প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৯:০৭
ভারতের বিস্ময় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল

কলকাতা ভ্রমণে এসে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সৌন্দর্য উপভোগ না করা রীতিমত গর্হিত কর্ম বলেই মনে করি। মারকুইস স্ট্রিট থেকে গুগল ম্যাপের কল্যাণে পাদ্কুায় ভর করে পৌঁছে যাই মধ্য কলকাতার বিখ্যাত গড়ের মাঠের (ময়দান) দক্ষিণে অবস্থিত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। মূল ফটকের বাইরে থেকে দর্শনার্থীদের চোখের পাড়ে আছড়ে পড়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সৌন্দর্যের ঢেউ। কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত টিকেট কাউন্টার থেকে টিকেট ক্রয় করে সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে প্রবেশ করি পরম আরাধ্য পর্যটন স্থানটিতে। প্রথমেই ৬৪ একরের সুবিশাল বাগান আপনাকে মোহাবিষ্ট করবে। বাগানের স্নিগ্ধতায় মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। মনে মনে William Wordsworth -এর বিখ্যাত কবিতা "I wandered Lonely as a Cloud"-এর দুটি লাইন আওড়াতে থাকি "Ten thousand saw I at a glance Tossing their heads in sprightly dance"। এখানে এসে আপনার মনে হতে পারে আপনি নন্দনকাননে চলে এসেছেন। আমার স্কন্দপুরাণের কতিপয় লাইন মনে পড়ে‘সেই মহাকালবনে অত্যন্ত মনোরম স্বর্গীয় উদ্যান নন্দনকানন বিদ্যমান রয়েছে। কামধেনু অভীষ্ট বরদানকারী গাভী হিসাবে বিখ্যাত। তিনি সর্বদা সেখানে মহাকাল মহেশ্বরের সেবা করেন। মনোহর বৃক্ষ পারিজাত তাঁকে সেবা করেন। সেই স্থানে চমৎকার মানস সরোবর বিন্দুসারস ও সর্বদা অম্লান নবীন পদ্মফুল দ্বারা শোভিত । এটি রাজহাঁস এবং সারস দ্বারা পরিপূর্ণ। এটি সুরগণ এবং সিদ্ধগণের বিচরণ ক্ষেত্র। মুক্তো এবং রত্ন সর্বত্র সেই স্থানজুড়ে বিস্তৃত এবং দীপ্তিশীল রত্নগুলি এই স্থানকে উজ্জ্বল করে তুলেছে’’। রানী ভিক্টোরিয়া ১৮৭৬ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। মহারানী ভিক্টোরিয়ার স্মরণে শ্বেত পাথরে নির্মিত এ স্মৃতিসৌধটি ভারতের জাতীয় প্রদর্শনীশালা জাদুঘর। ভিতরে প্রবেশ করলে প্রথমে চোখে পড়বে রাজ পোশাকের গর্বে আচ্ছাদিত মহারানী ভিক্টোরিয়া এর রাজসিংহাসনে আসীন প্রতিমূর্তি। সেলফি নিতে ব্যতিব্যস্ত দর্শনার্থীরা। আমিও তথৈবচ। স্মৃতিরোমন্থনের প্রকৃষ্ট মাধ্যম অধুনা সেলফি। স্মৃতি সবসময় সহায়ক হয় না বিধায় আমার অগত্যা সেলফিতেই ভরসা। ১৯০১ সালে ৯৪ বছর বয়সে মহারানী ভিক্টোরিয়া মারা যাওয়ার পর তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে ভবনটি নির্মিত হয়। লর্ড কার্জন প্রথম এ সুরম্য ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। বিশাল বাগিচার মাঝে গর্বভরে দণ্ডায়মান এ সৌধ ভারতে ব্রিটিশ শাসনের স্মৃতির কোরক হয়ে শত বছর জাজ্বল্যমান। মূল ভবনে দাবার ছকের মতন মেঝে মাড়িয়ে চোখে পড়বে মেরির নান্দনিক ভাস্কর্য। ভাস্কর্যের সৌন্দর্যের রেশ কাটতে না কাটতেই চোখে পড়ে আদি কলকাতার ইতিহাস সংবলিত দুর্লভ প্রদর্শনী। আমি পরম মুগ্ধতায় তাকিয়ে হারিয়ে যাই ইতিহাসের চোরাবালিতে। সম্বিৎ ফিরতেই আরেক ছবিতে চোখ পাতি। চোখে মুখে লেগে থাকে অত্যাশ্চর্যের ঝিলিক। অদূরে কতিপয় ছবির দৃশ্য চোখে বিশেষ নজর কাড়ে। রাজা হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে ঘুরছেন। সাথে পাইক, পেয়াদা, অনীক এবং পারিষদ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজের রেপ্লিকা আপনাকে ভাবনার অতলে ডুবিয়ে দিবে। ভ্রমণক্লান্তি কর্পূরের মতো উবে যায়। মহারানী ভিক্টোরিয়ার সুবিশাল পিয়ানো স্মৃতিকাতর করবে। হৃদয়ে বেজে ওঠে পুরনো দিনের গান। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নৌযানের রেপ্লিকা আপনাকে ভাবনার গভীরে ডোবাবে নিঃসন্দেহে। রানি ভিক্টোরিয়ার নান্দনিক পিয়ানো দর্শনার্থীর চোখে উর্বর স্মৃতি হয়ে থাকবে সুদীর্ঘ সময়। লর্ড ক্লাইভের শুভ্র মূর্তি আপনাকে কিছু সময়ের জন্য অতীত ভুলিয়ে দিবে। আপনি বিস্ময়ে তাকিয়ে শ্বেত মূর্তির সৌন্দর্যের সৌকর্য দেখবেন। ভর্ৎসনা করতে ভুলে যাবেন। পলাশী যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র যত্নসহকারে সংরক্ষিত আছে। দুটি কামানের গোলা যুদ্ধের দামামার কথা স্পষ্ট স্মরণ করায়। ভাগীরথী নদীর তীরের পলাশী যুদ্ধের মানচিত্র আপনাকে ভিতরে ভিতরে আহত করবে; হৃদয়ে হবে রক্তক্ষরণ। ভারত সম্পর্কে বিখ্যাত মানুষের মূল্যায়নের দলিল রয়েছে। ভারতের বিখ্যাত মানুষ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান আহরণের সুযোগ রয়েছে। বাগানের কিংবা পুকুরের সৌন্দর্য আপনাকে নীড়ের ঠিকানা ভুলিয়ে দিবে কিছু সময়। লর্ড ক্লাইভের ছবি আপনাকে বাস্তবের মুখোমুখি করাবে। লর্ড ক্লাইভের চতুরতার ঘটনায় আমরা পুনরায় হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। রাজা পঞ্চম জর্জ ১৯০৬ সালের ৪ জানুয়ারি ভবনটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড ১৯২১ সালের ২৮ ডিসেম্বর উদ্বোধন করেন। ভবনটিতে বিভিন্ন স্থাপত্য শৈলীর মিশ্রণ রয়েছে। কথিত আছে, ‘ভারতে ঔপনিবেশিক স্থাপত্য রীতিটি গড়ে উঠেছিল ইউরোপীয় রীতির সাথে ইন্দো-ইসলামিক রীতির যথার্থ মিশ্রণে’। ইউরোপীয় উপনিবেশ এবং ব্রিটিশ শাসনের ফলে ভারতীয় চিত্রকলা, সাহিত্য, কিংবা স্থাপত্য কলায় এর গভীর প্রভাব পড়েছে। ইউরোপীয় স্থাপত্য রীতির শ্রেষ্ঠ নির্দশন এ স্মৃতিসৌধ। এটি উত্তরকালে ভারতের স্থাপত্য শিল্পে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেছে। এই ভবনের নকশা প্রণয়ন করেন স্যার উইলিয়াম এমারসন। তবে সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন ভিনসেন্ট জে ইস্চ (ঠরহপবহঃ ঔ ঊংপয)। মেসার্স মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি এ ভবন নির্মাণের গুরুদায়িত্ব লাভ করেন। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন ভারত ছাড়েন। ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ১৯০৬ সালে। সেতুর নকশা, ফটক ও বাগিচার মনোরম অলঙ্কার নান্দনিক সৌকর্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিভাত। ভাস্কর্যগুলো শিল্প, সাহিত্য, স্থাপত্যকলা ও ন্যায়বিচারের স্মারক। বাগানের ঝিরঝিরে হাওয়ায় ভ্রমণক্লান্ত দর্শনার্থীর মন সতেজ হয়, প্রাণবন্ত হয়। নবউদ্যমে জেগে ওঠে নতুনকে দেখার প্রয়াস। বাগান ভবনের সৌন্দর্যকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিউগল হাতে দেবী মূর্তিটি একটি রহস্যপুরী । এ নিয়ে জন্ম হয়েছে অসংখ্য কল্পকথা। মূর্তিটির বেদিতে বল-বিয়ারিং সংযোজিত। বাতাসের গতিবেগ বাড়লে জায়গায় দাঁড়িয়ে মূর্তিটি অনায়াস ঘুরতে পারে। বাগানে রয়েছে ইটালিয় শিল্পিদের শিল্পকর্ম। সিংহ-মস্তক মূর্তি থেকে ভারতের প্রধান চারটি নদীর মতো জলের চারটি ধারা প্রবহমান। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে প্রায় ৩,৫০০টি নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। বছরে ৫০ লক্ষ দর্শনার্থী এখানে ভ্রমণে আসেন। আপনার স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল হতে পারে কলকাতার প্রধানতম আকর্ষণ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।