প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:২০
মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিধন্য চাঁদপুরের ‘হরদয়াল ভবন’: ইতিহাসের এক ক্ষয়িষ্ণু মহাকাব্য!

চাঁদপুর জেলা শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয় মতলব উত্তরের কাশিমপুর গ্রাম। মেঠো পথ ধরে এগোলে চোখে পড়বে লতাপাতায় ঢাকা এক বিশাল ভগ্নস্তূপ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কেবলই একটি পরিত্যক্ত জীর্ণ দালান। কিন্তু এই ইটের পাঁজর ঘেঁষে দাঁড়ালে শোনা যায় এক উত্তাল সময়ের পদধ্বনি। এটি হরদয়াল ভবন। যে বাড়ির আঙিনায় এক সময় পা রেখেছিলেন অহিংস আন্দোলনের অগ্রদূত মহাত্মা গান্ধী, যে বাড়ি থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো পূর্ববঙ্গের ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতির একটি বিশাল অংশ, আজ তা কালের গর্ভে বিলীন হওয়ার প্রহর গুনছে।
|আরো খবর
হরদয়াল নাগ: এক ঋষিপ্রতিম বিপ্লবীর উত্থান
১৮৫৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। কাশিমপুর গ্রামের এই নিভৃত পল্লীতেই জন্ম নেন হরদয়াল নাগ। তৎকালীন সময়ে গ্রাম থেকে উঠে আসা এক প্রতিভাবান যুবক যখন ওকালতি পেশায় অনন্য উচ্চতায় আরোহণ করেন, তখন তাঁর সামনে ছিল বিত্ত-বৈভবের হাতছানি। কিন্তু হরদয়াল নাগের রক্তে বইছিল দেশপ্রেমের আগুন। তিনি কেবল একজন আইনজীবী ছিলেন না, ছিলেন একজন দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারক। তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব এতটাই ছিল যে, তাঁকে ‘চাঁদপুরের গান্ধী’ বলে অভিহিত করা হতো। তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তা এবং নীতিবোধ মুগ্ধ করেছিল মহাত্মা গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মহৎ প্রাণদেরও। ১৯২১ সালে যখন গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন, হরদয়াল নাগ এক মুহূর্ত দেরি না করে তাঁর পঁচিশ বছরের সফল ওকালতি পেশা বিসর্জন দিলেন। এটি ছিল সেই সময়ের এক চরম ত্যাগ, যা পুরো বাংলার তরুণ সমাজকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
গান্ধীজির তিন সফর: যখন কাশিমপুর হয়ে উঠেছিল তীর্থস্থান
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মহাত্মা গান্ধী তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তিনবার এই হরদয়াল ভবনে পদার্পণ করেছিলেন। প্রতিটি সফরের পেছনেই ছিল একেকটি বিশেষ প্রেক্ষাপট। ১৯২১ সালের ১৯-২০ মে ছিল সবচেয়ে স্মরণীয়। আসামের চা-বাগান থেকে ব্রিটিশ সাহেবদের জুলুম সহ্য করতে না পেরে হাজার হাজার শ্রমিক সপরিবারে পালিয়ে চাঁদপুর ঘাটে এসে আশ্রয় নেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসন তাঁদের ওপর স্টিমার ঘাটে অমানবিক নির্যাতন চালায়। এই খবর সাবেরমতী আশ্রমে পৌঁছালে গান্ধীজি বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি মওলানা শওকত আলীকে সাথে নিয়ে ১৯ মে চাঁদপুরে আসেন। সে রাতে তিনি হরদয়াল নাগের বাড়িতেই অবস্থান করেন।
ভিডিও : জরাজীর্ণ হরদয়াল ভবন(সংগৃহীত)
ভিডিওচিত্রে যে জীর্ণ কামরাটি দেখা যাচ্ছে, সেখানেই মোমবাতির আলোয় হরদয়াল নাগ আর গান্ধীজি গভীর রাত পর্যন্ত আলোচনা করেছিলেন—কীভাবে এই নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়। পরদিন চাঁদপুর স্টেশনের পাশে এক বিশাল জনসভায় গান্ধীজি ব্রিটিশদের ‘শয়তানি শাসন’ বলে অভিহিত করেন। সেই আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ এই বাড়ি থেকেই ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো মহকুমায়। এরপর ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যুশোক ভাগ করে নিতে এবং ১৯৩৪ সালে হরিজন আন্দোলনের সময়ও তিনি এই বাড়িতে পা রেখেছিলেন। সে সময় তিনি হরদয়াল নাগের সরল জীবনযাপন দেখে বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, "আসল ভারতের প্রতিনিধিরা এমন গ্রামেই বাস করেন।"
"কালের সাক্ষী: মহাত্মা গান্ধী যে বারান্দায় বসে সূতা কাটতেন, আজ সেখানে আগাছার বসতি।"
স্থাপত্যশৈলী: ধ্বংসস্তূপেও আভিজাত্যের ছোঁয়া
