাছের ভূত

আমার বড় ভায়ের শ্বশুরবাড়ি ধর্মসী গ্রামে। বড় ভায়ের ছেলের সুন্নাতে খাতনার দাওয়াতে সপরিবারে সেখানে গিয়েছিলাম। আমাদের গ্রাম থেকে বড়জোর দুই কিলোমিটার দূরে হবে ধর্মসী। মাঝখানে বিস্তীর্ণ ফাঁকা মাঠ, আর সেই মাঠ চিরে চলে গেছে একটিমাত্র সরু কাঁচা রাস্তা। দিনের বেলা রাস্তা আর মাঠ খুব স্বাভাবিকই লাগে, কিন্তু রাত নামলেই জায়গাটার রূপ বদলে যায়। ফাঁকা মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল শ্যাওড়া গাছ। এত পুরোনো যে তার বয়স কেউ বলতে পারে না। গ্রামের বুড়োরা বলে, তাদের দাদুর দাদারাও নাকি গাছটাকে এমনই দেখেছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা গাছটিকে দেবতার আসন মনে করে পূজা করে। গাছের গোঁড়ায় অসংখ্য সিঁদুরের দাগ, কাণ্ড বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে গাছটা যেন রক্তে রাঙানো। কিন্তু শুধু পূজাই নয়, এই গাছ নিয়ে ভয়ংকর গল্পও প্রচলিত। কেউ বলে এখানে আত্মারা থাকে, কেউ বলে দুপুরবেলা কিংবা গভীর রাতে একা পার হলে আর ফিরে আসা যায় না। দাদা-দাদীরা কড়া করে নিষেধ করত, শ্যাওড়া গাছটার পাশ দিয়ে একা যাস না। সেদিন দাওয়াত শেষে সবাই দিন থাকতে থাকতে ফিরে আসে। কিন্তু আমার খাবার পরিবেশনের দায়িত্ব পড়ায় দেরি হয়ে যায়। রাত প্রায় এগারোটা। সবাই নিষেধ করেছিল থেকে যেতে, কিন্তু আমি কারও কথা শুনিনি। মনে মনে ভেবেছিলাম, ভূত-প্রেত তো বিশ্বাস করি না, ভয় পাব কেন?

ভর জোছনার রাত। চাঁদের আলোয় রাস্তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শুরুতে কোনো অস্বস্তি লাগেনি। হাঁটতে হাঁটতে যখন শ্যাওড়া গাছের কাছাকাছি চলে এলাম, তখন হঠাৎ গায়ের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শুরু হয়ে গেল। চারপাশে তাকালামÑকাউকে দেখা যাচ্ছে না। বাতাসও থমকে গেছে।

ঠিক তখনই,

হিহিহিহি

একটা চিকচিক করা হাসির শব্দ। যেন খুব কাছে, অথচ কাউকে দেখা যায় না।

আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। গাছটার দিকে তাকালাম ভয়ে ভয়ে। নিজেকে বুঝালাম, নিশ্চয়ই কোনো মানুষ। গলা শক্ত হয়ে এলেও জিজ্ঞেস করলাম,

কে আছেন?

কোনো উত্তর নেই। চারপাশ নিস্তব্ধ।

ভয়ে ভয়ে আবার হাঁটা দিলাম। দুই কদম যেতেই আবার সেই হাসি, এবার আরও জোরে,

হিহিহিহিহি

মাথার ভেতর যেন কেউ হাতুড়ি মারছে। শরীরের সব লোম খাড়া হয়ে গেল। তখনই মনে পড়ল গ্রামের সেই গল্পগুলো। যদিও বিশ্বাস করি না, তবুও গলা শুকিয়ে কাঠ। হঠাৎ আমার গায়ে ঠাণ্ডা পানি পড়ল। জামা ভিজে গেল। মনে পড়ল, পেত্নীরা নাকি এমন করে। ভয় এতটাই চেপে ধরল যে চোখ বুজে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। শ্যাওড়া গাছ তখন আমার থেকে হাত দশেক দূরে। মনে হচ্ছিল গাছটা আমার দিকে ঝুঁকে আসছে। মনে মনে যা পারি দোয়া-দরুদ পড়তে লাগলাম। ঠিক তখনই মনে হলো গাছের ভেতর থেকে কিছু একটা উড়ে গেল। ভাবলাম বাদুড় হবে। ভয় একটু কমল। দুই কদম এগোতেই, কে যেন আমার পাশ দিয়ে খুব দ্রুত হেঁটে গেল। সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড গরম বাতাস আমার শরীর ছুঁয়ে গেল। যেন আগুনের ঝাপটা। শরীর অবশ হয়ে এল। আবার সেই হাসি। এবার আর হাসি নয়, গগনবিদারী বিকৃত শব্দ। কান ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে। চোখ খুলতে পারছি না। মনে হচ্ছে শ্যাওড়া গাছটা নড়ছে, কাণ্ডের ভেতর থেকে শব্দ আসছে খড়খড়...খড়খড়...

হঠাৎ কানে ফিসফিস করে কেউ বলল,

এতদিন পর মানুষ

তারপর আর কিছু মনে নেই।

জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি বাড়িতে শুয়ে আছি। চারপাশে লোকজন। কেউ পানি দিচ্ছে, কেউ কপালে হাত বুলাচ্ছে। সবাই বলল, তারা নাকি আমাকে শ্যাওড়া গাছের নিচে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছে।

আমি কথা বলার শক্তি পাচ্ছিলাম না। শুধু চোখ বন্ধ করলেই সেই গাছটা দেখিÑলাল সিঁদুরে রাঙানো কাণ্ড, আর তার ফাঁক থেকে বের হওয়া বিকৃত হাসি।

আজও রাতে একা হাঁটতে গেলে দূর থেকে যদি হিহিহি শব্দ শুনি, বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়