শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫  |   ৩২ °সে
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৫, ০৯:১৯

তোমার সাথে দেখা হয়নি

আশরাফ চঞ্চল
তোমার সাথে দেখা হয়নি

মালিহা জেরিন,

ইন্টারনেটের এই দুনিয়ায় তোমাকে প্রতিনিয়ত খুঁজে ফিরি এখনও। ফেসবুক, গুগল, ইমু, হোয়াইটঅ্যাপস, মুজিলা কিংবা অপেরা মিনিতেও সার্চ দিই।

দৈনিকের সাহিত্য পাতায়, লিটল ম্যাগাজিন কিংবা অনলাইনভিত্তিক মিডিয়া জগতও বাদ রাখি না। খুঁজে খুঁজে হয়রান হই, কোথাও তোমাকে পাই না!

তোমার কথা ভাবতে ভাবতে চল্লিশ বসন্ত গেছে। মাথার কুচকুচে কালো চুল ফ্যাকাসে হতে হতে দুই একটাতে পাক ধরেছে। দাঁড়ি-গোফে ক্ষুর লাগাইনি যে কতদিন! লেখাপড়া বাদ দিয়ে যে চাকরিটা নিয়েছিলাম তা কর্তব্য কর্মে অবহেলার অভিযোগে চলে গেছে!

আমি এখন টোটো কোম্পানির ম্যানেজার সেজে পথে-ঘাটে ঘুরে বেড়াই। যে মা আমাকে দেখভাল করতো তিনি প্রকৃতির ডাকে আকাশের বাসিন্দা হয়ে গেছেন। বাবা তো মায়ের শোকে থেকেও না থাকার মতোই অবস্থা। একটা ভাই সেতো বহু বছর আগে থেকেই বাড়িছাড়া। বোনেরা তাদের সংসার নিয়েই ব্যস্ত। আমিই কেবল একা। সংসার নেই। ভালোবাসার মানুষ নেই!

এই একাকিত্ব আর সহ্য হয় না। বেশ কয়েকবার গলায় দড়ি লাগাতে চেয়েছি, নদীতে ঝাঁপ দিতে চেয়েছি, ট্রেনের চাকার নিচে মাথাগুঁজে নিজেকে টুকরো টুকরো করতে চেয়েছি। পারিনি শুধু একটা কারণে। তুমি বলেছিলে ঢাকা মেডিকেল কলেজে লেখাপড়ার দারুণ চাপÑদম ফেলারও সময় নেই! সুযোগ হলেই চিঠি দিবে! একসাথে অনেকগুলো চিঠি। কয়েকদিন, কয়েকমাস, কয়েক বছরের না লেখা চিঠিগুলো একসাথে শোধ করে দিবে!

ফজলে হাসান রাব্বি হলে থাকতেন হাসান ভাই। হাসান ভাই নাকি তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড! তোমাকে লিখলে লিখতে হতো হাসান ভাইয়ের ঠিকানায়। আমার খটকা লাগার কথা শুনে তুমি হেসে হেসে বললে, ‘হাসান ভাই খুব ভালো মানুষ। আশরাফ চঞ্চলের লেখা চিঠি হাসান কখনোই পড়বে না।

তবু আমার খটকা যায়নি। হাজার হোক সেটা তো প্রেমপত্র। মনের সব গোপন কথা লেখা থাকতো চিঠিতে! যদি হাসান ভাই দেখে ফেলে! আমার খুব দ্বিধা দ্বিধা লাগতো। শরমও কম ছিল না। সেটা ২০০৫/২০০৬ সাল। একটা গেয়ো গেয়ো ভাবছিল আমার মধ্যে! শত চেষ্টা করেও সহজ হতে পারিনি।

বিশ বছর ধরে তোমার চিঠির অপেক্ষায় আছি। পোস্টঅফিসের পিয়নের কাছে এখনও রোজ রোজ খবর নিই। কতজনের চিঠি আসে, ম্যাগাজিন আসে, পত্রিকা অফিস থেকে লেখক সম্মানীর চেক আসে শুধু প্রতিক্ষার চিঠি আসে না!

তোমার নিষেধ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে ত্রিশালের ৩৩৬/১ নজরুল একাডেমি রোডে তোমাদের বাসায় কয়েকবার তোমার খোঁজ করেছি। তোমাকে পাইনি। বাসার লোকেরা বলে, ‘এখন আর মালিহা জেরিনেরা এখানে থাকে না।’

আমি এখনও কবিতা লিখি। তুমিও যে কী সুন্দর লিখতে! সমকাল, যুগান্তর, প্রথম আলো, ইত্তেফাক, সংবাদ, আজকের কাগজ, জনকণ্ঠ আর দেশ বিদেশের লিটল ম্যাগে!

ছন্নছাড়া এই জীবনে কতজনে যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আমি তোমার কথা ভেবে ভেবে নিজেকে সর্বদা গুটিয়েই রেখেছি। করো হাতেই হাত রাখিনি!

আমাকে অনেকেই পাগল বলে! আমার সব কর্মকাণ্ড পাগলের মতে হলেও আদতে পাগল নই আমি! আমি শুধু তোমার পাগল! জপমালার মতো সারাক্ষণ তোমারই নাম জপি! মালিহা জেরিন নামটিই আমার জপমন্ত্র!

তোমার সাথে দেখা হয়নি কখনও। লেখালেখির সূত্র ধরেই পত্র যোগাযোগ। কম পয়সার ডাক টিকিট লাগিয়ে আমরা খোলাডাকে চিঠি লিখতাম প্রতিদিন। তখন তো আর মোবাইল ছিল না, চিঠি লেখাতেই ছিল দারুণ নেশা! একদিনের ডাকে চিঠি না এলেই খুব খারাপ লাগতো। অনুযোগ অভিযোগের অন্তছিল না! আহা! সেই সময়টা কতইনা মধুময় ছিল।

তোমাকে নিয়ে সংসার করার কথা ছিল বলেই আমি আজও সংসার পাতিনি। ফুলের মধুবৃন্তে চুমুক দিয়ে ঠোঁটে কখনোই আকাক্সক্ষার পরাগ মাখিনি। সোজাসাপটা চলতে গিয়ে নিজের চাওয়া পাওয়ার গুরুত্ব দিইনি। কাউকে না ঠকিয়ে কেবল নিজেই ঠকে গেছি।

এই একাকিত্ব যে কতটা কষ্টের তা ব্যাখ্যা করে বোঝানো খুব মুশকিল। এর চেয়ে মরণ ভালো। এটাকে বেচে থাকা বলে না।

এই লেখাটি লিখছি শুধু তোমাকে খুঁজে পাবার আশায়। কারণ তুমি লিখিয়ে মানুষ! সাহিত্যের পাতায় চোখ না রেখে পারবেই না! যদি এই লেখাটি চোখে পড়ে আমার ঠিকানায় একটা চিঠি দিও। তোমার একটি চিঠিই হবে আমার জন্য বেঁচে থাকার অবলম্বন!

ইতি তোমার...

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়