মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৬, ১৪:২৫

কল্পনাকেও হার মানায় যে প্রাতিষ্ঠানিক পচন!

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
কল্পনাকেও হার মানায় যে প্রাতিষ্ঠানিক পচন!
ছবি : প্রতীকী

শিক্ষা একটি জাতির আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড, আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেই মেরুদণ্ড নির্মাণের পবিত্রতম কর্মশালা। কিন্তু সেই কর্মশালাই যদি দুর্নীতি, জালিয়াতি ও অনৈতিকতার অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, তবে একটি জাতির ভবিষ্যৎ যে ভয়াবহ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে—তা বলাই বাহুল্য। ঢাকার মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ-কে ঘিরে সাম্প্রতিক বিস্ফোরক তথ্য যেন সেই অন্ধকারেরই নির্মম প্রতিচ্ছবি। প্রকাশিত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির মোট ৬৭৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৬৬২ জনের নিয়োগই নাকি অবৈধ। এটি নিছক অনিয়ম নয়, প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, কিংবা বিচ্ছিন্ন দুর্নীতির ঘটনাও নয়; এটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ—যার ব্যাপ্তি ও দুঃসাহস সাধারণ কল্পনারও অতীত।

অনিয়ম যখন প্রতিষ্ঠানের অলিখিত সংবিধান

বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে বিচ্ছিন্নভাবে দুই-একটি নিয়োগ ত্রুটি ঘটতে পারে। কিন্তু যখন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৮ শতাংশ শিক্ষক আইনি বৈধতা ছাড়া নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তখন স্পষ্ট হয়—এখানে দুর্নীতি ব্যতিক্রম নয়, দুর্নীতিই ছিল একমাত্র নিয়ম

আইনি কাঠামোর প্রকাশ্য অবমাননা:
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ-এর নির্ধারিত বিধিমালা বাধ্যতামূলক। সেই কাঠামোকে প্রকাশ্যেই পদদলিত করা হয়েছে।

মেধার নির্বাসন, টাকার অভিষেক:
যোগ্যতা, মেধা, নৈতিকতা—সবকিছু নির্বাসনে পাঠিয়ে নিয়োগকে বানানো হয়েছে বাণিজ্যের পণ্য। কোটি টাকার অন্ধ লেনদেন যেন শিক্ষকতার পবিত্রতাকে প্রকাশ্যে নিলামে তুলেছে।

প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা:
বছরের পর বছর ধরে এত বিপুল অবৈধ নিয়োগ সংশ্লিষ্ট বোর্ড, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চোখ এড়িয়ে গেল কীভাবে? নাকি তারা দেখেও দেখেনি? এই প্রশ্ন এখন জাতির।

শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্মম জুয়াখেলা

হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে আসে—জ্ঞান, মূল্যবোধ ও আদর্শ শেখার জন্য। কিন্তু যারা নিজেরাই অবৈধতার সিঁড়ি বেয়ে শিক্ষকতার আসনে বসেছেন, তারা শিক্ষার্থীদের কী শেখাবেন?

যে শিক্ষক নিজেই দুর্নীতির অবৈধ ফসল, তার কাছ থেকে নৈতিক প্রজন্ম প্রত্যাশা করা মরুভূমিতে মরীচিকা খোঁজার শামিল।

এটি শুধু নিয়োগ কেলেঙ্কারি নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিরুদ্ধে সংঘটিত নীরব অপরাধ। আজ শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জীবন, পরীক্ষা, মানসিক স্থিতি—সবকিছু অনিশ্চয়তার মুখে। অভিভাবকের উদ্বেগ আজ ক্ষোভে রূপ নিচ্ছে।

আপসহীন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি

এখানে দায়সারা তদন্ত বা দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। প্রয়োজন দৃশ্যমান, দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ

১. বিচারবিভাগীয় স্বাধীন তদন্ত
কারা এই নিয়োগ বাণিজ্যের নেপথ্যের কারিগর—গভর্নিং বডি, অধ্যক্ষ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাকি আরও উঁচু স্তরের কেউ—তা উদ্ঘাটনে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে।

২. দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত
যারা শিক্ষাঙ্গনকে অর্থলোভের বাজার বানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে আনতে হবে।

৩. জরুরি শিক্ষক পুনর্বিন্যাস
অযোগ্য ও অবৈধদের অপসারণ করতে হবে, তবে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি না করে দ্রুত বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

শেষ কথা

মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ-এর এই ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি গোটা শিক্ষা খাতের জন্য অশনিসংকেত। আজ যদি এই দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা না যায়, তবে কাল শিক্ষাব্যবস্থার ভাঙন আর ঠেকানো যাবে না।

শিক্ষা যদি বাজারে বিক্রি হয়, তবে আগামী প্রজন্মও একদিন বিক্রিযোগ্য পণ্যে পরিণত হবে।

রাষ্ট্রের প্রতি আজ স্পষ্ট আহ্বান—আপস নয়, উদাহরণ সৃষ্টি করুন। এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রতিষ্ঠান শিক্ষাকে ব্যবসা এবং নিয়োগকে বাণিজ্যে পরিণত করার সাহস না পায়।

শিক্ষাঙ্গন হোক কলঙ্কমুক্ত, মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ—এটাই আজ জাতির জোরালো দাবি।

ডিসিকে /এমজেডএইচ

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়