শনিবার, ০৭ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   ফরিদগঞ্জ উপজেলার চান্দ্রা বাজার এলাকায় ট্রাক থেকে মালামাল নামাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শ্রমিকের মৃত্যু
  •   কচুয়ায় পুকুরে ডুবে শিশুর মৃত্যু
  •   মতলব উত্তরে ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ডের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০৫

রমজানে করণীয় ও বর্জনীয়

মুফতি মুহা. আবু বকর বিন ফারুক
রমজানে করণীয় ও বর্জনীয়

রমজান মাস আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য এক অনন্য নেয়ামত, রহমত ও আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণকাল। এ মাসেই কুরআন নাজিল হয়েছে, এ মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আল্লাহ বলেন, রোজা ফরজ করা হয়েছে যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো (সূরা বাকারা: ১৮৩)। অর্থাৎ রমজানের মূল লক্ষ্য কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করা নয়; বরং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা, চরিত্রকে গঠন করা এবং আল্লাহভীতিকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়, এ হাদিস বর্ণিত হয়েছে সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিমে। রাসূল (সা.)আরো বলেছেন, অনেক রোজাদার আছে যারা রোজা রেখে ক্ষুধা-তৃষ্ণা ছাড়া কিছুই অর্জন করে না। তাই রমজানে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো জানা ও মানা অত্যন্ত জরুরি।

নিম্নে কুরআন ও হাদিসের আলোকে রমজানে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ বিশদভাবে আলোচনা করা হলো রমজানে করণীয়

১. নিয়ত বিশুদ্ধ করা : ইসলামের প্রতিটি আমলের ভিত্তি হলো নিয়ত। সহীহ আল-বুখারীর প্রথম হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: সমস্ত আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। রোজা এমন একটি ইবাদত যা মূলত অন্তরের সাথে সম্পর্কিত। কেউ প্রকাশ্যে রোজা না রাখলেও মানুষ জানে না; কিন্তু আল্লাহ জানেন। তাই রমজানের শুরুতেই নিজের নিয়তকে বিশুদ্ধ করা জরুরি। আমি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখছি।

২. তাকওয়া অর্জনের লক্ষ্য স্থির করা : আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারা ১৮৩ নম্বর আয়াতে রোজার উদ্দেশ্য হিসেবে তাকওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তাকওয়া মানে আল্লাহকে ভয় করা নয় শুধু; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জীবন পরিচালনা করা এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। রমজান হলো তাকওয়ার মাস। তাই প্রতিদিন নিজের কাজ পর্যালোচনা করা, গুনাহ থেকে বঁাচার চেষ্টা করা, এটি রমজানের বড় করণীয়।

৩. সাহরি খাওয়া : রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহরি খাওয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সাহরিতে বরকত রয়েছে, এ হাদিস সহীহ মুসলিমে বর্ণিত। সাহরি কেবল শারীরিক শক্তির উৎস নয়; এটি সুন্নাহ পালন। অল্প হলেও সাহরি খাওয়া উচিত।

৪. সময়মতো ইফতার করা : রাসূল (সা.) বলেছেন, মানুষ ততক্ষণ কল্যাণে থাকবে যতক্ষণ তারা তাড়াতাড়ি ইফতার করবে, সহীহ আল-বুখারী। সূর্যাস্তের পর বিলম্ব না করে ইফতার করা সুন্নাহ। খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার করা উত্তম। এতে বিনয় ও সরলতার শিক্ষা রয়েছে।

৫. বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত : রমজান হলো কুরআনের মাস। সূরা বাকারা ১৮৫ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, রমজান মাসেই কুরআন নাজিল হয়েছে। রাসূল (সা.) প্রতি রমজানে জিবরাইল (আ.)-এর সাথে কুরআন পাঠ করতেন, এ তথ্য সহীহ আল-বুখারীতে এসেছে। তাই রমজানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কুরআন তিলাওয়াতের লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত।

৬. সালাতের প্রতি যত্নশীল হওয়া : রমজানে অনেকেই রোজা রাখেন কিন্তু নামাজে অবহেলা করেন। অথচ নামাজ ইসলামের স্তম্ভ। ফরজ সালাতের পাশাপাশি তারাবীহ আদায় করা সুন্নাহ। রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়ামুল লাইল আদায় করে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করা হয়, সহীহ আল-বুখারী।

৭. তারাবীহ আদায় : তারাবীহ রমজানের বিশেষ আমল। খলিফা উমর (রা.)-এর সময়ে জামাতে তারাবীহ সুসংগঠিত হয়। এটি কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি করে। তারাবীহ শুধু রাকাত সংখ্যা নয়; বরং মনোযোগ ও খুশু-খুযুর সাথে আদায় করাই আসল। তারাবীহ ২০ রাকয়াত আদায় করা।

৮. দান-সদকা বৃদ্ধি করা : রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সবচেয়ে দানশীল, বিশেষ করে রমজানে, সহীহ আল-বুখারী। রমজানে যাকাত, সদকাতুল ফিতর ও নফল দান করা উত্তম। অভাবীদের পাশে দঁাড়ানো রমজানের শিক্ষা।

৯. ইতিকাফ করা : রমজানের শেষ দশকে রাসূল (সা.) ইতিকাফ করতেন সহীহ আল-বুখারী। ইতিকাফ মানে দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে দূরে থেকে আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে নিবেদিত করা।

