প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৯:০৫
নরকের নিচের মানুষ
এই ফ্ল্যাটের বাথরুমটা চমৎকার। বিশেষত বাথটাবটা। আমার ছয় ফুট এক ইঞ্চির শরীরটা বেশ ভালোভাবেই এঁটে যায়। তবে ফ্ল্যাটটা আমার নয়। রাশেদ ভাই মাস তিনেক আগে হাতে চাবি ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘যত দিন না পর্যন্ত আমি ডাকব, তত দিন এই ফ্ল্যাটে থাকবি। এখান থেকে কোনো নড়াচড়া নয়।’
রাশেদ আশরাফ স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। আমি ওনার ডানহাত। রাশেদ ভাইয়ের নামে চারটা মামলা ঝুলছে। ক্ষমতাবান বলে সব কটাই ধামাচাপা দিতে পারেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, চারটার মধ্যে তিনটাতেই আমার সংশ্লিষ্টতা আছে। এত সবকিছুর পেছনে একটাই কারণ। আমার অর্থের নিদারুণ অভাব। টাকার জন্য জীবন নিয়ে খেলি। বাস্তবেও খেলতাম অবশ্য একসময়। ক্রিকেট। উইকেটকিপার কাম ব্যাটার হিসেবে ক্লাবে বেশ ভালোই নাম ছিল। স্বপ্ন দেখতাম, একসময় ডিপিএল খেলব, ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলব। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল! সাধারণ চাকুরে বাবা মরল। প্রতিবন্ধী ছোট ভাই আর আর স্বামী মরার শোকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মা সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে ক্লান্ত। সত্যি বলতে, নিম্নবিত্তদের ছকভাঙা ছক্কা হাঁকানোর স্বপ্নগুলো কখনোই গ্যালারিতে গিয়ে আছড়ে পড়ে না।
হঠাৎ বাথটাব ঘেঁষে শুকনো জায়গায় রাখা ফোনের রিংটোনটা আর্তনাদের মতো শোনাল। দেখলাম স্ক্রিনে স্নেহার নামটা ভেসে আছে। মেয়েটার সঙ্গে পরিচয় রাশেদ ভাইয়ের এক পার্টিতে গিয়ে। তাকে দেখে বেশ অন্য রকম অনুভূতি হয়। তাকালেই বুকে কেমন দোলা দেয়। আসলে আমি যে লাইনে কাজ করি, সেখানে বুকে দোলা দেওয়ার বুক থাকতে নেই। তবু কিছু একটা আছে ওর মধ্যে। ফোনটা ধরলাম। স্নেহার রিনরিনে কণ্ঠ ভেসে এল, ‘তুমি আজ দেখা করতে পারবে?’
Ñজরুরি বেশি?
Ñখানিকটা জরুরি তো বটেই। তবে তোমার কোনো কাজ থাকলে আজ থাক। অন্য দিন নাহয়......
আমার কী কাজ থাকে, সেটা স্নেহা বেশ ভালোই জানে। তাও যে কেন মেয়েটা আমার সঙ্গে মেশে, জানি না। ও–ই একমাত্র মেয়ে, যাকে দেখে কখনো খারাপ কিছু মাথায় আসেনি। শুধু মনে হয়, ওর হাত দুটো ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকি। ওর একটু সঙ্গই কাম্য। তাই বললাম, না, আজ কাজ বিশেষ নেই। রাশেদ ভাই না ডাকলে ছুটি। বলো, কোথায় দেখা করবে?
Ñসেখানেই। যেখানে সব সময় দেখা করি। পৌঁছে যেয়ো চারটায়।স্নেহা কথা বাড়াল না। টুপ করে লাইনটা কেটে দিল। ও বড়লোক বাবার মেয়ে। সেদিন বাবার সঙ্গেই পার্টিতে এসেছিল। প্রায় জনাবিশেক তৃষ্ণার্ত পুরুষের দৃষ্টি উপেক্ষা করে মিনিবারের এককোণে বসে থাকা আমার কাছে এগিয়ে এসে বলেছিল, ‘হাই, আমি স্নেহা। আপনি?’
