শুক্রবার, ০৬ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   ফরিদগঞ্জ উপজেলার চান্দ্রা বাজার এলাকায় ট্রাক থেকে মালামাল নামাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শ্রমিকের মৃত্যু
  •   কচুয়ায় পুকুরে ডুবে শিশুর মৃত্যু
  •   মতলব উত্তরে ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ডের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০৯

রমাদানের শেষ দশকের গুরুত্ব ও মু’মিনের করণীয়

নূর মোহাম্মদ
রমাদানের শেষ দশকের গুরুত্ব ও মু’মিনের করণীয়

প্রয় মুসলিম উম্মাহ! রমদানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো শেষ দশ রাত। এ মাসের প্রথম দশ দিনে আল্লাহর রহমতে বান্দা নিজেকে সিক্ত করে নেয়, দ্বিতীয় দশ দিনে ক্ষমা লাভের মাধ্যমে নিজেকে পাপ মুক্ত করে নেয়, আর শেষ দশ দিনে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার সুযোগ লাভ করে। এ জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদানের শেষ দশকের উপর সবচেয়ে বেশী গুরুত্বারোপ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদানের প্রথম ২০ রাতে কিয়ামুল্লাইল করার আগে বা পরে কিছু সময় ঘুমাতেন। কিন্তু রমাদানের শেষ দশ রাতে তিনি প্রায় সারারাত জাগ্রত থেকে কিয়ামুল্লাইল ও অন্যান্য ইবাদতে রত থাকতেন। এমনকি শেষ দশ রাতে তিনি তাঁর পরিবার-পরিজনকেও জাগিয়ে দিতেন। মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা বলেন, “যখন রমাদানের শেষ দশ রাত এসে যেত তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাত্রি জাগরিত থাকতেন, তঁার পরিবারের সদস্যদেরকে জাগিয়ে দিতেন, তিনি অত্যন্ত উদ্দীপনার সাথে ইবাদত-বন্দেগীতে রত থাকতেন এবং সাংসারিক, পারিবারিক বা দাম্পত্য কাজকর্ম বন্ধ করে দিতেন।” (সহীহ বুখারী ২/৭১১)।

মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহাএর সূত্রে ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রহ.) আরেকটি হাদিস বর্ণনা করেছেন, যখন রমদানের শেষ দশ দিন আসত, তখন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিধেয় বস্ত্রকে শক্ত করে বাঁধতেন, রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং পরিবার পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন। (বুখারী ও মুসলিম) কারণ রমাদানের শেষ দশকেই রয়েছে উম্মতে মুহাম্মদীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দেয়া সবচেয়ে বড় নেয়ামত, মহিমান্বিত কদরের রাত। যা হাজার মাসের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তাই নয়, এ রাত্রে কিয়ামুল্লাইল বা তাহাজ্জুদে জাগ্রত থাকলে আল্লাহ তা’আলা পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিশ্বাস ও ইহতিসাবসহ লাইলাতুল কদরে কিয়ামুল্লাইল বা তাহাজ্জুদে জাগ্রত থাকে আল্লাহ তা’আলা তার অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন। (সহীহ বুখারী ২/৬৭২)

তেমনিভাবে যে কদরের রাতের ফযিলত থেকে বঞ্চিত হবে, সে প্রকৃতই হতভাগা বলে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমাদের নিকট রমাদান উপস্থিত হয়েছে, যা একটি বরকতময় মাস। তোমাদের উপর আল্লাহ তা’আলা অত্র মাসের সাওম ফরজ করেছেন। এ মাসের আগমনে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, অবাধ্য শয়তানদের গলায় লোহার বেড়ি পরানো হয়। এ মাসে একটি রাত রয়েছে যা এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাত্রের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেলো সে প্রকৃত বঞ্চিত রয়ে গেলো। (নাসাঈ)

হযরত কা’ব ইবনে উযরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) সবাইকে মিম্বরের কাছে গিয়ে বসতে বললেন। আমরা গিয়ে বসলাম। তিনি প্রথম সিঁড়িতে উঠার সময় বললেন ‘আমিন’। দ্বিতীয় সিঁড়িতে উঠার সময় বললেন ‘আমিন’। অতপর তৃতীয় সিঁড়িতে উঠার সময় বললেন ‘আমিন’। এবার রাসূল (সা.) মিম্বর হতে নামার পরে আমরা বললাম, আজকে আমরা আপনাকে এমন কিছু বলতে শুনলাম যা আগে কখনও শুনিনি। তখন রাসূল (সা.) বললেন, জিবরাইল (আ.) আমার কাছে আসার পর বললেন, ঐ ব্যক্তি ধ্বংস হোক-যে রমজান পাওয়ার পরও তার গুনাহ মাফ হয়নি। তখন আমি বললাম ‘আমিন’। আমি দ্বিতীয় সিঁড়িতে উঠার পর তিনি বললেন-ঐ ব্যক্তি ধ্বংস হোক যার কাছে আপনার কথা আলোচনা হওয়ার পরও সে দরুদ পড়ে না, তখন আমি বললাম ‘আমিন’। আমি তৃতীয় সিঁড়িতে উঠার পর তিনি বললেন-ঐ ব্যক্তি ধ্বংস হোক যে তার পিতা-মাতাকে বা একজনকে পেয়েও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারলো না, আমি বললাম ‘আমিন’ (আল মুজামুল কাবির-৩১৫)।

