মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৮

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা বিলাসিতা নয় নৈতিক দায়িত্ব

ফরিদুল ইসলাম
মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা বিলাসিতা নয় নৈতিক দায়িত্ব

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার প্রাথমিক শিক্ষার ওপর। কারণ শিশুর জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই। যে রাষ্ট্র প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, সে রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ অর্জনে সফল হয়। তাই মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সকল অংশীজনের একটি জাতীয় অঙ্গীকার।

বাংলাদেশে গত দুই দশকে প্রাথমিক শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিদ্যালয়ে ভর্তি বৃদ্ধি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি, বিদ্যালয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রসারে প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবুও শিক্ষার গুণগত মান, পাঠ-অনুধাবন, মৌলিক গণিত দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে শেখা প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সকল শিশুর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইউনেস্কো বারবার উল্লেখ করেছে যে, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নয়—শেখার ফলাফলই শিক্ষার প্রকৃত মানদণ্ড। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, দক্ষ ও পেশাদার শিক্ষক তৈরি করতে হবে। একজন শিক্ষকই একটি বিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, শিশুমনস্তত্ত্ব, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতিতে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণ যেন শুধু সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শ্রেণিকক্ষে বাস্তব পরিবর্তন আনে, সেদিকে নজর দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, মৌলিক সাক্ষরতা ও গণিত দক্ষতা (ঋড়ঁহফধঃরড়হধষ খরঃবৎধপু ধহফ ঘঁসবৎধপু—ঋখঘ) নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, তৃতীয় শ্রেণির মধ্যে যারা সাবলীলভাবে পড়তে পারে না, তারা পরবর্তী শ্রেণিগুলোতেও পিছিয়ে পড়ে। তাই প্রতিটি শিশুকে তৃতীয় শ্রেণি শেষ হওয়ার আগেই সাবলীল পাঠ, লেখা, ভাষা-অনুধাবন এবং মৌলিক গণিতে দক্ষ করে তোলাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তৃতীয়ত, রিডিং কালচার গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে পাঠাগার, শ্রেণিভিত্তিক বই কর্নার, গল্পপাঠ, মুক্তপাঠ এবং বই আলোচনা চালু করা প্রয়োজন। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বের হয়ে শিশুদের প্রশ্ন করতে, ভাবতে এবং বুঝে পড়তে উৎসাহিত করতে হবে।

চতুর্থত, শিশুবান্ধব ও আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ভয়, শাস্তি কিংবা অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ শিশুর শেখার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। খেলাধুলা, গান, গল্প, বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম, দলীয় কাজ এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষণ শিশুদের শেখাকে আরও কার্যকর ও আনন্দদায়ক করে তোলে।

পঞ্চমত, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার সময়ের দাবি। স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ, মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট, ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং শিক্ষকদের আইসিটি দক্ষতা বৃদ্ধি শিক্ষার মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রযুক্তি যেন শিক্ষকের বিকল্প না হয়ে শিক্ষকের সহায়ক হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

ষষ্ঠত, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। নিরাপদ ভবন, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, খেলার মাঠ, পাঠাগার এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ একটি মানসম্মত বিদ্যালয়ের অপরিহার্য শর্ত।

সপ্তমত, অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। শিশুর শেখার বড় অংশটি পরিবারে ঘটে। বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, অভিভাবক সভা এবং সন্তানদের পড়াশোনায় উৎসাহ শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অষ্টমত, শেখার ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করতে হবে। শুধু পরীক্ষার নম্বর নয়; শিক্ষার্থীর ভাষা, গণিত, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সৃজনশীলতার অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়ক কর্মসূচিও প্রয়োজন।

নবমত, নৈতিকতা, মানবিকতা ও নাগরিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার প্রতি সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সততা, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা, দেশপ্রেম, পরিবেশ সচেতনতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা শিশুকাল থেকেই দিতে হবে। একজন ভালো মানুষ গড়ে তোলাই শিক্ষার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য।

দশমত, কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয় পরিদর্শন কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে শিক্ষকদের পেশাগত সহায়তা, সমস্যা শনাক্তকরণ এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের একটি কার্যকর মাধ্যম হতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি উন্নত, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের পূর্বশর্ত। প্রতিটি শিশু যদি বিদ্যালয়ে এসে আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে, সাবলীলভাবে পড়তে পারে, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারে এবং নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়ে বেড়ে ওঠে, তবে সেই শিক্ষাই হবে প্রকৃত মানসম্মত শিক্ষা। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের জন্য একটি শক্তিশালী, আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে।

ফরিদুল ইসলাম : চিন্তক, সমাজ ও মানবাধিকারকর্মী, কবি এবং গবেষক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়