আমার হাতের গ্লাস থেকে চুমুক দেওয়া শেষ লাল তরলটুকুও গিলতে পারছিলাম না ওকে দেখে। কোনোরকমে নিজের নামটা বলেছিলাম। সেই থেকে শুরু। এরপর অনেক জায়গায়ই ওকে নিয়ে বেরিয়েছি। হুটহাট আমরা প্রায়ই দেখা করেছি। যেমন আজ করব। সচরাচর দেখা করি গাজীপুরের একটা রিসোর্টে। যখন সেখানে পৌঁছুলাম, দেখলাম চারটা বাজতে কিছুটা সময় বাকি। স্নেহা পৌঁছায়নি।
হঠাৎ পলকেই একটা কথা নিজের মনেই ভেসে এল, আচ্ছা ওর জন্য আজ কিছু উপহার কেনা যায় না! ওই যে সিনেমায় নায়কেরা কেনে নিজের প্রেমিকার জন্য। যাহ, স্নেহা আমার প্রেমিকা নাকি? মনে মনে একঝটকায় প্রস্তাবটা নাকচ করে দিলাম। আমি জানি, প্রথমে কেউই তো কারও প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা থাকে না। অনুভূতিই প্রেম তৈরি করে দেয়। স্নেহা আমার এই কম্পাসহীন জীবনে আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘরের মতো দেখা দিয়েছে। দরকার হলে ওর জন্য আমি এই অন্ধকারের পথ ছেড়ে দেব। কিন্তু ও কি আমায় গ্রহণ করবে?
এত সব কথা ভাবছিলাম, খেয়াল করলাম, স্নেহা এসে বসেছে মুখোমুখি চেয়ারটাতে। হালকা হাওয়ায় মেয়েটার কপালের কিছু ডানপিটে চুল বাতাসের তালে তালে উড়ছে। মনে হচ্ছে, ইতিহাসের সমাধিতে ঠাঁই পাওয়া সেই স্বর্গীয় নেফারতিতি আমার চোখের সামনে। মৃদু হাসল। বলল, ‘এমনভাবে তাকিয়ে আছ, যেন আমাকে আগে কখনো দেখনি।’
Ñসত্যি বলতে এর আগে এমন গভীর মনোযোগে সেজেছ বলে আমার মনে পড়ছে না।
Ñআজ আমার এক প্রিয় মানুষের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আর প্রিয় মানুষের কাছে এলে নিজের সবটুকু সৌন্দর্য উজাড় করে দিতে হয় জানো না?
আমি মনে মনে বিষম খেলাম। তবে কি আমার জন্য স্নেহার মনে কিছু দুর্বল জায়গা তৈরি হয়েছে? আমি তো নরকের মানুষ। মানুষের মন বড় বিচিত্র। স্নেহার মনও বোধ হয় আমার জন্য সেই বিচিত্রতায় ভুগছে। বললাম, ‘কে সেই তোমার প্রিয় মানুষ?’
স্নেহা মুক্তার মতো দাঁতের সারি বের করে সামান্য হাসল। আমার ডান হাতটা ওর দুহাতে আলতো করে চেপে ধরল। কী কোমল স্পর্শ! বলল, ‘কেন, তুমি কি আমার একজন প্রিয় মানুষ না! তুমি আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুদের একজন।’আমি এত দিনে বুঝলাম, আমার হৃদয় বলে কিছু আছে। ওর কথায় এক অবাঞ্ছিত টান অনুভব করছি। স্নেহাও ব্যাপারটা বুঝল। তাই বোধ হয় পরিবেশের চাপ মৃদু করার জন্য কথার মোড় অন্যদিকে ঘোরাল, ‘আচ্ছা তুমি কি চলচ্চিত্র পরিচালক হাসনাত শাফিকে চেনো?’
প্রশ্নটা অদ্ভুত! অন্তত আমার মতো মানুষকে জিজ্ঞাসা করা হলে। যে এক রাজনীতিবিদের সাগরেদ, তাঁর ক্ষেত্রে জীবন ছায়াছবি দেখার মতো আদিখ্যেতা মেনে নেবে না। সেখানে চলচ্চিত্র পরিচালককে চেনাও বিলাসিতা। ‘না। নামটা খানিকটা চেনা। তবে ব্যক্তিগতভাবে চিনি না।’ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। ধরতেই ওপাশ থেকে রাশেদ ভাইয়ের গম্ভীর কণ্ঠ।
Ñকী রে খবর কী?
Ñভালো ভাই।
Ñভালো তো হবেই। মেয়েটার সঙ্গেই আছিস।
আমি চমকালাম না। জানি, আমার ওপর প্রতিক্ষণই নজর রাখা হয়।
ফোনটা নিয়ে মেয়েটার থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়া।
আমি স্নেহাকে ইশারায় খানিকটা জরুরি দেখিয়ে দূরে সরে দাঁড়ালাম।
Ñদাঁড়িয়েছিস?
