প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৬, ০০:৫০
আগুনের রায়

শহরটাকে আগে মানুষ চিনতো নদীর জন্য, সবুজের জন্য, সন্ধ্যার আজানের শান্ত সুরের জন্য। এখন শহরটাকে চেনা যায় আগুনের জন্য। কেউ বলে প্রতিবাদ, কেউ বলে প্রতিশোধ, কেউ বলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা। কিন্তু আগুনের ভাষা সব জায়গায় এক।
মহল্লার পুরোনো বটগাছের নিচে প্রতিদিনের আসর বসতো। আড্ডা হতো। সেখানে হাজী করিমউদ্দিন, সবাই যাকে “মুরুব্বি” বলে, তার কণ্ঠে যেন ছিল ফতোয়ার দৃঢ়তা। তিনি বললে অনেকে মাথা নেড়ে সায় দিত।
একদিন খবর এলো, শহরের প্রান্তে একটি মাজার ভাঙা হয়েছে। মুরুব্বি চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন, ভালো হয়েছে। ওসব ভাঙা দরকার ছিল। সেখানে অনেকে পাপ কাজ করে। কেউ বললো, ঠিক কথা। কেউ চুপ করে রইলো। বটগাছের ছায়া একটু ঘন হয়ে এলো।
তারপর এক বিকেলে গুজব ছড়ালো। একজন লোক ফ্যাসিস্ট। উৎসুক জনতা তাকে ধরে রাস্তায় ফেলে পিটিয়ে মারলো। মোবাইলে ভিডিও ঘুরলো। রক্তের ওপর দঁাড়িয়ে কেউ স্লোগান দিলো। মুরুব্বি ভিডিও দেখে বললেন, “দেশ বঁাচাতে কঠোর হতে হয়।”
রাশেদ নামের এক তরুণ সাহস করে বললো, চাচা, বিচার তো আদালতে হয়? মুরুব্বি হেসে বললেন, আইন দিয়ে ওদের দমন করা যায় না। জনতার রায়ই শেষ রায়। শহর সেই রায় শিখে নিলো। অভিযোগ মানেই দণ্ড। গুজব মানেই সত্য। উত্তেজনাই আইন।
এক সকালে আগুন ছড়িয়ে পড়লো আরেক ভবনে, একটি পত্রিকা অফিসে। কারণ তারা নাকি ‘ভুল’ লিখেছে। কালি, কাগজ, শব্দÑসব জ্বলছে। ধেঁায়া উঠে যাচ্ছে আকাশে। মুরুব্বি বললেন, “এই আগুন আরও আগেই দেওয়া দরকার ছিল।” তার চোখে কোনো দ্বিধা ছিল না।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো। স্ক্রিনে লেখাÑআরিয়ান। তার একমাত্র ছেলে। মায়ের মৃত্যুর পর যাকে তিনি বুকের ভেতর রেখে বড় করেছেন, যে কখনো বাবার সামনে তর্ক করেনি।
হ্যালো, বাবা...
ওপাশে কাশি। আগুনের দাউদাউ দমকা শব্দ। মানুষের চিৎকার।
বাবাৃ আমিৃ আমি আগুনে আটকে গেছিৃ
মুরুব্বির বুকের ভেতর বজ্র পড়লো। তিনি বললেন, কোথায় তুই?
ওপাশ থেকে ভাঙা কণ্ঠ, এই পত্রিকা অফিসেৃ আজ ইন্টারভিউ ছিলৃ বাবাৃ আমি শুধু চাকরি চাইছিলামৃ খুব গরমৃ শ্বাস নিতে পারছি না...
হঠাৎ লাইন কেটে গেল।
মুরুব্বি ছুটলেন, রাস্তার ভিড় ঠেলে। মানুষ তখনও স্লোগান দিচ্ছে। কারো চোখে উল্লাস, কারো হাতে মোবাইল। ভবনটা জ্বলছে। আগুনের শিখা জানালায় দঁাড়িয়ে যেন হাসছে।
তিনি চিৎকার করলেন, ভেতরে আমার ছেলে!
কেউ শুনলো না। আগুনের শব্দ সব ঢেকে দিল।
হাসপাতালের করিডোরে রাত নামলো। স্ট্রেচারে ঢাকা এক শরীর, সাদা কাপড়ে মোড়া। চেনা যায় না মুখ, কিন্তু নাম লেখাÑআরিয়ান করিম। ডাক্তার ধীরে বললো, আমরা চেষ্টা করেছিৃ কিন্তু দগ্ধের পরিমাণ বেশি ছিল।
মুরুব্বির কানে শব্দ ঢুকলো না। শুধু মনে পড়তে লাগলো তার নিজের বাক্যগুলোÑ“ভালো হয়েছেৃ মারুকৃ আইন দিয়ে দমন করা যায় নাৃ আগেই আগুন দেওয়া দরকার ছিলৃ”
আজ আগুন তার দরজায় রায় দিয়ে গেছে।
তিনি কাপড় সরিয়ে ছেলের পোড়া হাতটা ধরলেন। সেই হাত, যে হাত ছোটবেলায় তার আঙুল অঁাকড়ে ধরতো, এখন নিথর। মুরুব্বির ঠেঁাট কঁাপলো। তিনি বললেন, “আমি তোকে আগুনের শহরে বড় করিনি আমি তোকে আগুনে সঁপে দিয়েছি”
তার চোখে তখন কোনো স্লোগান নেই, কোনো মতাদর্শ নেই, শুধু পিতৃত্বের ভস্ম।
তারপর থেকে বটগাছের নিচে কেউ তাকে কথা বলতে দেখেনি। তিনি বসেছিলেন, কিন্তু নীরব। লোকজন অপেক্ষা করছিলÑআজ কী বলবেন মুরুব্বি?
তিনি শুধু বললেন, আগুনকে যারা হাততালি দেয়, আগুন একদিন তাদের ঘর চিনে নেয়। মব কখনো ন্যায় আনে না, সে শুধু শ্মশান বানায়।
তারপর মাথা নিচু করে বসে রইলেন। বটগাছের পাতা ঝরছিল ধীরে ধীরে, যেন শহরের ওপর নীরব শোক। শহর আবারও উত্তেজিত হলোÑনতুন গুজব, নতুন স্লোগান।
কিন্তু এক বাবা জানেন, জনতার রায় নয়, সবচেয়ে কঠিন রায় দেয় আগুন। আর সেই রায়ে তার একমাত্র সন্তান আজ ছাই।








