প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৯:৪৭
আগুনের নদী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
তিন.
স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের পাশাপাশি মাদক চোরাচালানে শক্ত দখল থাকায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলো ইমতিয়াজ। ধীরে ধীরে সে অনেক বেশি লোভী হয়ে উঠেছিলো। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলো সে। তার উত্থানটাও এক বিস্ময়কর।
অধরা কথা চালিয়ে যাচ্ছে, তার কথা শুনতে শুনতে ভাবছে ইরফান। সে ঘেঁটে ঘেঁটে সবকিছু খোঁজ খবর নিয়েই এখানে এসেছে ইমতিয়াজের খুনির পালের গোদাটাকে ধরার জন্যে। খুনটা করে একেকজন একেক জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। কেউ চলে গেছে ভারতে, কেউ নেপালে, কেউ ইউকেতে আর একজন এখানে আইসল্যান্ডে চলে এসেছে। তবে এখানে এসে জানা গেছে সে চলে গেছে উত্তর আমেরিকায়- মেক্সিকোতে।
এক সময় ইমতিয়াজ ছিলো একজন মাছ ব্যবসায়ী। সে যখন এর পাশাপাশি গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে তখন থেকেই নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড জড়িয়ে পড়ে। যশোরের ভারত সংলগ্ন বর্ডার কাছাকাছি হওয়ায় শুরু করে মাদক, স্বর্ণ চোরাচালানের কাজ। এতে কয়েক বছরের মধ্যে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায় সে।
বিগত বছরগুলোতে এতোটাই লোভী হয়ে পড়েছিলো সে তার এলাকা দিয়ে চোরাচালান হওয়া প্রতিটি স্বর্ণের বারের জন্যে ব্যক্তিগত ট্যাক্স নেওয়া শুরু করে । তার এই সিদ্ধান্ত চোরাচালান চক্রের অন্য সদস্যদের ক্ষুব্ধ করে এবং শেষ পর্যন্ত তারা ইমতিয়াজকে চিরতরে শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।ইমতিয়াজকে খুন করতে ঢাকার উত্তরায় সবাই মিলে পরিকল্পনা করে। এই খুনের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে মোট সাতজন ছিলো। এর মধ্যে গ্রেফতার হয়েছে এক নারী, যার নাম আরিয়ানা। সে একে একে সবার নাম বলেছে। মূল পরিকল্পনাকারী ছিলো জামশেদ। জামশেদ এক সময় ইমতিয়াজের বন্ধু ছিলো। ছিলো ব্যবসায়িক পার্টনার। কিন্তু ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়। তাছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু নেতারও এই খুনের বিষয়ে ইন্ধন রয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের এই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও মনোমলিন্যের চূড়ান্ত ফলাফল খুনাখুনি। তবে খুনটা আর দশটা সাধারণ খুনের মতো ছিলো না।
আরিয়ানাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে জামশেদ। আরিয়ানা সুন্দরী, সুশ্রী যুবতী। সে ছিলো উচ্ছৃঙ্খল এক নারী। রাত দশটা থেকে ভোর পর্যন্ত কাটাতো নগরীর ইকোনোমিক বারগুলোতে। এখানেই জামশেদের নজর পড়ে আরিয়ানার প্রতি।
ধীরে ধীরে আরিয়ানার সাথে জামশেদের বিছানা পর্যন্ত সম্পর্ক গড়ায়। সে আরিয়ানার পেছনে অঢেল কালো টাকা ঢালতে শুরু করে। জামশেদ বুঝতে পারে, এই আরিয়ানা একদিন তার বিশেষ কাজে লাগবে।
আরিয়ানাও টাকার গন্ধে মাতাল হয়। জামশেদের অঢেল টাকায় সে বাতাসে উড়ে। জামশেদকে সঙ্গ দেয়, পাশাপাশি জামশেদের ব্যবসায়িক বিশেষ পার্টনারদেরকেও তার নির্দেশে সঙ্গ দিতে থাকে।
জামশেদ পাকা খেলুড়ে। সে থাকে উত্তর আমেরিকায়। মাঝে মাঝে বাংলাদেশে আসে। গুলশান, বনানী, উত্তরায় ব্যবসায়িক পার্টনারদের সাথে মিটিং করে এরপর উড়াল দেয় আবার অন্য কোনো রাষ্ট্রে। হয়তো সিঙ্গাপুর, নেপাল, তারপর আবার আমেরিকায়।
ইমতিয়াজ মাঝে মাঝে ভারতে যেতো। চিকিৎসার নাম করে সেখানে তার এক বন্ধু ভুপালের বাড়িতে উঠতো। তারপর তার ব্যবসায়িক কাজ সেরে চলে আসতো। এই বিষয়টা জামশেদ জানতো। সে তার পরিকল্পনাটাই সেভাবেই সাজায়। ভারতেই খুন করা হবে ইমতিয়াজকে।
চিকিৎসার জন্যে ভারতের কলকাতায় যাওয়ার একদিন পর সেখান একটি ফ্ল্যাটে ইমতিয়াজকে হত্যা করা হয়। সাথে ছিলো আরিয়ানাসহ আরো কয়েকজন, যাদেরকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