Ñজি ভাই, দাঁড়িয়েছি। এবার বলেন।
Ñশোন, আজ এই মেয়েকে তুলতে হবে।
এবার আমি অবাক হলাম, তুলতে হবে মানে ভাই?
Ñএত দিন এই লাইনে থেকেও বুঝিস না, তুলতে হবে মানে কী? অপহরণ করতে হবে। আজ রাতের মধ্যেই। ওর বাপটা তিড়িংবিড়িং শুরু করেছে। পার্টিতে চাঁদা দেবে বলেছিল। দেড় মাস সময় দিয়েছিলাম। এখনো দেয়নি। সুতরাং মেয়েটাকে তুলতেই হবে।আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করে উঠল। কী বলছেন এসব রাশেদ ভাই! স্নেহাকে অপহরণ! না, এটা আমার দ্বারা হবে না।
Ñরাশেদ ভাই, অপহরণ করাটা কোনোভাবে এড়ানো যায় না?
Ñআমি তোর কাছে পরামর্শ চেয়েছি? রাশেদ ভাই খেঁকিয়ে উঠলেন, রাত নয়টায় কাজ শেষ করে আমাকে জানাবি। লাগলে সাখাওয়াতকেও সঙ্গে নিবি। এগুলো তো তোদের কাছে ডালভাত।
আর একটি শব্দও রাশেদ ভাই ব্যয় করলেন না। লাইন কেটে দিলেন। আমি প্রায় টলতে টলতে স্নেহার সামনে গিয়ে বসলাম। খানিকটা নীরবতার পর বললাম, রাশেদ ভাইয়ের ফোন ছিল। ও হ্যাঁ, তুমি হাসনাত শাফিকে নিয়ে কী যেন বলছিলে!
আমার কথার উত্তর দিতে স্নেহা বেশ খানিকটা সময় ব্যয় করল। যেন আনমনে দুই আর দুইয়ে চার হয়, সেটা অনেক কষ্ট করে মেলানোর চেষ্টা করছে। এতক্ষণ ও আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিল। এবার চোখ নামিয়ে উত্তর দিল, ‘আসলে আমি হাসনাতকে ভালোবাসি আর হাসনাতও আমায় ভালোবাসে।’
কথাটা শুনে আমার আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর দপ করে নিভে গেল। ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল বাতিঘরের প্রতিটি সিঁড়ি। ভাঙা সিঁড়ি বেয়েই অনেক কষ্টে গলা দিয়ে স্বর বের হলো আমার, ‘ভালোবাসো ভালো কথা। বিয়ে করে নিলেই তো পারো। তা বলে আমায় বলছ কেন?’
Ñতুমি হয়তো জানো না। হাসনাত বিবাহিত। ওর স্ত্রী আছে। কিন্তু ওই মহিলা হাসনাতকে ডিভোর্স দেবে না। তাই আমি হাসনাতের সঙ্গে মিশতেও পারছি না। এ ক্ষেত্রে তুমিই একমাত্র আমাকে সাহায্য করতে পারো।
আমি দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞাসা করলাম, কীভাবে?
Ñআমি জানি তুমি পারবে। এসব কাজে তোমার ভালো নামডাক আছে।আমি স্নেহার দিকে তাকালাম। ওকে নরক থেকে সাজিয়ে-গুঁজিয়ে ছেড়ে দেওয়া একটা পিশাচিনীর মতো লাগছে। না, এই মেয়ে আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর নয়, যাকে বুকে আঁকড়ে ধরে এই অন্ধকার জগৎ থেকে বেরিয়ে যাওয়া যায়। রাশেদ ভাইয়ের কথা মনে পড়ল, ‘আজ মেয়েটাকে তুলতে হবে।’ মনে মনে ভাবলাম, হ্যাঁ, আজ ওকে তুলে দেব। নরকের দ্বারে। তবে মুখে বললাম, আমার এখন কিছু কাজ আছে। রাত নয়টার মিনিট দশেক আগে তুমি কাঁঠালবাগানে চলে এসো। ওখানে বসেই সব পরিকল্পনা করব। তোমার গাড়ি এনো না। একটা ক্যাবে করে চলে আসবে। আর হ্যাঁ, আসার সময় কাউকে কিচ্ছু বলবে না।
মনে মনে হাসলাম। আমি খুব স্বাভাবিকভাবে কাজ করি, কোনো চাপ নিই না। কারণ, স্নেহা, আমিÑআমরা সবাই আজকাল নরকের নিচের মানুষ।