হযরত সালমান ফারসি (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবানের শেষ দিন আমাদেরকে একটি ভাষণে বললেন, হে লোক সকল! তোমাদের কাছে একটি মহান ও বরকতময় মাস আগমন করেছে। এই মাসে একটি রাত আছে, যা হাজার রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এ মাসের রোজাকে আল্লাহ ফরজ করেছেন আর রাতে নামাজ পড়াকে করেছেন নফল। কেউ এ মাসে একটি নফল আদায় করলে অন্য সময়ের ফরজ আদায়ের সওয়াব পাবে। আর একটি ফরজ আদায় করলে অন্য সময়ের ৭০টি ফরজ আদায়ের সমান হবে। এ মাস ধৈর্যের মাস, আর ধৈর্যের প্রতিদান হলো জান্নাত। এটা সমবেদনার মাস। এ মাসে মু’মিনের রিজিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করায় তাহলে এ কারণে তার গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি পাবে। এমন রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব তাকে দেওয়া হবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আমাদের সবাইতো রোজাদারকে ইফতার করানোর সামর্থ রাখে না। তখন রাসূল (সা.) বললেন, কেউ এক ঢোক দুধ, একটি খেজুর অথবা শুধু পানি দ্বারা ইফতার করালেও আল্লাহ তা’আলা তাকে এ পরিমাণ সওয়াব দিবেন। আর কেউ যদি রোজাদারকে তৃপ্তি সহকারে খাওয়ায় তাহলে আল্লাহ তা’আলা তাকে হাউজে কাউসার হতে পান করাবেন। আর সে জান্নাতে প্রবেশ করানোর আগে পিপাসার্ত হবে না। এ মাসের প্রথমাংশ রহমত, দ্বিতীয়াংশ মাগফিরাত আর শেষাংশ জাহান্নাম হতে মুক্তির। যে ব্যক্তি এ মাসে তার কর্মচারীদের উপর দয়া করবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন এবং জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ দিবেন (সহিহ ইবনে খুজাইমা-১৮৮৭)।

নিম্নে শেষ দশকে একজন মুমিনের করণীয় তুলে ধরা হলো-

১. লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান:

রমাদানের শেষ দশ রাতের মধ্যেই রয়েছে, ‘লাইলাতুল ক্বাদর’ বা তাকদীর, মর্যাদা বা ভাগ্যের রাত। ইমাম বাইহাকীর মতে, লাইলাতুল কাদর এর অর্থ হলো, এ রাত্রিতে আল্লাহ তা’আলা পরবর্তী বছরে ফেরেশতাগণ মানুষের জন্য কি কি কর্ম করবেন তা নির্ধারণ করে দেন। (বাইহাকী, শুআবুল ইমান ৩/৩১৯)

আল্লাহ তা’আলা মুসলিম উম্মাহকে মর্যাদাপূর্ণ এরাত দান করে অনুগ্রহ করেছেন, আল্লাহ তা’আলা বলেন,‘নিশ্চয়ই আমি কুরআন এক বরকতপূর্ণ রাতে অবতীর্ণ করেছি; নিশ্বয়ই আমিই ভয় প্রদর্শনকারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করা হয়। সকল কর্ম আমার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে;সকল কর্ম আমি প্রেরণকারী। (হে নবী) এটা আপনার রবের পক্ষ থেকে অনুগ্রহস্বরূপ। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। তিনি আসমান ও জমিন এবং উভয়ের মধ্যস্থিত সবকিছুর পালনকর্তা। তিনি ছাড়া কোন মা’বুদ নেই। তিনি জীবন মৃত্যু দান করেন। আর তিনি আমাদের ও তোমাদের পূর্ব পুরুষদের পালনকর্তা। (সূরা দোখান: ৩-৮)।

মহান আল্লাহ এ রাতের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। এতে অত্যধিক কল্যাণ, বরকত ও মর্যাদা রয়েছে। নিশ্চয়ই এ বরকতময় কুরআন উক্ত রাতেই নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এ কুরআন ক্বদরের রাতে নাযিল করেছি। হে নবী! আপনি জানেন, লাইলাতুর ক্বদর কি? যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম রাত। এ রাতে ফেরেশতা ও রূহ আল্লাহর অনুগ্রহে প্রত্যেক বিষয়ে শান্তির বাণী নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। আর ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। (সূরা ক্বদর)।

চলবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়