প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৯:৪৪
স্মৃতিরা কখনো বিতাড়িত হয় না
আমার প্রাণের 'পরে চলে গেল কে
বসন্তের বাতাস টুকুর মতো।
সে যে ছুঁয়ে গেল, নূয়ে গেল রে...
ফুল ফুটিয়ে গেল শতশত।
সে চলে গেল, বলে গেল না--সে কোথায় গেলো
ফিরে এলো না।
মায়া নিয়ে বোধহয় এর চেয়ে সমৃদ্ধ পংক্তিমালা আর কিছুই হতে পারে না। এ জন্যেই তিনি বিশ্বকবি।
বন্ধন-বন্ধুত্বের চেয়ে অনেক বড়ো ভিত, যাকে বলে একেবারে আত্মার আত্মীয়। মানুষের জীবনের স্মৃতির পাতায় দখিনা হাওয়া বহে, এটাই তো স্বাভাবিক। মায়া-মমতা-প্রেম- ভালোবাসা, হৃদয়ের টান, সম্পর্ক, আমাদের জীবনে এক-একটি খণ্ড খণ্ড উপন্যাসের মতো। আমরা মায়ায় আবদ্ধ জীব। এই মায়া, মনের টান, ঝেড়ে মুছে ফেলার কোনো পথ আমাদের জানা নেই। আমরা কেউ চাই না সেই মায়াময় মধুর স্মৃতি জীবন থেকে হারিয়ে যাক।
স্থূল নদীর মতো, কল কল রবে বয়ে চলে জীবন তার আঁকাবাঁকা পথে। 'দ্রোহের কবি', আমাদের জাতীয় কবি বলেছেন--
আমার কোন কিনারায় ভীড়ল তরী
এ কোন সোনার গাঁয়....মনে নিয়ে, আর মানিয়ে নিয়েই আমরা আমাদের জীবনতরী বাই, অনেকটা মাকড়সার মতো আমাদের মায়া, আমাদের জীবন প্রবাহ। সব সম্পর্ক টিকে থাকে না, আবার কিছু সম্পর্ক ভুলে থাকা কঠিন! তবে চিরন্তন সত্য, সবাই একদিন সময়ের বাহনে হারিয়ে যায়, রয়ে যায় মায়া!
বন্ধু থেকে বন্ধন আর বন্ধন থেকেই মায়া, মায়ায় ভরা আমাদের এই সংসার। বটবৃক্ষের ছায়া যেমন রে
মোর বন্ধুর মায়া তেমন রে.....
ফেলে আসা দিনগুলো আমাদের জীবনে আর ফিরে আসবে না, কতো মায়াঘেরা স্মৃতি ফেলে চলে আসলাম!
ভালোবাসার আদলে মায়া একটি ব্যাধি, এই জীবনে কিছু মুখশ্রী খুদিত হয়ে আছে মনের আরশিতে, তাই এমন মনজুড়ানো কথা তো কবিগুরুই বলতে পারেন--
হায় মাঝে হল ছাড়াছাড়ি, গেলেম কে কোথায় --
আবার দেখা যদি হল, সখা, প্রাণের মাঝে আয়।।
স্মৃতিরা কখনো বিতাড়িত হয় না। মায়া-মমতা, প্রেম- ভালোবাসা, সম্পর্ক, এই শব্দগুলোর মাঝে আক্ষরিক পার্থক্য থাকতে পারে, তবে প্রতিটি শব্দের স্ব মূল অভিন্ন।
আজকের আনন্দঘন সময়টা আগামীকাল স্মৃতি হয়ে রবে। সময় বহমান, আমরা তার দাসত্ব করে চলেছি।
কারো প্রতি বিশেষ টান, জীবনে হয়তো থাকে আর এমন ভাবেই থাকে, সুপ্ত প্রদীপের মতো জ্বলে! আমি এই লেখাটা লিখতে গিয়ে বার বার রবীন্দ্রনাথকেই টেনে আনি। কারণ তিনি আমাদের জীবনে সব পরিস্থিতিতেই প্রাসঙ্গিক। তাঁর 'শেষের কবিতা' উপন্যাসের শেষ পাতার, কবিতার কয়েকটা লাইন----
'ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে, ফেলি তার জাল
তুলে নিল দ্রুত রথে, দুঃসাহসী ধমনীর পথে
তোমা হতে বহু দূরে '....
কবির উপরোক্ত কথার ভেতর মায়া ও পিছুটানের প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়।
মানুষ কোনো যন্ত্র নয়, ব্যস্ততা দিয়ে হারানো স্মৃতিকে পাশ কাটানো যায় না, অপরাহ্নে আমরা নস্টালজিয়ায় ভোগী। একাকিত্ব আমাদের জীবনে প্রিয় মুখের ছবি আঁকে।
বাউল মারফতি সন্ন্যাসী জীবন, নগর জীবন, পল্লী জীবন, সবার জীবনে একটা শূন্যতা আছে ও থাকে, মনে মনে আমরা যেন কাউকে না কাউকে খুঁজে চলেছি!
এ যেন আপন মনের গোপন চঞ্চলতা!
কবির ভাষায়, ---
হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব--
আঁধারে মিশে গেছে আর--সব।
মায়ার সাথে কোনো দ্বন্দ্ব নেই, হয়তো অভিমান আছে,
প্রচণ্ড ভালোবাসা থেকে মায়ার সৃষ্টি। এক জীবনে মানুষ কতো স্মৃতি আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকে, শুধু মায়া! বেঁচে থাকলে একদিন নিঃসঙ্গ হবে, হয়তো বা কারো কারো জীবনে এটা ভবিতব্য।
শরৎ বাবু তো বিশ্বাস করতেন, মানে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়--
স্বেচ্ছায় নেয়া দুঃখ
ঐশ্বর্যের মত ভোগ করা যায়।মনের চোখ দিয়ে যাকে খুঁজে চলেছি আমরা, সেই তো মায়া। ভালোবাসা হয়তো ভোলা যায়, মায়া থেকে সরে আসা কঠিন।
এত বেদন হয় কি ফাঁকি।
ওরা কি সব ছায়ার পাখি।
সবাই ভালো থাকবেন, নমস্কার।