হরদয়াল ভবনটি তৎকালীন জমিদারবাড়ির স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হলেও এতে এক ধরনের ধ্রুপদী সরলতা ছিল। ভিডিওতে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ভবনের বিশাল খিলানগুলো রোমান স্থাপত্যের কিছুটা ছাপ বহন করে। উঁচু ছাদ, চওড়া বারান্দা এবং মোটা দেয়ালগুলো তৎকালীন গ্রীষ্মপ্রধান আবহাওয়ার উপযোগী করে তৈরি। দেয়ালের প্রতিটি ইটে তখন চুন-সুরকির যে গাঁথুনি ছিল, তা আজও কয়েকশ বছর টিকে থাকার প্রমাণ দিচ্ছে। তবে আজ সেই আভিজাত্যের গায়ে শেওলার আস্তর। লতাপাতা ও বটের ঝুরি দেয়াল ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ভবনের পেছনের পুকুর ঘাটটি, যেখানে গান্ধীজি প্রাতঃস্নান সেরেছেন বলে জনশ্রুতি আছে, তা এখন কচুরিপানায় ঢাকা। একটি জাতির অহংকার এমনভাবে লুণ্ঠিত হতে দেখা সত্যিই বেদনার।
একটি আদর্শের অপমৃত্যু: ওকালতি ও বিলাসবর্জন
হরদয়াল নাগের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর ত্যাগ। গান্ধীজির ‘স্বদেশী’ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে তিনি নিজের বাড়ির সামনে বিলাতি কাপড়ের স্তূপ করে তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আমৃত্যু নিজের চরকায় কাটা সুতার ধুতি ও চাদর পরেছেন। তাঁর এই আদর্শ এতটাই কঠোর ছিল যে, তিনি তাঁর পরিবারকেও বিলাতি পণ্য বর্জন করতে বাধ্য করেছিলেন। তিনি ছিলেন ‘ভারত হিতৈষী’ পত্রিকার সম্পাদক। তাঁর কলম চলত তরবারির মতো। ব্রিটিশ প্রশাসন একাধিকবার তাঁর কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে মানুষটি একটি জাতির কণ্ঠস্বর ছিলেন, তাঁর স্মৃতি আজ নিভৃতে কাঁদে।
"জরাজীর্ণ কারুকার্য: অযত্ন আর অবহেলায় খসে পড়ছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সদর দপ্তরের পলেস্তারা।"
স্থানীয়দের দীর্ঘশ্বাস: স্মৃতির আঙিনায় দাঁড়িয়ে
কাশিমপুর গ্রামের বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছে হরদয়াল নাগ কেবল একটি নাম। কিন্তু প্রবীণদের চোখে এখনও জল আসে। ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের ভাষ্যমতে, "বাপ-দাদার কাছে শুনেছি, গান্ধীজি যখন এই বাড়ির উঠানে বসতেন, তখন পুরো গ্রামের মানুষ ভেঙে পড়ত। এই ভিটা আমাদের কাছে পবিত্র। কিন্তু এখন রাত হলে এখানে শেয়ালের ডাক শোনা যায়, চোর-ছ্যাঁচোড়েরা বাড়ির দামী পাথর-কাঠ খুলে নিয়ে গেছে। আমাদের ইতিহাসের প্রতি এই অবহেলার চিত্র সহ্য হয় না।" গ্রামবাসীর অভিযোগ, গত কয়েক দশকে বহু নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা এখানে এসেছেন, অনেক আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু ভবনের সুরক্ষায় একটি ইটের কাজও হয়নি। সরকারিভাবে কোনো সাইনবোর্ড পর্যন্ত নেই যা মানুষকে জানাবে এটি একটি ঐতিহাসিক স্থান।
প্রত্নতাত্ত্বিক সংকট ও সংরক্ষণের আবশ্যকতা
বাংলাদেশে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত অনেক ভবন থাকলেও হরদয়াল ভবন কেন আড়ালে রয়ে গেল, তা এক বড় প্রশ্ন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই ভবনটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি ১৯৪৭ পূর্ববর্তী বাংলার রাজনীতির একটি ‘পাওয়ার হাউস’। যদি এখনই এর সংস্কার করা না হয়, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এর ছাদ পুরোপুরি ধসে পড়বে এবং মাটির সাথে মিশে যাবে এক বীরত্বময় ইতিহাস।
ইতিহাসের দায় মুক্তি হবে কি?
১৯৪২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। ভারত ছাড় আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়ে চাঁদপুরের এই ক্ষণজন্মা পুরুষ মৃত্যুবরণ করেন। আজ শতবর্ষ পরে এসে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি যোগ্য উত্তরসূরী হতে পেরেছি? হরদয়াল ভবনকে রক্ষা করা কেবল একটি জরাজীর্ণ দালান মেরামত করা নয়, এটি আমাদের জাতীয় সত্তার অংশকে রক্ষা করা। এই ভবনটি হতে পারে একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘গান্ধী স্মৃতি জাদুঘর’ ও গবেষণাকেন্দ্র। যেখানে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা এসে জানবেন কীভাবে একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে অহিংসার বাণী পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে চাঁদপুরবাসীর আবেদন—কাগজ-কলমের জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত এই ভবনটি অধিগ্রহণ করা হোক। ধ্বংসের প্রান্ত থেকে ফিরিয়ে আনা হোক ‘চাঁদপুরের গান্ধী’র এই স্মৃতিধন্য আলয়কে। তা না হলে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
ডিসিকে/এমজেডএইচ
প্রতিবেদক : অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন, শিক্ষক নেতা, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।