১৯৮৮ সালে ইমতিয়াজ রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগ পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে অনেক কাজে যুক্ত ছিলো। জেলে পরিবারের সদস্য ইমতিয়াজ একসময় বাজারে মাছের ব্যবসা করতো। ১৯৮৮ সালে কলেজ থেকে ডিগ্রি পাশ করার পর স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা। সে প্রথমে একটি বাইকার গ্যাংয়ে যোগ দেয়, যারা মোটরসাইকেলে স্বর্ণ চোরাচালান করতো। ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় উপজেলা ও এর আশপাশের এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই স্বর্ণ চোরাচালানের অভয়ারণ্য ছিলো। ইমতিয়াজ ১৯৯৫ সালে দল বদল করে এবং ১৯৯৬ সালে পৌরসভার মেয়র হয়। তরুণ বয়সে পদ পাওয়ার পরপরই নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করতে শুরু করে চোরাচালানের কাজে এবং মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। ২০০১ সালে ক্ষমতার পালাবদলে অন্য সরকার ক্ষমতায় এলে ইমতিয়াজ ভারতে আত্মগোপন করে। ২০০১ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে একটি হত্যাসহ ২২টি মামলা হয়। এরপর ২০০৯ সালে সে উপজেলা চেয়ারম্যান হয় এবং ২০১৪ সালে ও পরের দুই মেয়াদে নির্বাচিত হয় সংসদ সদস্য। ২০০৯ সালে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে সব মামলা থেকেই নিজের নাম কাটাতে সক্ষম হয় ইমতিয়াজ।
ইমতিয়াজের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তার নির্বাচনী এলাকায় ছিলো একটি ওপেন সিক্রেট। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস করেনি কেউই। তেমন কিছু হলেই ইমতিয়াজের বাহিনীর নির্যাতন, হত্যার শিকার হতে হয় মানুষদেরকে। স্থানীয় একটি ওয়ার্ড ইউনিটের এক রাজনৈতিক নেতাকে ২০২২ সালের ২৯ নভেম্বর তার বাড়িতে হত্যা করা হয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে।
তদন্তের সময় ইরফানকে একজন জানিয়েছে,
‘ছয়-সাতজন লোক অস্ত্র নিয়ে আমাদের বাড়িতে ঢুকে আমাদের চোখের সামনেই বাবাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। তারা ইমতিয়াজের হয়ে কাজ করতো।’
সে জানায়, ‘সংসদ সদস্য ইমতিয়াজের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আমার বাবা। এ জন্যে তাকে হত্যা করা হয়েছে।’
এছাড়াও ২০২৩ সালের ৮ জুলাই উপজেলায় স্থানীয় মাদকসেবীদের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে হত্যা করা হয় আরেক যুবককে। এ ঘটনায় দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। জানা যায়, ইমতিয়াজের লোক হওয়ায় তারা জামিন পেয়ে যায়। এরপর নিহতের পরিবার ভয়ে ওই এলাকা ছেড়ে চলে যায়।
ইরফান এসব বিষয় বসে বসে ভাবছিলো। আর অধরা অনেকক্ষণ বকেই যাচ্ছিল। কিন্তু ইরফানের ভাবনার কারণে সে কথা বন্ধ করে দিলো। এবার হুঁশ হলো ইরফানের। সে বললো, ‘হ্যাঁ। তুমি কী যেনো বলেছিলে?’
অধরা চুপ করে বসে রইলো। অভিমানে সে বললো, ‘আপনি তো আমার কথা শুনছিলেনই না। তাহলে কি ওই আগুনের নদীর সাথেই কথা বলবো?’
এবার হাসলো ইরফান। সে অধরার কথা বেশ মজা পেলো।
অধরার দিকে তাকালো। আগুনের নদীর আগুনের ছটা এসে বিরাজমান হয়েছে অধরার মুখে। বেশ সুন্দরী লাগছে এই যুবতীকে। ইরফান তার জীবনে এমন বিরল সুন্দরী নারী যেনো আর কখনও দেখেনি। অপলক তাকিয়ে রইলো সে।
‘কথা বলছেন না যে?’
‘তোমাকে দেখছি।’
‘কেনো? আমাকে আর কী দেখার আছে? আমি তো অন্য সাধারণ দশটা মেয়ের মতোই।’
‘আমি জানি না, আসলেই তুমি ভিন্ন এক নারী। যার দিকে তাকালেই যে কোনো পুরুষ উদাস হয়ে যাবে।’
‘হাওয়া দিবেন না কিন্তু!’ উচ্চস্বরে হাসলো অধরা।
‘না। হাওয়া নয় সত্যিকার কথা। আসলে এই কয়েকটা ঘণ্টা তোমার সাথে কাটিয়ে আমার মনে হলো, আমি তোমাকে কোনোদিন স্বপ্নে দেখেছি। তোমার মতোই কোনো নারী আমার হৃদয়ে এডজাস্ট হয়ে আছে। আমি তাকে কোনো মতেই হৃদয় থেকে ছাড়াতে পারছি না।’
অধরা এবার ইরফানের দিকে তাকিয়ে রইলো অপলক। চোখের পাতা নড়ছে না। কী বলবে সে তার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।
ইরফান বললো, ‘হ্যাঁ, তোমার গল্পটা বলো। শুনতে খুব ভালোই লাগছিলো।’
এবার অধরার চোখের পাতাগুলো নড়লো। সে বললো, ‘আমি জানি না। আসলেই তোমার হৃদয়ের টানেই হয়তো ম্যাগনেটের মতোই এয়ারপোর্টে ওইদিন আমি হাজির ছিলাম।’ (চলবে)