১০. লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান : সূরা কদরে বলা হয়েছে, লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। রাসূল (সা.) শেষ দশকের বেজোড় রাতে তা অনুসন্ধান করতে বলেছেন সহীহ আল-বুখারী। এ রাতে বেশি বেশি ইবাদত, দোয়া ও ইস্তিগফার করা উচিত।

১১. দোয়া ও ইস্তিগফার : রাসূল (সা.) বলেছেন, রোজাদারের দোয়া ইফতারের সময় প্রত্যাখ্যাত হয় না। সুনান ইবনে মাজাহ। তাই রমজানে নিজের, পরিবারের, সমাজ ও উম্মাহর জন্য দোয়া করা জরুরি।

১২. আত্মসংযম চর্চা : রোজা আত্মসংযমের প্রশিক্ষণ। রাগ নিয়ন্ত্রণ, দৃষ্টি সংযত রাখা, অপ্রয়োজনীয় কথা এড়িয়ে চলা, এসব রমজানের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

১৩. পরিবারে দ্বীনি পরিবেশ সৃষ্টি : রমজানে ঘরে কুরআন তিলাওয়াত, একসাথে ইফতার, শিশুদের রোজায় উৎসাহ দেওয়া, এসব পরিবারে ইসলামী পরিবেশ গড়ে তোলে।

১৪. সময়ের সঠিক ব্যবহার : রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। অপ্রয়োজনীয় আড্ডা, টিভি, মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে থাকা জরুরি।

রমজানে বর্জনীয়

১. মিথ্যা ও প্রতারণা : রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ ত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (সহীহ আল-বুখারী)

২. গীবত ও অপবাদ : সূরা হুজুরাত ১২ আয়াতে গীবত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রমজানে গীবত করলে রোজার সওয়াব নষ্ট হয়।

৩. ঝগড়া-বিবাদ : রাসূল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, কেউ ঝগড়া করলে বলবে, আমি রোজাদার। (সহীহ আল-বুখারী)। অর্থাৎ রোজা ধৈর্যের শিক্ষা দেয়।

৪. অশ্লীলতা ও কুদৃষ্টি : চোখ, কান ও জিহ্বারও রোজা রাখতে হবে। অশ্লীল দৃশ্য দেখা, গান-বাজনা, অশালীন কথা বলা থেকে বিরত থাকা জরুরি।

৫. হারাম উপার্জন : হারাম উপার্জনে ইফতার করলে ইবাদতের বরকত নষ্ট হয়। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, হারাম খাদ্যে লালিত শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

৬. অপচয় ও বিলাসিতা : সূরা আ‘রাফ ৩১ আয়াতে অপচয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রমজানে ইফতারে অযথা বিলাসিতা করা উচিত নয়।

৭. নামাজে অবহেলা : রোজা রেখে নামাজ না পড়া বড় গুনাহ। সালাত ও সিয়াম পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।

৮. রিয়া বা লোকদেখানো : সহীহ মুসলিমে আছে, আল্লাহ তোমাদের চেহারা দেখেন না; অন্তর ও আমল দেখেন। লোক দেখানোর জন্য ইবাদত করলে সওয়াব নষ্ট হয়।

৯. রোজা ভঙ্গকারী কাজ : ইচ্ছাকৃত পানাহার, সহবাস, ইচ্ছাকৃত বমি। এসব রোজা ভঙ্গ করে। ফিকহ অনুযায়ী কাযা ও কখনো কাফফারা ওয়াজিব হয়।

১০. সময় নষ্ট করা : রমজান আত্মগঠনের মাস। সময় অপচয় করলে রমজানের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

রমজানের সামগ্রিক শিক্ষা রমজান মানুষকে বদলে দেয়। এটি ধনীকে দরিদ্রের কষ্ট অনুভব করতে শেখায়, গুনাহগারকে তাওবার পথে ডাকে, অলসকে কর্মঠ করে তোলে। রমজান শেষে যদি আমাদের চরিত্রে পরিবর্তন না আসে, তবে রোজার লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। রাসূল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ধ্বংস তার জন্য, যে রমজান পেল অথচ ক্ষমা লাভ করতে পারল না (জামি আত-তিরমিযি)।

পরিশেষে বলব, রমজান হলো জীবনের মোড় ঘোরানোর মাস। এ মাসে করণীয়গুলো আন্তরিকভাবে পালন এবং বর্জনীয় বিষয়গুলো দৃঢ়ভাবে পরিহার করলে একজন মুমিনের জীবন আলোকিত হয়ে ওঠে। রমজানের শিক্ষা সারাবছর ধরে রাখতে পারাই প্রকৃত সফলতা। আল্লাহ আমাদেরকে রমজানের হক আদায় করার তাওফিক দিন, আমাদের রোজা, সালাত, দান ও দোয়া কবুল করুন এবং আমাদের জীবনকে তাকওয়ার আলোয় আলোকিত করুন। আমীন।

লেখক : ইমাম ও খতিব, বিষ্ণুপুর মনোহরখাদী মদিনা বাজার বাইতুল আমিন জামে মসজিদ, প্রধান শিক্ষক ও পরিচালক, দারুসসুন্নাত বিসমিল্লাহ মডেল মাদ্রাসা, চঁাদপুর সদর, চঁাদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়